কি লিখি আজ ভেবে না পাই …..

“ইশ্বর কহিলেন, দীপ্তি হউক, তাহাতে দীপ্তি হইল। ইশ্বর দীপ্তিকে উত্তম দেখিলেন এবং অন্ধকার হইতে দীপ্তিকে পৃথক করিলেন।”

ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর এই বাণী আমাদেরকে আঁধার ত্যাগ করে আলোর পথে চলতে শেখায়, কিন্তু আঁধার যেহেতু আলোর চেয়ে প্রবীন তাই আমরা বার বার আঁধারে ফিরে যাই, অজ্ঞতার দিকে ফিরে যাই, অশ্লীলতার দিকে ফিরে যাই।

সেই শৈশবে স্বপ্ন দেখেছি কবি হওয়ার, লেখক হওয়ার। ক্লাস ফোরে লেখা ভুতের গল্প আর বন্যা নিয়ে লেখা কবিতা যখন আমাকে সবার হাসির পাত্রে পরিণত করে তখনই বুঝেছি আমার দ্বারা আর যা-ই হোক, লেখা হবে না।

পরিণত বয়সে এসে আবার লেখালেখির প্রতি দূর্বলতা আসে। হয়তো বয়সের দোষ। কিন্তু লিখলে যদি জনপ্রিয়তা না পাই, যদি কেউ পড়তে না চায়, দুষ্টু ছেলেমেয়েদের ঘুমপাড়াতে যদি আমার লেখা পড়ে শোনার হয়, সেই ভয়েই লিখতে সাহস করিনি।

জীবনের প্রথম লেখাগুলো সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হলে যৌন বিষয়ক লেখার বিকল্প নেই। না, কথাটা পুরোপুরি ঠিক হলো না। ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হেনেও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা যায়। তবে সবার বুকের পাটা তো আর টারজানের মতো নয় যে জলে বাস করে কুমিরের সাথে বিবাদে জড়াবে। লেখার সহজ কাটতির জন্য যৌনতার বিকল্প আমার চোখে আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই লেখালেখি শুরুর দিকে যৌনতা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে, আদম-হাওয়ার মতো আমারও তৃতীয় নয়ন খুলে দিতে চেয়েছে। কিন্তু স্বর্গচু্যত হওয়ার সাহসও শেষ পর্যন্ত আমার হয়ে ওঠে না।

আমি ভেবে পাই না, লেখালেখি কি শুধু আমার নিজের জন্য হওয়া উচিত, নাকি হওয়া উচিত সমাজের জন্য কালের জন্য, ভবিষ্যত মানব সভ্যতার জন্য। রবীন্দ্রনাথের লেখা, লালনের সুর আজো আমাদের সমানভাবে টানে, সর্বাধুনিক থিয়েটারে আজো সফলভাবে মঞ্চস্থ হয় শেক্সপিয়রের ড্রামা। এদের কারো লেখায়তো ধর্মীয় উস্কানী নেই, নেই রগরগে যৌনতা। তাদের যুগে যৌনতা নিয়ে মাতামাতির কোন কমতি ছিল না বরং আমাদের চেয়ে তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা ঢের বেশি ছিল। যৌনতা নিয়ে লেখালেখির ঝড়ও বয়ে গেছে ছাপাখানার বদ্ধ ঘরে। কিন্তু সেই রগরগে লেখাগুলো আজ ইতিহাসের আস্তকুঁড়েও খুঁজে পাওয়া যায় না।

দাসপ্রথা মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলংকজনক অধ্যায়। যুগে যুগে এ অমানবিক ও অনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশে দেশে আন্দোলন হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে। দাসরা কখনো মুক্ত হয়ে আবার তাদের প্রভুদের দাসে পরিণত করেছে। এভাবেই দাস প্রথা যুগ যুগ ধরে মানবজাতির কপালে কলংক লেপন করেছে।

কিন্তু হেরিয়েট বীচার (১৮১১-১৮৯৬) নামের এক ক্ষুদে মহিলা এই দাস প্রথার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, লিখেছেন ‘আঙ্কল টমস কেবিন’, সকল মানুষের মানবতাবোধকে তুমুল বেগে নাড়িয়ে দিয়েছেন, মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলেছেন। ফলাফল আমাদের সবারই জানা। মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহৎ যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন তিনি, আমেরিকা থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন কৃতদাস প্রথা। ১৮৬২ সালে তিনি যখন আমেরিকার মহান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সাথে দেখা করেন, লিংকন সবার সামনে তাকে পরিচিয় করিয়ে দেন, “দ্য লেডি হু মেড দিস বিগ ওয়ার” বলে। আজো যখন তাঁর নাম কারো কাছে শুনি, আজো যখন তাঁর নাম কোন পত্র-পত্রিকায় দেখি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। পৃথিবী একদিন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু মানুষের মাঝে যতদিন মনুষত্ব থাকবে, স্বাধীনতার জন্য আকুতি থাকবে, কেউ কি পারকে তাঁকে ভুলে যেতে?

ইতিহাস সৃষ্টিকারী লেখকের উদাহরন দিয়ে শেষ করা যায় না। “সাম্য, মৌত্রি, স্বাধীনতার” অমিয় বাণী নিয়ে যে ফরাসী বিপ্লব সাধিত হয় তার মূলে রয়েছে জ্যঁ জ্যাক রুশোর “দ্য সোস্যাল কনট্রাক্ট” গ্রন্থটি। কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিক এঙ্লেস যৌথভাবে “রেভুলশনারী প্রলেতারিয়ান সোস্যালিজম” বা “কমিউনিজম”-এর থিউরি ও কৌশল রচনা করে বিশ্বব্যাপী বিপ্লব সাধন করেছেন। চার্চলস ডারউইনের “দি অরিজিন অব স্পেসিস” গ্রন্থ, গ্যালিলিও গ্যালিলি আর কোপার্নিকাসের থিউরি ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, মানব সভ্যতার সামনে খুলে দিয়েছে জ্ঞানের অবারিত দ্বার।

তাহলে আমি কেন একান্ত আমার জন্যই লিখে যাবো, আমি কেন আলোকিত মানুষের অনুসারী হবো না। আমার সীমাবদ্ধত আছে, কিন্তু আমরা সবাই সীমাবদ্ধতার মাঝে বেঁচে আছি তা আমি মানতে পারি না। আমাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের হেরিয়েট, রুশো, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। আমরা যদি তাদের মতো আলোকিত মানুষ না-ও হতে পারি তবে তাদের দেখানো আলোর পথে চলতে আমাদের বাধা কোথায়। “ইশ্বর দীপ্তিকে উত্তম দেখিলেন” আমরা কেন অন্ধকারে ফিরে যাব, আমরা কেন আলো দেখে চোখ ফিরিয়ে নেব। আসুন সবাই আলোকিত মানুষ হই, অন্তত আলোকিত মানুষের মিছিরের শেষে হলেও চলার চেষ্টা করি।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন