মাতৃত্ব

মুরগী পালনের প্রতি মায়ের আগ্রহের শেষ নেই। তার সাথে সাথে কয়েকটি মুরগী ঘুরঘুর করবে, নিজের হাতে খাবার খাওয়াবেন এইটুকুই তার চাওয়া। এনিয়ে বাসায় রাগারাগিরও শেষ নেই। বাবা আবার মুরগীর উৎপাত একদম সইতে পারেন না।

মুরগী ডিম পাড়া শুরু করলেই আমরা সাবার করে ফেলতাম। মুরগী আবার ডিম গুনতে পারে না। তবে অন্তত একটা ডিম না থাকলে কিছুতেই ডিম পাড়তে চায় না। তাই সবসময় মাটির পাত্রে কিছু খরকুটো বিছিয়ে তার উপর একটা ডিম রেখে দিতাম, ওতেই মুরগীটা আস্বস্ত হয়, ডিম পাড়ে।

অবশেষে মা সিদ্ধান্ত নিলেন আর প্রতারণা না করে এবার মুরগীটাকে বাচ্চা ফোটানোর সুযোগ দেয়া হবে। বাজার থেকে কয়েকটা মুরগীর ডিম কিনে আনলাম, সাথে কয়েকটা হাসের ডিমও। মুরগীটাও মহাউৎসাহে ডিমে তা দিতে শুরু করল।

দু’দিন তা দিতে না দিতেই মুরগীটার ভেতর মাতৃত্ব আর কর্তৃত্ব দু’টোই প্রকাশ পেল। আগে মুরগীটা আমাদের হাতে খুদকুড়ো খেত, আর এখন দেখলেই ফুঁসে ওঠে, কখনো কখনো তেড়ে আসে। মুরগীটার এমন মারমুখী চেহারা দেখে আমরা হেসে বাঁচিনা। সারাদিন ডিমের উপরেই পড়ে থাকে, সময়-সুয়োগ পেলে বেশ বিরক্তি নিয়েই অল্পকিছু দানাপানি মুখে দেয়। বেশ কয়েকদিনেই মুরগীটা না খেয়ে না খেয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে।

দেখতে দেখতে ডিমের সাদা সুরাপ্রাচীর ভেদ করে হলুদ মাখা নব বধুর মতো মিষ্টি মুখের কয়েকটি মুরগীর ছানা বেরিয়ে এলো। একটার চেহারা একটু খারাপ, ঘাড়ের কাছে মোটেই পালক নেই, দেখলেই কেমন যেন লাগে। তবুও তুলতুলে, ফুটফুটে বাচ্চাগুলোর অবাক চাহনী দেখে আমাদের আনন্দ আর ধরে না। এর মাঝে কয়েকটা হাসের বাচ্চা আছে, তবে মজার ব্যাপার হলো মুরগীটা এখনো পার্থক্যটা হয়তো বুঝতে পারে নি।

তখনো সব ডিম ফোটা শেষ হয় নি। কিন্তু নতুন বাচ্চাগুলোর দুরন্তপনায় মা-মুরগীটার মনে অশনি সংকেত বাজে। তাই বাকী ডিমগুলো ছেড়ে নতুন বাচ্চাদের নিয়েই বেড়িয়ে পড়ে খাবারের সন্ধানে। আমার মা তখন ডিমদু’টোকে গরম কাপড়ে জড়িয়ে ফোটানোর ব্যবস্থা করেন।

মা মুরগীটা এটা ওটা দেখে বাচ্চাদেরকে দেখায়, খুটে খুটে খাওয়ার অভিনয় করে বাচ্চাদের খাওয়া শেখায়, আর আমাদেরকে কাছে পেলেই তেড়েমেড়ে আসে। মাঝে মাঝে কাকে উৎপাত করে, মুরগীটা তার ওড়াওড়ির সমস্ত মতা দিয়ে কাকের পিছু নেয়। কখনো বা ফুটফুটে মুরগীর বাচ্চা দেখে শাহানার উপোষী পাজি বেড়াল গুলোর জিভে জল আসে, জিভ দিয়ে ঠোট ভেজায় কিন্তু মা-মুরগীটার সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে ওদের আর ভূড়িভোজ করা হয় না।

একদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির দিনে গাছের ছায়ায় মা-মুরগীটা ডানা ছড়িয়ে বাচ্চাদের সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু হাসের বাচ্চাদের কি আর এমন দিনে ধরে রাখা যায়। এক দৌড়ে হাসের ছানাগুলো গিয়ে নামলো পুকুরের শীলত জলে। মা মুরগীটা হায় হায় করে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে পুকুর পাড়ে যায়, অনুনয় বিনয় করে, শাসন করে কিন্তু কোন কিছুতেই ছানাগুলো পানি থেকে ওঠে না। মুরগীটা বার বার পুকুরের পাড়ে চক্কর খায়, কক কক করে কান্নাকাটি করে কিন্তু দস্যি হাসের ছানাগুলোর উল্লাস তাতে বাড়ে বই কমে না। হায়রে বেচারী, চোখের সামনে ডিম ফুটে হাসের ছানা বেরোল তবু কিছুতেই মানতে চায় না যে ওগুলো মুরগীর ছানা নয় ওগুলো হাসের ছানা, পানিই ওদের নিরাপদ আশ্রয়। আসলে গর্ভধারণ করলেই কেবল মা হওয়া যায় না, মা হতে হলে সবার আগে চাই মাতৃত্ব। তাইতো মুরগী হয়েও হাসের বাচ্চাদের জন্য মা-মুরগীটার দূর্ভাবনার শেষ নেই।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস ০৬-এর জন্য লেখা

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“মাতৃত্ব” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    লেখাটা পড়ে খুবই ভালো লাগলো।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন