শ্রমিক অসন্তোষ : শেষ কোথায়?

২০০৯ সনের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহে নিহত হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। প্রাথমিক তদন্তে বিডিআর বিদ্রোহের কারন আর্থিক দাবীদাওয়া ও সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি সাধারণ সৈনিকদের নেতিবাচক মনোভাবকে দায়ী করা হয়। বিদ্রোহীরা প্রধানমন্ত্রীর দাবীদাওয়া নিয়ে দেখা করলে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ক্রমে দাবী মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এখনো এ বিদ্রোহ মামলার শুনানী চলছে, চলছে বিচার, দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে বিডিআর জওয়ান,  আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ সাজা পাচ্ছেন কেউ কেউ। যে অপরাধ বিডিআর বিদ্রোহীরা করেছিল সেদিন, এসব শাস্তি তাদের অপরাধের তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ। কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে এতবড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে আমরা কিছুই শিক্ষা গ্রহণ করলাম না। শিখলাম না যে নায্য দাবী দাওয়া মানা না হলে তার পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে। অনেকেই এর সাথে বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। অথচ একবারও আমরা এ কথা ভাবছিনা কিভাবে শত্রুরা আমাদের ঘরে ঢুকে আমাদের ভাইয়ের হাত দিয়েই আমাদের খুন করছে। একবারও চিন্তা করছি না যে শাস্তিই সমাধান নয় বরং এ ধরণের বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞে উস্কে দেয়া সমস্যাগুলো আগে সমাধান করা প্রয়োজন।

আবার অশান্ত তৈরী পোষাক শিল্প। ২০০৬ সালের ভয়াবহ শ্রমিক অসন্তোষে রূপ নিচ্ছে শ্রমআন্দোলন। সেদিনও ন্যূনতম মজুরীর দাবীতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল গার্মেন্টস কর্মীরা। বেশকিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান ও জীবনের বিনিময়ে সেদিন আদায় হয়েছিল নূত্যতম মজুরী। এরপর কেটেছে ৪টি বছর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের আকাশছোয়া দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যের চরমসীমায় ঠেলে দিয়েছিল। এ দেশে দ্রব্যমূল্য একবার বাড়লে তা আর কখনোই কমতে চায় না। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। চার বছর পূর্বের সর্বনিম্ন বেতন ১৬৬২ টাকা ৫০ পয়সায় এখন কোন ব্যক্তির পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই বেতন বাড়ানোর নায্যদাবী নিয়ে শ্রমিকরা আবারও রাজপথে, চলছে মিছিল মিটিং, ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ। আশাকরা যায় এবারও দাবী আদায়ে জীবনদান ও  তৈরী পোষাক শিল্পের চরম ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে অর্জিত হবে শ্রম অধিকার।

বাংলাদেশে কোন দাবীই আন্দোলন ছাড়া আদায় হয় না। ভদ্রভাবে যার যার পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার স্বভাব নেই এদেশে। ‘দেব না, পারলে আদায় করে নাও’ এমন একটা অলিখিত শর্ত যেন জুড়ে আছে বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে। তবে কি ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে অসভ্যরাই চালায় দেশের শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, সবকিছু? আমরা যখনই মিডিয়ায় মুখ দেখাই, আমাদের তৈরী পোষাক শিল্পের গুণকীর্তনে পুরোহিতদেরও হার মানাই, শ্রমবাজার নিয়ে গর্বে আমরা বুকফুলিয়ে চলি। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির তরী যে শ্রমিকদের ঘামের সাগরে ভেসে আছে, যাদের কষ্টার্জিত টাকায় আমাদের বিলাস-বসন, তাদের ন্যায্য অধিকারটুকু আমরা দিতে নারাজ। ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে সে অনেক দিন আগে, অথচ আজও আমরা শ্রমিকদের সাথে যে অমানবিক আচরণ করে চলেছি তা ক্রীতদাস প্রথাকেই ভিন্ন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনছে মাত্র।

শ্রমিক অসন্তোষ হলেই মালিকপক্ষ নিজেদের দায় এড়াতে সরাসরি একটি বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্রের গন্ধ ছড়ায়, সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয় তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অলিক গল্পের কথা। অনেকেই আবার বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা বলেন। হ্যা, বিদেশী যড়যন্ত্র থাকাটাই স্বাভাবিক, তৈরী পোষাক শিল্পে এবং শ্রমবাজারে আমাদের প্রতিদ্বন্দী দেশের অভাব নেই। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০২৫ সালের মাঝে বিশ্ব শ্রমবাজারের ২৫% দখল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বলাই বাহুল্য ভারতের এ ২৫% এর মাঝে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেকেই নোংরা ষড়যন্ত্রের জাল বুনতেই পারে কিন্তু কি কি পথে সে জাল আমাদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে পারে তা একবারও কেন ক্ষতিয়ে দেখব না আমরা?

এ কথা কি মিথ্যে যে একজন নাগরিকের পক্ষে ১৬৬২ টাকায় ঢাকা ও তার আশপাশে বেঁচে থাকা অসম্ভব? কি আশ্চয়! আমাদের সমাজপতিরা বিয়ে করেন, সন্তান উৎপাদন করেন অথচ শ্রমিকদেরও যে পরিবার থাকতে পারে তা তারা বেমালুম ভুলে থাকতে চান। ন্যূনতম মজুরী নির্ধারণের সময় কি করে তারা একজনের হিসেব ধরে বেতন নির্ধারন করেন? যে বেতনে একজনের বেঁচে থাকা দায় সে বেতনে কি করে সে অন্ন জোগাবে বৃদ্ধ মা-বাবার মুখে, কি করে সে আহার যোগাবে অপুষ্ট শিশুর মুখে, কি করে ঢেকে দেবে বউয়ের ইজ্জত? হ্যা, সমাজের পুঁজিপতিদের অনেকেই বাবা-মায়ের খোঁজ রাখেন না, অশিক্ষিত মূর্খ বাবা-মায়ের পরিচয় দিতেও এদের অনেকে লজ্জা বোধ করে, কিন্তু সমাজের নীচু শ্রেণীর মানুষেরা নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি দূরে ঠেলে দেয়ার মতো সভ্য হতে পারে নি। তাদের বেঁচে থাকতে হলে পরিবারের সবার বেঁচে থাকা নিশ্চিত করেই বাঁচতে হয়।

এ কথা মিথ্যে নয় যে বাংলাদেশে শ্রমের মূল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় সস্তা, আর তাই এ দেশের তৈরী পোষাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তাই বলে শ্রমিকদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও দেয়া হবে না এ কেমন ভদ্রতা? ওরা না হয় মরেই যাবে, মরে গিয়ে সরকারের জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীকে না হয় সফল করবে, কিন্তু ওদের দিয়ে যদি কাজই করাতে হয় তবে কাজ করার শক্তি অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কি ওরা পেতে পারে না? ওদের জন্য নয়, মালিকদের আরাম আয়েশ নিশ্চিত করার জন্য হলেও ওদের শরীরের ক্যালোরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন এটুকু কমনসেন্সও কি শিল্পমালিকদের থাকতে নেই?

মালিকদের পক্ষ থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলা হয়, অথচ সরকার কিন্তু স্বীকার করছে না যে অর্থনৈতিক মন্দায় তৈরী পোষাক শিল্পে তেমন প্রভাব পড়েছে। তারপরও মন্দাকে ধরে যদিও নেয়াও হয়, তবু মালিকপক্ষের কাছে প্রশ্ন, আপনাদের খারার মেন্যু থেকে কি কি আইটেম কমিয়েছেন এ মন্দার কারণে?  না, বিশ্বমন্দা মোকাবেলার দায় শুধুই শ্রমিকদের, মালিক পক্ষের হবে কেন, তারা শুধু শেরাটন সোনারগাঁওয়ে বিদেশী ক্রেতাদের সাথে লাঞ্চ করবেন। তবে প্রয়োজন কোন আইন মানে না, তাই অভুক্ত মানুষগুলো যদি মালিকদেরকে লাঞ্চের টেবিলে লাঞ্ছিত করে তবে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

আমি নিজেও একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। সকাল থেকে মাঝে মাঝে মধ্যরাত অবধি শ্রম দেই, তবু আমার অভিযোগ নেই মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে, কারণ আমার বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত মাইনে তারা ঠিকই তুলে দিচ্ছেন আমার পকেটে, দিচ্ছেন উৎসব ভাতা, উৎসাহ ভাতা। মালিকপক্ষ যদি শ্রমিকদের সমস্যা বোঝেন, তবে তারাও আর শত্রু ভাববে না মালিকপক্ষকে, যে প্রতিষ্ঠানের চাকা সচল হলে অন্ন জোটে সে প্রতিষ্ঠানে শুধু শুধু আগুন দেয়ার মতো অবিবেচন নয় নিশ্চয়ই কেউ।

তবে সুযোগ সন্ধানীর অভাব নেই সমাজে। অনেকেই তৈরী পোষাক শিল্পের অস্থিরতাকে পুঁজি করে শ্রমিক নেতা সাজার পায়তারা করবে। এদের থেকেও সবাইকে হুশিয়ার থাকতে হবে। শ্রমিকদের অসন্তোষকে পুঁজি করে শিল্প কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালু করার পায়তারাও চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে ট্রেড ইউনিয়নকে কখনোই নায়কের ভূমিকায় দেখা যায় নি, বরং খলনায়ক হয়ে শিল্প-কারখানা ধ্বংসে এটি নেতিবাচক অবদান রেখেছে। তাই বুদ্ধিজীবীদের কলমের অত্যাচারে ট্রেড ইউনিয়নকে মেনে নেয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠনেরও কথা শোনা যায়। কিন্তু মনে রাখা দরকার অভূক্ত মানুষকে ডান্ডা দিয়ে ঠান্ডা করা যায় না, তাতে হীতে বিপরীতই হবে মাত্র।

শ্রমিক মালিক ভাই ভাই, এমন শ্লোগান অনেক শুনেছি। এবার সময় হয়েছে তা বাস্তবায়নের। শ্রমিকরা কাজ চায়। একজন ভিক্ষুকও ঢাকা শহরে আয়েশী জীবন যাপনের উপযোগী আয় করতে পারে। তবুও এরা কেউ কিন্তু ভিক্ষে করার কথা ভাবে না। এরা গ্রামে গঞ্জের সাধারণ ঘরের সন্তান হলেও এদের কোন না কোন ভাবে এলাকায় সম্মান আছে, আছে আত্মসম্মান বোধ। তাই এরা কারো করুনা চায় না বরং এরা কাজ চায়, কাজের নায্য মূল্য চায়। কোন এক হোটেলের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, “We never sleep so that you can sleep well”, আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরাও মালিকপক্ষের আরাম আয়েশ আর হাজারো অপচয়ের দুয়ার খুলে দিতে নিজেরা কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত, শুধু তারা বেঁচে থাকার গ্যারান্টি চায়। আসুন না তাদেরকে মানুষ হিসেব স্বীকৃত দেই, স্বীকৃতি দেই তাদের শ্রমের। মনে রাখা দরকার ডান্ডা দিয়ে ঠান্ডা করার যুগ শেষ হয়েছে। তাই অন্যের কাছ থেকে সম্মান পেতে অন্যকে সম্মান দিতে জানতে হয়, ভালোবাসা দিয়েই ভালোবাসা জয় করা যায়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“শ্রমিক অসন্তোষ : শেষ কোথায়?” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    সময়োপযোগী একটি লেখা। ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    আপনাকেও ধন্যবাদ। আশাকরি শ্রমিক অসন্তোষের শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধান হবে।

    [উত্তর দিন]

  2. mushfiq বলেছেন:

    শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে এর চেয়ে পূর্ণাঙ্গ লেথা পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি ।
    জানিনা এর চেয়েও সুন্দর লেখা হয়ত কেউ লিখে থাকবেন ।
    কিন্ত আমার তা পড়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না ।
    .কারণ
    লেখাটিতে
    .শ্রমিক জীবনের করূণ আর্তনাদ ফুটে উঠেছে
    .ফুটে উঠেছে তাদের দায়িত্বশীলতার কথাও ।
    .উপেক্ষা করা হয়নি কতিপয় সুযোগ সন্ধানী শ্রমিকনেতাদের অযথা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ভিনদেশী এ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়নের অশুভ চেষ্টার কথা ।
    .তুলে ধরা হয়েছে মালিক পক্ষের শোষণ নিপীড়নের কথা ।
    .শ্রমিকদেরকে এককভাবে দায়ি করার দায়িত্বহীনতার কথা ।
    .সরকারের শ্রমিক দমনের একপেশে নীতির কথাও ফুটে উঠেছে চমতকার ভাবে ।

    [উত্তর দিন]

  3. সাম্য রাইয়ান বলেছেন:

    Your comment is wrong about “BDR BIDDROHOW”. Please try to search the right information.

    ThankYou
    Sammo Raian

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন