ঘোলা পানিতে টিপাইমুখ বাঁধ

সামিউল নির্মমভাবে নিহত হল। নিহত হলো নিজের মায়েরই হাতে। সামিউলকে জীবন দিতে হলো মায়ের অনৈতিক সম্পর্ক দেখে ফেলায়। স্বামীর কাছে পরকীয়ার গোপন খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে কামুকেরা নিজেদের সন্তানদেরও হত্যা করতে দ্বিধা করে না। ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও চলছে আওয়ামী লীগ আর ভারত সরকারের মাঝে অবৈধ প্রণয়লীলা। সে প্রণয়ে বাঁধ সেজেছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামের পক্ষ শক্তিগুলো। বাঁধ সেধেছে জামায়াত, বাঁধ সেধেছে জাতীয়তাবাদী দল। দেশবিরোধী অবৈধ গোপন চুক্তির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক করতে মাঠে নেমেয়ে বিএনপি-জামাত জোট। আর তাইতো দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে অনৈতিক প্রণয়লীলায় মাতোয়ারা আওয়ামী সরকার জামাত শিবির ও বিএনপির কন্ঠরোধে মরিয়া।

গ্রেফতার হলেন জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, গ্রেফতার হয়েছেন সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। নেতৃবৃন্দদের মুক্ত করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারাবরণ করেছেন ৫ শতাধিক নেতাকর্মী।  পৃথক ৫টি মামলায় নিজামী, সাঈদী, মুজাহিদ, প্রত্যেকেরই ১৬ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এর আগে হরতালে গ্রেফতার হলেন বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য মির্জা আব্বাস, বিএনপির সাংসদ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। শমসের মবিন চৌধুরীকে রিমান্ডে নেয়ার পর জামিন হলেও জেলগেটে গতকাল আবারো গ্রেফতার করা হয়েছে। একইভাবে বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হচ্ছে সাবেক জ্বালানী উপদেষ্টা ও দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের উপর। মিথ্যে মামলায় গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে বিবস্ত্র করে রিমান্ডে পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করা হয় তাকে। এ সবকিছুই একই সূত্রে গাঁথা, গভীর ষড়যন্ত্রেরই বার্তাবাহক।

একদিকে নেতৃবৃন্দকে জেল জুলুম হুলিয়ার মাধ্যমে ব্যতিব্যস্ত রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার হরণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দৈনিক আমারদেশ পত্রিকা, সাটেলাইট টিভি চ্যানেল ওয়ান, অংকুরেই বিনষ্ট করা হলো যমুনা টিভি, বন্ধ করা হয়েছে জনপ্রিয় টকশো “পয়েন্ট অব অর্ডার” ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদের সকল ভাষা স্তব্ধ করে দেয়ায় সাধারণ মানুষ ফুঁসে উঠেছে আওয়ামী অপশাসনের বিরুদ্ধে। আর এরই বহি:প্রকাশ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বাকশালের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জয়, এরই আরেক দলিল ২৭ জুন অনুষ্ঠেয় দেশব্যাপী স্বত:স্ফূর্ত সকাল-সন্ধ্যা সফল হরতাল। এসব কিছুই ছিল আওয়ামী লীগের জন্য অশনি সংকেত, কিন্তু বাকশালের প্রেতাত্মা কাঁধে আওয়ামী লীগ জনতার সংকেতে সাড়া না দিয়ে উল্টো জনতার বিরুদ্ধেই শুরু করেছে দমন নীপিড়ন। এমনকি বাড়ী ঘরে ঢুকে মা-বোনদেরকে লাঞ্ছিত করতেও পিছপা হচ্ছে না আওয়ামী লীগ।

এসব কিছু দেখে সন্দেহ জাগে। আওয়ামী লীগ তবে কি চায়? মাত্র দেড় বছরের সরকার শুরুতেই কেন জনতাকে প্রতিপক্ষ করে অসম যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে? তবে কি আওয়ামী লীগ ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে নেমেছে? বিরোধী দলগুলোকে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে মিছিল মিটিং সংগ্রামে ব্যস্ত রেখে আসলে কি তারা চোখের আড়াল করতে চাইছে এমন কিছু যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশপ্রেমী সাধারণ মানুষ মেনে নেবে না কিছুতেই?

হ্যা, আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্ন করতে চায় ভারতের সাথে তাদের অনৈতিক প্রণয়লীলা। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা ভারতে গিয়ে দাদাদের আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে, দিয়ে এসেছে দেহপ্রাণ সঁপে দেয়ার অঙ্গীকার। তাইতো দেখি বাংলাদেশের জমিনে বীরদর্পে টহল দেয় ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষী, বাংলাদেশ বিমানে মাতুব্বরি ফলাতে চায় ভারতীয় স্কাই মার্শাল, আকাশ ছোয়া মূল্যে ক্রয় করা হচ্ছে ভারতীয় বিদ্যুৎ, ভারতের সেনাবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম, সৈন্যবাহিনী পরিবহণে দেয়া হচ্ছে ট্রান্সশিপমেন্ট, সমুদ্র বন্দরকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার আয়োজন চলছে, তৃতীয় কোন দেশের কাছে পাচার করে দেয়ার চেষ্টা  চলছে অপ্রতুল গ্যাস, বাতিল করা হয়েছে দেশীয় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা টেলিফোন কোম্পানী। যেখানে খোদ ঢাকা শহরেই ধীরগতির ইন্টারনেটের জন্য অতিষ্ট সবাই, সেখানে উপচে পড়া ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের সদব্যবহারে রপ্তানীর নামে পাঁচার করা হচ্ছে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে।

তবে সবচেয়ে যে বড় প্রজেক্টের জন্য আওয়ামী লীগ দেশের রাজনৈতিক ময়দানকে ঘোলাটে করছে তা হলো বাংলাদেশের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন, বেঁচে থাকার প্রশ্ন, টিপাইমুখ বাঁধ। ভারত সফর শেষে জানানো হয়েছিল মনমোহন কথা দিয়েছেন বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি হয় এমন কোন বাঁধ নির্মান করা হবে না। অথচ ঠিকই বাধ তৈরীর কাজ চলছে দূর্বার গতিতে। টিপাইমুখে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ‘বাঁধ না ড্যাম হচ্ছে’ এক সম্পাদকের এ প্রশ্নে দিল্লী সফররত শেখ হাসিনা হাসতে হাসতে বলেন, “আমরাও জানি না বাঁধ, না ড্যাম, না অন্য কিছু হচ্ছে।” গত বছরের মাঝামাঝিতে সংসদীয় পিকনিক পার্টি ঘুরে আসে প্রকল্প এলাকা। ওই দলের প্রধান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক দেশে ফিরে বলেন, তারা টিপাইমুখ প্রকল্প এলাকায় গিয়েছিলেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে নিচে নামতে না পারলেও হেলিকপ্টার থেকে নিচে বাঁধের কোনো স্থাপনা দেখতে পাননি। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, টিপাইমুখ সমস্যা বড় নয়। টিপাইমুখ সমস্যা নিয়ে জামায়াত আন্দোলন করায় আওয়ামী লীগের বন্ধুরা বলেছিল টিপাইমুখ আন্দোলনের নামে সুযোগ নিচ্ছে মৌলবাদীরা। এ সবকিছুই একথা প্রমাণ করে যে আওয়ামী লীগ চায় না টিপাইমুখ বাঁধ নির্মান কারো নজরে আসুন, নির্বিঘ্নে, নিরাপদে শেষ হোক বাঁধ নির্মান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আগামীর যুদ্ধ হবে পানির যুদ্ধ, সে যুদ্ধ আনবিক যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর। অথচ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বাঁধ নির্মান কাজ। যে বাঁধের ফলে ৬০ হাজারেরও বেশী ভারতীয় উপজাতি প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, তাদেরকে উপেক্ষা করেও বাঁধ নির্মানে বদ্ধপরিকর ভারত, সে বাঁধ নির্মান তারা কিছুতেই বাতিল করবে না বাংলাদেশের স্বার্থে, বিশেষ করে যখন এ দেশেই রয়েছে সেবাদাসী সরকার। ২৮ এপ্রিল ৮হাজার ১ শত ৩৮ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিতব্য ১৫শ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রোজেক্টের সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে Sutlej Jal Vidyut Nigam Ltd (SJVN), NHPC Ltd এবং মনিপুর সরকার। ইতোমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ শুরু হয়েছে। বাঁধ নির্মান কাজ শুরু হওয়ায় বরাক নদী ও মাকরু নদীর উপর নির্মিত সেতু সহ ১০টিরও বেশী সেতু পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নতুন ৪টি সেতু গত ৫ জুন উদ্বোধন করেন মনিপুরের শ্রমমন্ত্রী কে. রঞ্জিত সিং। আর এসব ব্রিজ নির্মান কাজ শুরু হয় ২০০৬ সালের নভেম্বরে। ভাবতে অবাক লাগে যে বাধের আনুসঙ্গিক কাজ কয়েকটি বছর পূর্বেই শুরু হয়ে গেছে সে বাঁধের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পায় না আওয়ামী লীগ।

আর এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বিদ্যুৎ সমস্যার ধুয়ো তুলে আগামীতে টিপাইমুখ বাঁধ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের নামে বাঁধটিকে চালু করার বৈধতা দেবে আওয়ামী লীগ, যেমনটা দিয়েছিল শেখ মুজিব ফারাক্কা বাঁধের জন্য। পরীক্ষামূলক চালু করার যে অনুমোদ সেদিন ভারত পেয়েছিল, বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল মরুপ্রায় হওয়ার পরও সে পরীক্ষা শেষ হয় নি আজো। টিপাইমুখ বাঁধের বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যেই একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নষ্ট হয়ে যায়, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে আপাত সমস্যায় গোঁজামিল দেয়া হয় যাতে টিপাইমুখ বাঁধ পুরোপুরি চালু করার সময় সহজেই ভারতের টোপ বাংলাদেশীদের গেলানো যায়।

ভূতত্ত্ববিদরা আশংকা করছেন ভারতীয় ও রার্মিজ শ্লেটে প্রতিনিয়ত ঘর্ষণ হয়, এবং এর ফলে যে ভূমিকম্পের উদ্ভব তা টিপাইমুখ এলাকার অতি সন্নিকটে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মান সম্পন্ন হলে বেড়ে যাবে ভূমিকম্পের হার, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকা শহর যেখানে মাঝারী মাত্রার ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোকের হতাহতের সম্ভাবনা, সেখানে দাদাদের মনোরঞ্জনে আওয়ামী লীগ টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানে আগবাড়িয়ে সহায়তা দিচ্ছে। টিপাইমুখ বাধের ফলে বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে ক্ষতি হবে তার চেয়ে ভারতের দাদাদের আশীর্বাদই শেখ হাসিনার জন্য অনেক মূল্যের।

বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ বিপদ। টিপাইমুখ বাঁধ যে কোন মূল্যে এখনই বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে ভারতকে। বাধ্য করতে হবে সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। আওয়ামী লীগ যতই পানি ঘোলা করুক না কেন, রাজবন্দীদের মুক্তিই শুধু নয় বরং যে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানকে নির্বিঘ্ন করতে এ নাটকের মঞ্চায়ন দেশপ্রেমী জনতাকে সাথে নিয়ে তা মোকাবেলায় সবাইকে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। ভারতীয় দালালমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের তাই কোন বিকল্প নয়।

Shri S. K. Garg, CMD, NHPC Limited, (centre) Shri H. K. Sharma, CMD, SJVN Limited (extreme right) and Shri L. P. Gonmei, Principal Secretary (Power), Govt. of Manipur (extreme left) after signing of the MoU.

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ঘোলা পানিতে টিপাইমুখ বাঁধ” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. mushfiq বলেছেন:

    আপনার বক্তব্য সমর্থন করতে না পারায় দু:খিত ।
    আওয়ামী লীগ লজ্জাবতী গাছের পাতা নয় যে কোন নীরস প্রহরীর দৃষ্টির ছোয়ায় তারা মুষড়ে যাবে ।
    .
    জা.বি.তে ছা.লীগ নেতা জসীমের ধর্ষণের সেঞ্চুরীতে বিলানো মিষ্টির ভাগ না পাওয়ায় হয়ত আপনার এমন অভিযোগ ।
    .
    ইডেনের ঘটনা ও হয়ত আপনার মত ভাগ্যহতদের জানার সুযোগ হয়নি । আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়
    নেতারা অবৈধ কি বৈধ কোন প্রণয়েই নারীদের মত যে লজ্জায় আরক্ত হয়না তা আর কারো অজানা নয় ।
    .
    ভারতের সাথে অবৈধ প্রেমলীলা জেনে যাওয়ায় বিরোধী দলগুলোকে সরকার দমন করছে একথাটি হাস্যকর । বিরোধী দলগুলোকে সরকার দমন করছে রুটিন ওর্য়াক হিসেবে । বিরোধী দল তাদের অবৈধ প্রেমলীলায় বাধা দেবে বা প্রতিবাদ করবে এই ভেবে নয় ।
    .
    বিরোধী দলের প্রতিবাদে লজ্জাবনত হ।ওয়ার মত দল আওয়ামী লীগ নয় ।
    .

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন