মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার যে কারনে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিলেন

একাত্তরের রনাঙ্গনের ৯ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব:) এম এ জলিল জাসদ ছেড়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। “কৈফিয়ত ও কিছু কথা” শিরোনামে তার নিজের লেখা পুস্তিকায় সংক্ষিপ্তাকারে তার ব্যাখা দিয়েছেন তিনি। বইয়ের প্রথম অংশে জাসদের সভাপতির পদ থেকে তার পদত্যাগের কারণ এবং দ্বিতীয় অংশে ইসলামী বিপ্লবের দিকে ধাবিত হওয়ার কারণ উল্লেখ রয়েছে। জাসদ সংক্রান্ত অংশটুকু এখানে উল্লেখ না করে দ্বিতীয় অংশটুকু হুবহু তুলে ধরা সময়ের দাবী মনে করছি। ইতিহাস পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই বইয়ের কিছু অংশ তুলে ধরায় আগেই তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
**********************************************************

জাসদ ছেড়ে আসার পরে আমি ইসলামী বিপ্লবের দিকে ধাবিত হলাম কেন? এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উত্তর ইতিপূর্বে আমি দিয়েছি, তবু আরো কিছু বলার রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সহায়-সম্বলহীন এবং মায়ের গর্ভে থেকেই পিতৃহীন। আশৈশব আমি আল্লাহ বা স্রষ্টা নির্ভরশীল এবং একজন আশাবাদী মানুষ। নিজের শক্তি-সাহসেও চরম আস্থাশীল, আমি কখনো অন্যায়ের সংগে আপোষ করতে শিখিনি। নীতি-আদর্শ এবং সমষ্টির স্বার্থে আমি বিনা সংকোচে ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করার মহান শিক্ষা লাভ করেছি আমারই এক আপন আধ্যাত্মিক পুরুষের কাছে।

তার তাই আমি ১৯৭১ সানের ২৬ মাচর্ তারিখে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ব্যতিরেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছি মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে ছুটিতে আসা একজন অফিসার হিসেবে আমি নিরাপদেই পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারতাম এবং ব্যক্তি প্রতিষ্ঠার পথও বেছে নিতে সক্ষম হতাম।

মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আমার যে ব্যক্তি সুনাম অর্জিত হয়েছিল, তা দিয়েও আমি সেনাবাহিনীর একজন প্রতিষ্ঠিত অফিসার হিসেবে আজীবন ভোগ-বিলাসের মধ্যেই কালাতিপাত করতে সক্ষম হতাম। সেই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠার পথে পা না বাড়িয়ে আমি একটি নিশ্চিত, নিরাপদ এবং উজ্জ্বল জীবন ছুঁড়ে ফেলে মেহনতী জনগণের কাতারে দাঁড়ালাম জাসদ সভাপতি হিসেবে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও আমি জাসদের সভাপতির পদ বেহায়ার মত আঁকড়ে থাকার সুযোগ গ্রহণ করতে পারতাম। জাসদ সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরে আমি বিনা কষ্টে সরকারী পদমর্যাদা লাভ করে আরাম-আয়েশের পথ বেছে নিতে সক্ষম হতাম। যে দেশে আপোস করলেই অর্থ, পদ-মর্যাদা লাভ এবং ভোগ-লালসা চরিতার্থ করার সূবর্ণ সুযোগ বিদ্যমান, সেক্ষেত্রে এ সহজ পথে অগ্রসর না হয়ে আমি বেছে নিলাম ইসলামী বিপ্লব সংগঠন করার কঠিন পথ। লোভ, মোহ আমাকে আদর্শচ্যূত করতে পারে না বলেই আমার পথ সর্বদা কণ্টকাকীর্ণ এবং দুর্গম থেকে যায়। আমি একজন তৌহীদবাদী সৈনিক।

জাসদের সভাপতি থাকাকালীন অবস্থায়ও আমি কখনো নাস্তিকবাদে বিশ্বাস করতাম না এবং নাস্তিক না হয়ে একজন কমিউনিস্ট হওয়া যায় না এ সত্যটি মার্কসবাদেই স্পষ্টভাবে বর্ণিত। তাই কমিউনিস্ট আমি কখনো ছিলাম না। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশে আমি একজন কমিউনিস্টও খুঁজে পাইনি। এদেশে রয়েছে ‘সাম্প্রদায়িতক মিউনিস্ট অর্থাৎ কেউ হিন্দু কমিউনিস্ট, কেউ মুসলিম কমিউনিস্ট আবার কেউ কেউ বুড্ডিস্ট এবং ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিস্ট। বিরাজমান এই পরিস্থিতি আমাকে প্রতিনিয়ত ইসলাম ধর্মের প্রতি ধাবিত করেছে এবং সত্য সন্ধানে আমাকে করেছে নেশাগ্রস্ত।

ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমার জ্ঞান উল্লেখযোগ্য ছিল না বলে ১৯৭৬ সনের শেষ পর্যায়ে আমি রাজশাহী কারাগারের লাইব্রেরী থেকে প্রচুর ইসলামী বই নিয়ে কারাজীবন কাটাতে শুরু করি। তখন আমি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত একজন কয়েদী মাত্র। এ সময় ইসলাম-এর জ্ঞান অর্জনে আমি প্রচন্ডভাবে আকৃষ্ট হয়ে উঠি। জেলখানার বই ছাড়াও প্রচুর ইসলামী বই-পুস্তক বাইর থেকে বন্ধু বান্ধব এবং শুভাকাঙ্খীদের তরফ থেকে পেতাম। ১৯৭৯ সনের সংগঠিত ইরানের ইসলামী বিপ্লব আমাকে প্রভূতভাবে অনুপ্রাণিত করে তোলে। তখন থেকেই ইসলাম সম্পর্কে আমি অধিকতর জ্ঞান অর্জনের সাধনায় আত্মনিয়োগ করি। কারাগারের নির্জন সেল জীবনে জ্ঞান সাধনার সুযোগ অতুলনীয়। আমি সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়িনি। এই ক্ষেত্রে আমাকে লোভী বলা চলে। এর পূর্বে ১৯৭৪-৭৫ সনে কারাগারে বসেই আমি মার্কসবাদ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে ব্রতী হই এবং কারার নির্জনতার সুযোগে “মার্কসবাদ মুক্তির পথ” “সূর্যোদয়”, “গুড বাঈ গার্ডিয়ানস”সহ ১০ খানা ছোট-বড় গ্রন্থ রচনা করি, যার মধ্যে প্রথম ২ খানা প্রকাশিত হয়েছে। এই জ্ঞান চর্চার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল নির্যাতিত মানুষের সত্যিকারের মুক্তির পথ অনুসরণ করা।

তাই আমার জাসদ ছেড়ে ‘ইসলামী বিপ্লবে’র পথে আসার ঘটনাটিকে যারা আকস্মিক ঘটনা, কিংবা কোন সুবিধাবাদী পদক্ষেপ বলে মনে করেন, তাদের সে ধারণা মোটেও সঠিক নয়। তাদের সে ধারণা স্বার্থবাদী চক্রান্তের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা-আক্রান্ত, বাস্তবতার জ্ঞানে সমৃদ্ধ নয়।

আদর্শ এবং নীতির কারণেই আমি ইসলামী বিপ্লবের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। আমার এই আদর্শগত সমর্থনকে যদি কেউ অপরাধ বলে মনে করেন, তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি বা পরিতাপ নেই, কারণ আমার রাজনীতি আদর্শ ভিত্তিক, স্বার্থভিত্তিক নয়।

যুগান্তকারী ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গেলে প্রিয় পাঠকবৃন্দকে আমি শেষ একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ১৯১৭ সনে রুশ বিপ্লব সাধিত হওয়ার পরে বিপ্লব নেতা লেনিন তার একটি ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন যে, রুশ বিপ্লব কারো ষড়যন্ত্রের ফসল নয়। রুশ বিপ্লব লেনিন, বলসেভিক পার্টি, কিম্বা রুশ জনগণের ইচ্ছায়ই কেবল সাধিত হয়নি। বিশ্ব ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিশ্ব মানবতার বিকাশের স্বার্থে আর সহায়ক নয় বলে বিশ্ব মানবতার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষে একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়ার কারণেই রাশিয়ার জনগণের বিপ্লের মাধ্যমে প্রগতিশীল ‘সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা’ সেই নতুন বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তখন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই ছিল যুগ চাহিদা পূরণের জন্য অনিবার্য শর্ত। বিগত ৬০ বছরে সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। ইতোমধ্যেই বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সমাজ ব্যবস্থার আওতাধীন হয়ে পড়েছে। গড়ে উঠেছে সমাজতান্ত্রিক সভ্যতা। অর্ধযুগ অবধি ধনতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক সভ্যতা পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। দুই সভ্যতার পাশাপাশি অবস্থান এবং তাদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব মানবতাকে শংকিত করে তুলেছে। এই দু’টি সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সভ্যতার ধারক-বাহক আমেরিকা এবং রাশিয়া আজ বিশ্বের বুকে দু’টি পরাশক্তি (super power) হিসেবেই পরিচিত। সমাজতান্ত্রিক সভ্যতার প্রায় শুরু ভিন্নতর হলেও এর বিকাশে বর্তমান স্তরে ধনতান্ত্রিক সভ্যতার প্রায় অনুরূপ হয়ে পড়েছে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার তা’য়ে গড়ে ওঠা ‘রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ’ (state capitalism) এবং বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির আচার-আচরণ এক ও প্রায় অভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। এই দুই বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থার ধারক দু’টি পরাশক্তি নিজ নিজ ক্ষমতা-বলয় বৃদ্ধির বেপরোয়া প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানবতাকে অসহায় এবং সুষ্ঠু বিকাশের অনুপযোগী করে তুলেছে বলেই পুনরায় যুগ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে একটি নতুন সমাজ ব্যবন্থার, যা বিশ্ব মানবতার সুখ, শান্তি, শৃংঙ্খলা, কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি মানবতার সংরক্ষণ এবং ভারসাম্যজনক বিকাশের জন্য হবে সহায়ক। ইসলামী বিপ্লব সেই শূণ্যতাই কেবল পূরণ করে। ইসলামী বিপ্লব বিশ্ব মানবতার জন্য বয়ে আসে সেই নতুন সমাজ ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা বিশ্বে বসবাসরত মানুষের ক্রমবর্ধমান আর্থিক এবং আধ্যাত্মিক চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার মধ্য দিয়ে বিশ্বকে উপহার দিবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। পবিত্র কোরআন এই ঐশী অঙ্গীকার নিয়েই বিশ্বের সমগ্র মানবতার জন্য শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স:)-এর মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছিলেন। অন্ধকারাচ্ছন্ন বিশ্ব সেই সূর্যের কিরণে উদ্ভাসিত হবেই হবে ইনশাআল্লাহ। তাই ইসলামী বিপ্লব তৌহিদবাদী জনগনের ইচ্ছায়ই কেবল ঘটেনি, ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব চাহিদার অনিবার্য ফলশ্রুতি। পবিত্র কোরআন ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থাকে আল্লাহ বিশ্ব মানবতার জন্য বিশেষ রহমত এবং নিয়ামত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। কোরআন ভিত্তিক জীবন কেবল মুসলমানের জন্য মনোনীত হয়নি, বরং সমগ্র মানব গোষ্ঠীর জন্য মনোনীত করেছেন আল্লাহ। সুতরাং আমি তো ছার, বাংলাদেশ তো ছার সারা বিশ্বের সমগ্র মানব গোষ্ঠীকেই কোরআন ভিত্তিক জীবন গড়ে তোলার বিষয়টি নিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। আধ্যাত্মিকতাবিহীন বুদ্ধি ভিত্তিক নেতৃত্ব মানবতা সংরক্ষণে শোচনীয়ভাবেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নিছক বস্তবাদী সভ্যতা ভারসাম্যহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তির কল্যাণমুখী বিকাশের স্বার্থেই আধ্যাত্মিকতার সাথে সমন্বয় সাধন করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। ইসলাম ধর্মের সুষ্ঠু বিকাশ এই যুগ চাহিদা মেটাবার সামর্থ রাখে।

আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই, যখন আমাদের কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ এবং পদমর্যাদাসম্পন্ন লোক ইসলাম সম্পর্কে ঢালাও মন্তব্য করেন এবং উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে কুৎসিত অপপ্রচারেও লিপ্ত হন। তাদের ‘ইসলাম এলার্জী’ যে সুনিশ্চিতভাবেই সংকীর্ণ স্বার্থ ভিত্তিক সেরূপ সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। অতীতে ইসলামের দোহাই দিয়ে যে প্রচুর প্রতারণা হয়েছে এ কথা সত্য, যেমন হয়েছে গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের নামেও।সে কারণে প্রকৃত অপরাধী, কিম্বা গোষ্ঠীর অপরাধের কারণে আদর্শকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পেছনে নিশ্চিতভাবেই ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, তবে সদিচ্ছা, কিম্বা জন-কল্যাণ চিন্তা কস্মিনকালেও নয়। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী এবং আচরণ দেশ ও জাতির জন্য আত্মঘাতী। আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ একটি মহলের ধারণ- ১৯৭১ এর মুক্তিযেদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মের বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের ভূমিকা কি হবে তার মীমাংসা হয়ে গেছে। এ ধরনের উদ্ভট খেয়ালী মন্তব্য কেবল দু:খজনকই নয়, বিবেক এবং জ্ঞান বিবর্জিতও বটে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং নেতৃত্বদানকারী একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে আমি ঐ সকল বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৭১ মনে আমরা বাঙালী জনগণ পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক আকস্মিকভাবে চাপিয়ে দেয়া একটি অঘোষিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের নায্য অধিকার আদায় এবং রক্ষ করার জন্যই যুদ্ধ করেছি কেবল। এটা ছিল স্বাধীনতা আদায়ের যুদ্ধ, কোন ধর্মযুদ্ধ নয় যে, যুদ্ধ বিজয়ের পরবর্তীকালে বিশেষ কোন ধর্মকে পরাজিত বলে বিবেচনা এবং বর্জন করতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের আওতায় ধর্ম সংকুচিত কিম্বা পরাভূত হতে যাবে কেন, কোন যুক্তিতে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মীয় অনুপ্রেরণা মোটেও অনুপস্থিত ছিল না। প্রতিটি যোদ্ধার শ্বাসে-নি:শ্বাসে, রণক্ষেত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে স্মরণ করা হয়েছে মহান স্রষ্টাকে- তাঁর কাছে কামনা-প্রার্থনা করা হয়েছে বিজয়ের জন্য, নিরাপত্তার জন্য। অধিকাংশ যোদ্ধারাই যেহেতু ছিল এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম জনগণেরই সন্তান, সেহেতু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বুলেট, মর্টারের সম্মুখে আল্লাহ এবং রসূলই ছিল তাদের ভরসাস্থল। সুতরাং ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ইসলাম অনুপস্থিত ছিল বলে যারা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, তারা কেবল বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছেন। তারা অস্বীকার করছেন যুদ্ধ চলাকালীন বাস্তবতাকে যখন কেবল ইসলাম ধর্মই নয়, প্রত্যেকটি যোদ্ধাই যার যার ধর্মীয় অনুশাসন আন্তরিকতার সাথেই মেনে চলেছে। মোদ্দা কথা, ধর্মীয় চেতনার উপস্থিতি বিশেষভাবেই পরিলক্ষিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যক্তি আচরণে। তবু যারা মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় চেতনার অনুপস্থিতি আবিস্কার করতে চান, তাদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছেও ছিল না।

আমার ঐ সকল বন্ধুদের স্মরণ রাখা উচিত যে, ‘ইসলামে সাম্রাজ্যবাদ’-এর রূপ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক এবং ‘ইসলামে বিপ্লব’-এর রূপ হচ্ছে সাম্যবাদ। প্রথমটির মূলোৎপাটনের মধ্য দিয়েই দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমাজে এবং এ দায়িত্ব প্রত্যেকটি শান্তিকামী প্রগতিবাদী মানুষের। যা জানি না বা বুঝি না, তার বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা নয়, সততা এবং সাধনার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে হবে।

আর যারা সজোরে এবং সগর্বে বলতে চান যে, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অনেক জটিল সমস্যারই মীমাংসা হয়ে গেঠে, তাঁরা হয় আত্মপ্রবঞ্চনায় ভুগছেন, না হয় তাঁরা কোন অদৃশ্য প্রভূর নিছক মনোরঞ্জনের জন্য কলের পুতুলের মত বগল বাজিয়ে যাচ্ছেন। আমার সেই সকল আত্মভোলা বন্ধুদের আমি অতি বিনয়ের সংগেই অবগত করতে চাই যে, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কেবল একটি প্রশ্নেরই মীমাংসা হয়ে গেছে এং তা হচ্ছে আমাদের ভূখন্ডের একচ্ছত্র শাসক কে থাকবে পাঞ্জাবী পুঁজিপতি গোষ্ঠী , না উঠতি বাঙালী পুঁজিপতি গোষ্ঠি? ব্যস! কেবল এ প্রশ্নটিরউ মিটমাট হয়েছে। এর মিটমাট করতেই ঝরেছে মাত্র ৩০ লাখ বাঙালীর রক্ত। এরপরে তো রয়েছে আরো-আরো অনেক সমস্যা-অন্নহারা অন্ন পাবে কি না; বস্ত্রহীনরা বস্ত্র পাবে কি না; অশিক্ষিতরা শিক্ষা পাবে কি না; গৃহহীনরা গহ পাবে কি না; দু:স্থরা চিকিৎসা পাবে কি না; ধর্মপ্রাণ মানুষরা ধর্ম রক্ষা করতে পারবে কি না; উপজাতিরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার পাবে কি না; সামরিক বাহিনী ক্ষমতার অংশ পাবে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি ……… আরো অনেক কিছু।

উপরোক্ত ‘ইসলামী এলার্জী’ সম্পন্ন মহলটি দেশের জনগণকে বেল ‘মোটা ভাত. মোটা কাপড়’ আদায়ের সংগ্রামে প্রলুব্ধ করে থাকে এবং তা এমনভাবেই করে যাতে তারা এ খথাটিই বুঝাতে চায় যে, ইসলাম জনগণের ;মোটা ভাত, মোটা কাপড়’ আদায়ের সংগ্রামে একেবারই বিশ্বাসী নয়। তাদের এহেন দাবীর ভিত্তি একদিকে যেমন কতকটা সত্য, ঠিক তেমনি দাবীটি আদর্শিক বিচারে সম্পূর্ণভাবেই অসার।

অসার এই বিবেচনায় যে, পাক কোরআনে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবেই ঘোষণা করেছেন এবং সকল সৃষ্টির সেরা জীবটির সংগ্রাম কেবল ‘মোটা ভাত, মোটা কাপড়’ আদায়ের সংগ্রাম কখনো হতে পারে না। সৃষ্টির সেরা মানুষকে এহেন সংগ্রাম লিপ্ত করে তার সার্বিক বিকাশের সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হয়, তার মানসিকতায় এনে দেয়া হয় সীমাবন্ধতা, যে কারণ সে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সকল দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার লড়াইয়ের কল্পনাও করতে পারে না।

‘মোটা ভাত, মোটা কাপড়’ আদায়ের শ্লোগানটি তাই এক ধরণের সুপরিকল্পিত যড়যন্ত্র এবং এর মাধ্যমে সৃষ্টির সেরা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করে দেয়া হয়। অপরদিকে, পবিত্র ইসলামই কেবল মানুষকে আল্লাহর ঘোষণা মোতাবেক সৃষ্টির সেরা জীবের সকল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সক্রিয়ভাবেই সহায়তা করে।

মানুষের সংগ্রাম কেবল ভাত-কাপড় অর্জনের সংগ্রাম হতে পারে না। এ ধরনের চিন্তা-চেতনা মানুষের জন্য হীনমন্যতা স্বরূপ এবং অপমানজনক। মানুষ তার ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা অর্জনেরই মধ্য দিয়ে শুরু করবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের আপোষহীন লড়াই। ভাত-কাপড়, অধিকার এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার স্তরটি হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার লড়াইয়ের প্রাথমিক ভিত, এটিই মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লড়াই নয়। এ লড়াইটি ইসলামী আন্দোলনের লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং অঙ্গীভূত।

সুতরাং ধ্যান-ধারণায় এই আদর্শিক লড়াই সন্নিবেশিত করেই শুরু করতে হবে লড়াইয়ের প্রথম স্তর।

এ সত্যটি স্বেচ্ছায় উপেক্ষা করে সৃষ্টির সেরা মানুষকে যারা কেবল ‘মোটা ভাত, মোটা কাপড়’ আদায়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার শর্ত হিসেবে ইসলাম ধর্মের বিরোধিতা করতে শিখায়, তারা মানুষের জীভনে শ্রেষ্ঠত্ব আসুক তা কামনা করে না। তারা মানুষকে আল্লাহ প্রদত্ত বিভিন্ন সুন্দর নিয়ামতসমূহ থেকে বঞ্চিত এবং বিচ্ছিন্ন করে রাখে এবং মানুষকে চিরকাল করে রাখে কেবল শ্রমেরই দাস। বাংলাদেশে সংগ্রামরত সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি-সমূহের জন্য সময় এসেছে উপরোক্ত বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখা এবং বাস্তবতা মেনে নিয়ে চলার পথ নির্ধারিত করা। পরিপূর্ণভাবেই ভাবাবেগমুক্ত হয়ে তাদেরকে আরো ভেবে দেখতে হবে নিম্নোক্ত কতিপয় বিষয়-যেমন,

উপরোক্ত ঐ মহলটিই ইদানীং দেশ ও জাতির প্রধান সমস্যাবলী সম্পূর্ণরূপে আড়াল করে রেখে তাদেরই মনগড়া ‘মৌলবাদ’কে দেশ ও জাতির সম্মুখে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য আপ্রাণ অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। দেশ ও জাতির সম্মুখে আজ যেক্ষেত্রে জাতীয়-বিজাতীয় শোষণ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগের মতো কয়েকটি প্রধান সমস্যা ভয়াবহভাবেই বিরাজমান, সেক্ষেত্রে এ সকল জ্বলন্ত সমস্যাবলীকে পাশ কাটিয়ে ‘মৌলবাদ’কে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিতকরণের মধ্যে ঐ বিশেষ মহলটি দেশ-জাতির মধ্যে বিষময় অনৈক্যের বীজ বপন করার এমন জঘন্য দায়িত্বটি যে কেন পালন করে যাচ্ছে, তা জনসাধারণের কাছে বোধগম্য না হলেও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তির কাছে দিবালোকের মতই পরিস্কার। এদেশের নব্য ধনিক শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর সহায়তায় ২২ পরিবার থেকে ২২ হাজার পরিবার সৃষ্টি করার ফলে জাতীয় শোষকের তারাই আজ একটা মুখ্য অংশ। সুতরাং নিজেদের এবং তাদেরই বিদেশী প্রভুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটা তাদের জন্য আত্মঘাতী নয় কি? দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে দেশ-জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নটি। এ ক্ষেত্রেও তারা কোন হুমকি খুঁজে পাচ্ছে না, কারণ তাদেরই আরেকটি বিশ্বস্ত বন্ধু হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রধান হুমকি। বন্ধুর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার তুলনায় নীরবতা অবলম্বনই তো গোষ্ঠী-স্বার্থ রক্ষার মোক্ষম হাতিয়ার। তৃতীয়টি হচ্ছে প্রাকৃতিক দূর্যোগ। এ প্রশ্নের সাথেও জড়িয়ে পড়ে তাদেরই নমস্য প্রভূ, কারণ বন্যার পানির উৎস সম্পর্কে দেশ-বিদেশের মতামত কারো অজানা নয়। সুতরাং চেপে যাও সব, বন্ধুর গলায় রশি মানেই তো নিজের সর্বনাশ। আমার সেয়ানা বন্ধুরা তাদের নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে পিছিয়ে থাকবে কেন? তাই ‘Give the dog a bad name & hang it’ যেন এই নীতির অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই তারা হাতের কাছে পেয়েছে ‘মৌলবাদ’কে। ব্যস! আর যায় কোথায়! ঝুলবি তো ব্যাটা মোল্লাই ঝুলে যা!

দেশের রাজনীতির অঙ্গনে এহেন বিবেকবর্জিত প্রয়াস নিজের অজান্তেই নিজের পায়ে কুড়াল মারার সমান বলে আমি মনে করি। দেশ-জাতির মধ্যে যারা জোর করে ‘মৌলবাদ’ আবিস্কার করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তারাই প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দিতে যাচ্ছে এবং এর বিষাক্ত পরিণতির জন্য তারাই আগামী দিনের ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

স্বাধীনতা অর্জনের ১৭ বছর পরেও আজ যারা নতুন করে পুনরায় স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ কিম্বা মৌলবাদ-এর ভূত নিয়ে খেলা করতে আগ্রহী তাদের একটি সত্য জেনে রাখা প্রয়োজন যে, জাতির আজ প্রয়োজন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, এ স্বাধীন মাটিতে বসবাসকারী প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। এই অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠা করার পথে আজ যে সকল সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে প্রকৃতপক্ষে তারাই চিহ্নিত হবে দেশ ও জাতির শত্রু হিসেবে। সেই ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণই কেবল সর্বকালের দেশপ্রেম=এর সনদপত্র হতে পারে না। যদি কেবল তা-ই হ’ত তাহলে ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরে যাদের জন্ম, তারা দেশ-প্রেমিকদের সারিতে দাঁড়ায় কিসের ভিত্তিতে?

তাছাড়া ‘৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই যদি দেশ-জাতির শত্রু এবং মিত্রের চিহ্নিতকরণ স্থায়ী রূপেই হয়েই গিয়ে থাকে, তাহলে এই স্থায়ী শত্রু মিত্র একটা নির্দিষ্ট কাল-সীমার পর তো ধরার বুক থেকে এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে, সে ক্ষেত্রে দেশ-জাতির মধ্যে কি কোনই শত্রু-মিত্র থাকবে না? মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষদের মৃত্যুর পরে দেশ-জাতি শোষণমুক্ত হয়ে যাবে? হয়ে যাবে শত্রু মুক্ত? এমনটি তো হতে পারে না। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি কেবল একটা বিশেষ সময়সীমার গন্ডীর মধ্যে সীমিত থাকতে পারে? না, এটি হচ্ছে সম্পূর্ণভাবেই ভ্রান্ত ধারণা। মুক্তিযুদ্ধ কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিম্বা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের সম্পত্তি হতে পারে না, তেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিশেষ কোন সময়েরও চেতনা হতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে শোষিত, বঞ্চিত আত্মার অতৃপ্ত বাসনা বাস্তবায়নের লক্ষে একটি বিস্ফোরণ-সৃষ্টির সেরা মানুষের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে একটি মজা জাগরণ। এই চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটতেই থাকবে যতদিন পর্যন্ত না মানুষ শোষণ-বঞ্চনা ও জুলুমের নিগড় থেকে মুক্তি অর্জন করে নিজ অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে একটি অনন্ত সত্ত্বা-অনির্বাণ শিখা। মুক্তির এই লেলিহান চেতনার বহি:প্রকাশ বিভিন্ন পরিসরে, বিভিন্ন সময়ে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্নভাবেই ঘটে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ। সৈনিকের চেতনায় রাইফেল গর্জে ওঠে, সে সরাসরি রণক্ষেত্রে বিরাজ করে। শিল্পীর চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটে তুলিতে। গায়কের গানের মধ্য দিয়ে; লেখক-লিখাদের ঘটে কবিতা, প্রবন্ধে, অসহায় মায়ের নি:শ্বাসে-অশ্রুতে; ধর্ষিতা বোনের আর্তনাদে; কেরানীর ঘটে হতাশা ও ধীর্ঘশ্বাসে।

শোষণ মুক্তির চেতনা যখন যেথায় যে ভাবে যার মধ্যেই উন্মেষ ঘটবে, সে-ই নিজ নিজ পরিসরে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরু আছে শেষ নেই। সুতরাং সুনির্দিষ্ট কোন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষই শোষিত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের স্থায়ী পক্ষ-বিপক্ষ রূপে বিবেচিত হতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট মুক্তিযুদ্ধে কেউ পক্ষ অবলম্বন না করে থাকলে সে আর কোনদিনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হতে পারবে না এমন ধারণা বা যুক্তি সঠিক নয়।

সময়ের সাথে সাথে প্রত্যেকটি মানুষেরই সামাজিক অবস্থান ভিন্নতর হতে থাকে এবং আজ যে শোষিত মানুষের মুক্তির পক্ষে, আগামী দিনের শোষণ মুক্তির লড়াইয়ে পক্ষের শক্তিটির সামাজিক অবস্থান শোষকের মধ্যেও অন্তর্ভূক্ত হয়ে যেতে পারে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছেও তাই। তা না হলে পাকিস্তানকালে শোষক পরিবার হিসেবে গণ্য ছিল মাত্র ২২টি পরিবার, আর ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরে কেবল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান এবং আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেই শোষক পরিবার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২২ হাজার পরিবার। এরা কারা? সকলেই কি ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির অন্তভূক্ত?

এ প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করার মধ্য দিয়ে কেবল আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য মুক্তিযুদ্ধের নতুন পক্ষ-বিপক্ষ চিহ্নিত করতে হবে। সুতরাং সেই ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি ‘৮৯ সনে এসে আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যে নেই এটাই বাস্তব এবং এই বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ হলে, অথবা স্বেচ্ছায় এড়িয়ে যেতে চাইলে দেশ-জাতির প্রকৃত শত্রু-মিত্র নিরূপণ করা সঠিক হবে না। এ সত্যটি জেনেশুনেই যারা সেই ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী কতিপয় চিহ্নিত সংগঠন এবং ব্যক্তিকেই স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও প্রধান শত্রু হিসেবে ঠেকাতে চাচ্ছে, তারা দেশ-জাতিকে বোঝাবার চেষ্টা করছে যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৭ বছর পরেও দেশে কোন নতুন শোষক বা শত্রু জন্ম নেয়নি। এ ধরণের প্রবণতাই প্রকৃত পক্ষে দেশে ও জাতির মূল শত্রুকে আড়াল করে রাখে। এবং দেশ ও জাতির মূল শত্রুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত না করনই হচ্ছে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। প্রকৃত শত্রু সঠিকরূপে চিহ্নিতকরণ না হলে জনতার ঐক্য গড়ে উঠবে কিসের ভিত্তিতে? যারা দেশ ও জাতির আসল শত্রুকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আড়াল করে রাখতে চায়, তারাই জাতির প্রধান শত্রু নয় কি?

তাই দেশ ও জাতির সম্মুখে প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে-দেশের প্রকৃত সমস্যাবলী এবং প্রধান শত্রু চিহ্নিত করা। মৌলবাদের মত কোন মস্তিস্কপ্রসূত বিষয়কে উপরে টেনে আনলে প্রকৃত সমস্যা ও শত্রুর ছোবল থেকে ১১ কোটি বাঙালীর কেউই রক্ষা পাবে না। আর যদি এ দেশের শাসককুল এবং তাদের দোসর গোষ্ঠী স্বার্থান্ধ হয়ে খেয়াল-খুশীর উপর নির্ভর করেই চলতে থাকে, তাহলে শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হ’ব-বাংলাদেশের ১১ কোটি বীর জনগণের শরীরে রক্তের তো আর অভাব নেই- সুতরাং খেলারাম খেলা যা!!

আমার কৈফিয়ত ও কিছু কথার নমুনাও এখানেই শেষ।

*****************************************

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার যে কারনে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিলেন” লেখাটিতে 8 টি মন্তব্য

  1. Nazrul বলেছেন:

    ধন্যবাদ শাহরিয়ার ভাই,
    মেজর জলিলের অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা বইটা নেট এ পড়ার বা লোড করার সুযোগ দিবেন কি? প্লিজ সাহায্য করুন।
    আবার ও ধন্যবাদ

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ নজরুল ভাই, আপনার জন্য অবশ্যই তুলে দেব বইটা, ইনশাআল্লাহ। একটু সময় লাগবে।

    [উত্তর দিন]

    water উত্তর দিয়েছেন:

    http://www.esnips.com/doc/d78966a1-7001-4725-ac88-c12e0fb247fc/null

    [উত্তর দিন]

  2. mahbuba বলেছেন:

    ami jante chai mejor jalil kon islami dol e jog diechen..specific name.

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    মেজর জলিল নিজেই ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করেন ১৯৮৪ সালের ২০ অক্টোবর। তিনি নিজে তার এ কর্মকান্ডকে “ইসলামী বিপ্লবে’র পথে আসা” বলে উল্লেখ করেছেন।

    [উত্তর দিন]

    mahbuba উত্তর দিয়েছেন:

    thank u very much for reply..can u give me updates of this party..onader ekhonkar obostha ki?koto jon shodosho…achen..ami ki vabe aro beshi jante pari..dol ti shompor k..thanks again

    [উত্তর দিন]

  3. এক জন সালাউদ্দীন আয়ুবীর অপেক্ষায় বলেছেন:

    শাহরিয়ার ভাই আপনাকে অসঙথ্য ধন্যবাদ

    [উত্তর দিন]

  4. টাচ মাই ড্রিম বলেছেন:

    মেজর জলিলের অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা বইটার লিঙ্কঃ
    http://www.priyoboi.com/2011/11/blog-post.html

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন