হরতাল প্রতিরোধে গণভোট চাই

লজ্জা শব্দের সাথে পরিচয় নেই এমন বেহায়া পৃথিবীতে আজো পয়দা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। কারো লজ্জা কম, কেউ হয়তো লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে রাস্তাঘাটে নেংটো হয়ে হাটে, সবাই তাকে পাগল বলে ক্ষেপায়। আবার কেউ হয়তো লজ্জার সীমা ছাড়িয়ে পেঁচার মতো মুখ লুকিয়ে অন্ধকারে জীবন কাটিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ লজ্জার অর্থই বুঝে না, কখন লজ্জা পেতে হয় আর কখন লজ্জাকে ঝেড়ে ফেলতে হয় সে হিসেব কষতে জানে না। অনেক লাজুক মেয়ে আছে কোন পুরুষ হাত ধরলে লজ্জায় আর না বলতে পারে না, ধর্ষিতা হয়েও লজ্জায় কারো কাছে মুখফুটে বলতে পারে না, পরবর্তী লজ্জা যে আরো ভয়ংকর তা বুঝতে পারে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের লজ্জা কোন স্তরের তা বোধহয় দূনিয়াতে কারো পক্ষেই অনুমান করা সম্ভব নয়। লজ্জা পরিমাপের একটা একক থাকলে বেশ হতো, যেমন গজ ফিতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় লজ্জারোধী কাপড় চোপড়।

বিগত সরকারের আমলে আমি নির্ভেজাল ছাত্র ছিলাম। তাই রাজপথের আন্দোলন আমার স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য হয়েছিল। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে প্রথমেই বিরোধীদের আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করতে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মিছিল মিটিং-এর তীর্থস্থান মানিক মিয়া এভিনিউসহ বেশ কয়েকটি রাস্তায় ডিভাইডার দিয়ে সমাবেশ মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হয়, মুক্তাঙ্গনকেই সমাবেশের জন্য নির্ধারন করা হয়। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য ও চারদলীয় জোট তখন মিছিল মিটিং করে গলা ফাটাতো পল্টন মসজিদ থেকে নাইটিংগেল মোড় পর্যন্ত শ’দুয়েক মিটার লম্বা রাস্তায়।

আওয়ামীলীগের তৃণমূল কর্মী থেকে শেখ হাসিনা পর্যন্ত সবাই ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করতেন যে তারা আরো কমপক্ষে ত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকবেন, তারা ভাবতেন যে এতোদিন পরে জনগণ তাদেরকে কাছে পেয়েও দূরে ঠেলে দেবার মতো অবাস্তব কোন বিষয় পৃথিবীতে নেই। তাই তারা হরতাল বন্ধের জন্য আইন করতে চেয়েছে, হরতালের বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছে। এর আগে বিএনপি শাসনামলে হরতালের মতো বিধ্বংসী কার্যকলাপ থেকে বিরোধী দলকে সড়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বর্তমানে বিএনপি আবার ক্ষমতায়, আওয়ামীলীগ বিরোদী শিবিরের নেতৃত্বে। তাই তারা আগের সকল প্রতিশ্রুতি ভুলে আবার হরতালের কাছে ফিরে এসেছে। ভাবখানা এমন যে বিরোধী দলে থাকলে হরতাল করতেই হবে, না করলে মান সম্মান ধুলায় মিশে যাবে, আর ক্ষমতায় গেলে অবশ্যই হরতালের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে হবে।

গতকালও একটা হরতাল হয়ে গেলো। কেউ হরতাল মানে নি, না আওয়ামীলীগ, না জনগন। জনগনের একটা বড় অংশ আওয়ামীলীগ সাপোর্ট করে, তারাও হরতালের দিন হরতালের মুখে ছাই দিয়ে বাজার-ঘাট অফিস আদালতে ঠিকই উপস্থিত হয়েছে। তারপরও নেতারা বত্রিশটা দাত বের করে হায়েনার মতো হাসে।

লজ্জা নামক শব্দটার সাথে রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয় থাকলেও লজ্জা শব্দের অর্থ তাদের অজানা। একজন বেশ্যা রাতের আধারে খুপরি ঘরে খদ্দেরের মনোরঞ্জন করে, দিনের বেলা সবার সামনে সেও লজ্জাবনত হয়ে হাটে। একজন বেশ্যা লজ্জা শব্দের অর্থ জানে, আমাদের নেতা-নেত্রীরা তাও জানে না।

ক্ষমতায় থাকলে হরতালের বিপক্ষে বলতে হয়, বিরোধী দলে গেলে হরতাল, হরতাল। তাই আগামী নির্বাচনে যদি চারদলীয় জোট ক্ষমতা হারায় তারাও আবার হরতাল হরতাল বলে চিৎকার করে সাধারণ মানুষের ঘুম কেড়ে নেবে, আওয়ামীলীগ ও বাকী ১৩ জন নেতা ক্ষমতায় গেলে হরতালের বিরুদ্ধে নিত্য নতুন গান-বাদ্য প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। এ দুষ্টচক্র থেকে জাতি রেহাই চায়। আমরা মুক্তি চাই, আমরা আর হরতাল চাই না।

হরতাল জনগণ দাবী আদায়ের জন্য করে, কিন্তু জনগণই যদি হরতালকে প্রত্যাখ্যান করে তবে হরতালের বিরুদ্ধে আইন করতে বাধা কোথায়? হরতাল শব্দটি কোরআন শরীফের কোন শব্দ নয় যে তা পরিবর্তন করা যাবে না, বন্ধ করা যাবে না। হরতাল বন্ধের ব্যাপারে একমাত্র প্রতিবন্ধক হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। তারা তাদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য হরতাল নামক এ কালসাপটিকে দুধ কলা দিয়ে পোষে, যেমনি নিয়মিত পরিচর্যা করে সন্ত্রাস নামক বিষবৃক্ষটার।

আর কিছুদিন পরেই নির্দলীয় তত্ত্বাবদায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে। এই একটা মাত্র সময় দেশের মানুষ অন্য সময়ের তুলনায় শান্তিতে থাকে, স্বস্তিতে থাকে। এই একটা মাত্র সময়ে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে না, তাই এ সময়ে কি নেয়া যায় না হরতাল বন্ধের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি।

তত্ত্বাবদায়ক সরকারের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, আইনি জটিলতা আছে। আমরা আইন বুঝি না, দেশের হাজারো আইনজীবী আছেন তাদের নিয়ে আইনি জটিলতার অপসারন করুন, কিভাবে করবেন সেটা আপনাদের বিষয়। আইন তো জনগনের জন্যই, তাই জনগনের এ দাবীটা মানতে খুব বেশী বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না। গত তত্ত্বাবদায় সরকার বিচার বিভাগকে পৃথক করার জন্য অনেকটা পথ এগিয়ে ছিলেন। ইস্যুটা ছিল তাদের জন্য জরুরী যেহেতু তত্ত্বাবধায় সরকারে বিচারকদের প্রভাবটাই বেশি। তাই আমরা কি আশা করতে পানি না জনগনের জন্য তারা একটি উদ্যোগ নিবেন। নিজেদের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ আলাদা করার কাজ হাতে নেয়া গেলে আপামর জনগনের জন্য হরতাল বন্ধের উদ্যোগ নেয়া অসম্ভব নয়।

আর যদি এটা খুবই অসম্ভব হয়, তবে একটা গণভোটের আয়োজন করা হোক এবং তা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে। নতুন কোন সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই আমরা দেশের চৌদ্দ কোটি জনগন একবার অন্তত আমাদের ভাগ্যটা নিজেরাই গড়ে নিতে চাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে এতটুকু দাবী কি আমরা করতে পারি না। তারা যদি আইন বলতে আইনের বইকেই বুঝে থাকে, জনগনের জন্য যদি আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব না করেন, তবে তাদের এই অপারগতা চৌদ্দকোটি মানুষের মাথাকে লজ্জায় মাটিতে মিশিয়ে দেবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“হরতাল প্রতিরোধে গণভোট চাই” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. দেশনেত্রী! আরেকবার ভাবুন!! | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] আর সে মুক্তির পথ, আত্মহনের পথ। হরতালের পথ। নশ্বর জীনবটাকে গলা টিপে হত্যা করে […]

মন্তব্য করুন