হেরে গেলেন ম্যারাডোনা, হেরে গেল কোটি বাঙ্গালীর আবেগ

হেরে গেল আর্জেন্টিনা, হেরে গেলেন ম্যারাডোনা, হেরে গেল বাংলাদেশ। হ্যা, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছেনা বটে, কিংবা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার তেমন কোন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, তবুও আজকের খেলায বাংলাদেশরই পরাজয়। অবশ্য গতকালই পরাজয়ের শুরু, দেশের যে বিশাল ব্রাজিল সমর্থক রয়েছে তাদেরকে কাঁদিয়ে ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে গতকালই বিদায় নিয়েছে। তারপরও আশা ছিল ম্যারাডোনার দল হয়তো এবার ঠিকই ছিনিয়ে নেবে বিশ্বকাপ। তবুও দুঃস্বপ্নের মতো সোনার সে কাপ অধরাই থেকে যায় মেসি বাহিনীর কাছে। আর্জেন্টিনার শোচনীয় পরাজয় বিশ্বকাপ উন্মাদনার যবনিকাপাত ঘটিয়েছে, বাংলাদেশী ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের অপমৃত্যু ঘটেছে ।

দুঃস্বপ্নেরা বারে বারে ফিরে আসে। দুঃস্বপ্ন দেখার শুরু সেই ইতালিয়া নাইন্টি থেকে। আর হবে না-ই বা কেন? আমাদের শৈশব ঘিরে ছিলো স্বপ্নের জাদুকর ম্যারাডোনা। ছিয়াশির বিশ্বকাপ জিতে সেই যে বাংলাদেশীদের হৃদয় জয় করেছেন তার পর শুধু হৃদয়ে রক্তক্ষরণের ইতিহাস। কি ছিল না ম্যারাডোনার? ছোটবেলায় স্কুলে লিখতাম ম্যারাডোনা খাতায়, লিখতাম ম্যারাডোনা কালি দিয়ে, ইয়ুথ কালির চেয়ে সস্তাও ছিল অনেকটা সে কালি। শার্ট, গেঞ্জি, পোস্টার, ভিউকার্ড সবখানেই ছিল ম্যারাডোনার উপস্থিতি। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ভক্তদের মনে হয় তখন থেকেই উত্থান। বই পুস্তকে কালো মানিকের গল্প পড়ে পড়ে অনেকেই ব্রাজিল ভক্ত, অবশ্য নান্দনিক খেলা বলতে যা বুঝায় তা ব্রাজিলেরই আয়ত্বে। স্বাভাবিক ভাবেই ম্যারাডোনার স্বর্ণযুগে আমিও ম্যারাডোনার ভক্ত হয়ে যাই। না, খেলা খুব একটা ভালো বুঝি না, এমনকি পত্রিকার খেলার পাতা সাধারণত পড়া হয় না। আর ক্রিকেট বলতে শুধুই বাংলাদেশের খেলা দেখি, এর বেশী নয়। তবুও শৈশব থেকেই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, এবং অবশ্যই তা ম্যারাডোনার জন্য। আমার মনে হয় অধিকাংশ আর্জেন্টিনা ভক্তদের দলটিকে সাপোর্টে এটিই মূখ্য কারণ।

তবে সব কিছুরই একটা সীমা আছে, আবেগেরও সীমা থাকা একান্ত প্রয়োজন। আর্জেন্টিনার পরাজয়ে অতীতে ভক্তকূল এতটাই শোকাহত হয়েছেন যে অনেকেই শোককে কাটিয়ে উঠতে পারেন নি বরং পরিবারের লোকজনকে আরো বেশী শোকাতুর করে চলে গেছেন একরাশ অভিমান বুকে নিয়ে। আশাকরি এবার অভিভাবকরা এ ব্যাপারে সচেতন আছেন। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবারই বুঝা উচিত যে, ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সাথে আমাদের সম্পর্ক শ্রেফ খেলা নিয়ে। তাই সম্পর্কের সীমাটা আমাদের মেনে চলা উচিত। আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিল হেরে গেলে কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক কিন্তু তারও একটা সীমা থাকবে, এ বিষয়টি অভিভাবকরা নিশ্চয় সন্তানদের বুঝিয়ে থাকবেন। আর আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের সাপোর্টার মানেই প্রতিদ্বন্দী এমনটি হওয়ার আদৌ কোন যুক্তি নেই বরং দলদুটো যেমন প্রতিযোগিতা করছে সাপোর্টারদেরও প্রতিযোগিতার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। পারস্পরিক অসম্মান, কটাক্ষ করা, হিংসাত্মক ব্লগিং করা, এমনকি এ নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে মারা মারি পর্যন্ত চলছে, তা যে নিতান্তই ছেলেমানুষি কাজ তা অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের বুঝানো। কারণ আর্জেন্টিনার একহালি গোল খেয়ে হারায় সাপোর্টারদের প্রতি নিয়ত খোঁচাখুচি করলে অতি আবেগপ্রবণ সন্তানেরা অস্বাভাবিক কিছু ঘটাতে পারে যা কারো কাম্য নয়। ব্রাজিলের সাপোর্টারদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই খেলা কে নিছক খেলা হিসেবেই দেখা উচিত, বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই নেয়া উচিত, জীবনের চরম লক্ষ্য-উদ্দেশ্য যেন তা হয়ে না যায়।

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যতগুলো পতাকা উড়েছে বাংলাদেশের আকাশে ততগুলো এ দেশীয় পতাকা ওড়ানোর রেকর্ড নেই। হয়তো দেশপ্রেমী প্রতিটি বাংলাদেশীর হৃদয় জুড়েই লালসবুজের পতাকাটি খোদাই হয়ে আছে তাই আনুষ্ঠানিকভাবে ওড়ানোর প্রয়োজন বোধ করে না অনেকেই। তবে অচেনা অজানা দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশীদের এই যে তীব্র উন্মাদনা তা বোধকরি বিশ্বে বিরল। ইচ্ছে করলে সরকার এ ফুটবল প্রেমীদের ভালবাসা দিয়ে এ সব দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারেন। বিশেষ করে অনেক দেশে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশী দূতাবাস নেই, বা বাংলাদেশেও অনেক দেশের দূতাবাস নেই, ফুটবল ভক্তদের এ ভালোবাসাকে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে হয়তো কাজে লাগানো সম্ভব।

আসুন, বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের আবেগের এই যে পরাজয় সে শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরকে বিশ্ব দরবারে প্রতিযোগিতার যোগ্য করে গড়ে তুলি, তবেই স্বার্থক হবে এ ফুটবল উন্মাদনা। সবাই ভালো থাকুন।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“হেরে গেলেন ম্যারাডোনা, হেরে গেল কোটি বাঙ্গালীর আবেগ” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. palash বলেছেন:

    amer voler kico nie chokia jul

    [উত্তর দিন]

    palash উত্তর দিয়েছেন:

    kie lobe

    [উত্তর দিন]

  2. টুটুল বলেছেন:

    ভাল লাগলো..

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন