আড্ডাঘর

“কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই…”

মফস্বলে তো আর কফি হাইজ নেই তাই আমাদের আড্ডার দৌড় সর্বোচ্চ নিরঞ্জন ‘কার দোকান পর্যন্ত। গ্রাম্য বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর কিংবা শকুনী লেকের স্বচ্ছ টলমল জলে রাজহংসীর মতো ভাসোমান ভাঙ্গা বোটটিও আমাদের আড্ডায় প্রাণ এনে দিত।

আড্ডা আমাকে বরাবরই আপন করে নিয়েছে। আমি আড্ডা ছাড়তে চাইলেও আড্ডা আমাকে নববধুর মতো আঁচলে বেধে রাখতে চায়। তাই যেখানেই আড্ডা, সেখানেই আমি কিংবা আমি যেখানে সেখানেই জমে ওঠে আড্ডার জমজমাট আসর।

কলেজে পড়ার সময় হোস্টেলে আমার আট নম্বর রমটি আড্ডার তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। দলে দলে বন্ধু এসে আড্ডা দেয়, আবার চলে যায় পড়ার টেবিলে। মাঝ রাত পর্যন্ত পড়ে পড়ে মেধাবী ছাত্রগুলোর চোখ যখন ঘুমে ঢুলুঢুলু, তখনই চাঙ্গা হতে এসে জুড়ে বসত আমার আড্ডা ঘরে, উপরি হিসেবে পেত এককাপ ধুমায়িত চা। সবাই পড়ার ফাঁকে আমার রুমে আড্ডা দেন, আর আমি আড্ডার মধ্যমনি হয়ে পড়াশুনাকে শিকেয় তুলে চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে যাই।

আড্ডা মানেই যে প্রেম, রাজনীতি আর অশ্ল্লীলতার অশ্রাব্য কথার ফুলঝুড়ি, তাতো নয়, আড্ডা থেকে অনেক সময় বেরিয়ে আসে যুগান্তকারী সব সমাধান। একে অন্যকে ভালোবাসার, বন্ধুর জন্য বন্ধুর নিঃশর্ত সহযোগিতার হাত বাড়ানোর বিরল দৃষ্টান্তগুলোও আড্ডায় সৃষ্টি হয়।

ভালোবাসার রঙ্গীন সুতোয় বোনা এমন অনেক আড্ডার স্মৃতি আজো সমানভাবে আমাকে নাড়া দেয়। কিছু কিছু সুখের স্মৃতি কিছুতেই ভোলা যায় না, ভুলে থাকা ঠিকও নয়।

সেদিন “আসমান ভাইঙ্গা জোৎস্না” নেমেছিল আমাদের আড্ডা ঘরে। আমাদের আড্ডা ঘরের নতুন বন্ধু বিলুর বাড়ির উঠোনে জমেছে আমাদের বিরল আড্ডা। বিলুর আসল নাম বেলায়েত কিন্তু অল্প দিনেই ও আমার এতটা আপন হয়ে ওঠে যে ওকে আদর করে বিলু নামে ডাকা শুরু করি। বিলুর মা যত্ন করে আমাদের জন্য খিচুরি রেঁধেছেন, অমন খিচুরির স্বাদ আজো আমার মুখে লেগে আছে।

বিলুরা কিছুদিন আগে খুলনা থেকে এসে গ্রামে বসবাস শুরু করেছে। ওর বাবা খুলনা জুট মিলের শ্রমিক ছিলেন। মিল বন্ধ হওয়ায় গ্রামের ভিটেয় আস্তানা গেড়েছেন। অত্যন্ত কষ্টে ওদের দিন কাটছিল। ওর বৃদ্ধ বাবা বেকার ঘরে বসে, ওর মা শেলাই মেশিনে গ্রামের রমনীদের সায়া-ব্ল্লাউজ তৈরী করে চাল-ডালের সংস্থান করতে হিমশিম খায়। আর আমাদের বিলু দু’একটি টিউশনি করে কোনভাবে পড়ালেখা চালায়।

অনেকদিন ধরেই ওদের বাড়ীর ভিটায় মাটি দেয়া জরুরী হয়ে পরে। পুরনো বাসায় ঝড়-বৃষ্টিতে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, কষ্টের জীবনটাকে আরো অসহনীয় করে তোলে। কিন্তু ওদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে ভিটেয় নতুন মাটি ফেলা ওদের আর হয়ে উঠছিল না। আমরা হয়তো ওদেরকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারতাম কিন্তু বন্ধুকে এভাবে সাহায্য করে হেয় করতে ইচ্ছে হলো না।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ওদের ভিটেতে আমরা বন্ধুরা মিলে মাটি কেটে ভরাট করে দেব। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু মোতালেবকে কথাটি বলায় ও সাগ্রহে রাজী হলো। ঠিক করলাম সব বন্ধুদের মতামত নেব। বন্ধুদেরকে বললাম যারা সাগ্রহে রাজী আছো তারা এসো, যাদের মনে সংকোচ বা দ্বিধা কাজ করবে তারা এসো না। এটা কারো জন্যই বাধ্যতামূলক নয়।

শেষ পর্যন্ত আমরা আট বন্ধু সন্ধ্যের সময় ওদের বাসায় হাজির। বিলুর বাবা-মা কিছুতেই মানতে রাজি নন। এতোগুলো অনার্স পড়ুয়া ছেলে মাটি কাটবে এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না, বলেন, সমাজের কাছে তো আমি মুখ দেখাতে পারবনা। আমি বলি খালা, আমরা তো সবাই আপনার ছেলে, ছেলে হয়ে মায়ের জন্য এটুকু কাজ নিজের মনে করে করতে পারবো না, তবে আমাদের সার্টিফিকেটের মূল্য রইলো কোথায়? তিনি আমার কথায় কিছুটা দ্বিধা, আর চোখভরা আনন্দাশ্রু নিয়ে আমাদের জন্য খিচুরি রাঁধতে গেলেন।

মহা উৎসাহে আমরা মাটি কাটি, কোদালের প্রতি কোপে আমাদের আত্মঅহমিকা চূর্ণর্ বিচূর্ণ হয়ে বেলে মাটির মতো ঝরে যায়। আমাদের নরম হাতের ফোস্কা গলে গলে বেড়িয়ে যায় যত ক্লেদ।

“আসমান ভাইঙ্গা জোৎস্না পরে”। জোৎস্নার রূপালী আলো আমাদের নোনা শরীরে পড়ে চিককিম করে। আমাদের আঁধার ভূবন আলোয় আলোয় ভরে যায়। আমরা স্বর্গীয় রূপালী আলোর স্রোতে গা ভাসিয়ে অমৃতসম খিচুরী খাই। আহ! অমন স্বাদের আড্ডা ঘর, অমন স্বাদের খিচুরী আর অমন জোৎস্নার বান আবার যে কবে ফিরে আসবে!

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন