বিশ্বকাপ উত্তেজনায় পতাকা অবমাননার অবসান হোক

এক সাগর রক্তের বিমিনয়ে অর্জিত লাল সবুজের পতাকা। এ পতাকা আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক, সার্বভৌমত্বের প্রতীক, মর্যাদার প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক। যার অন্তরে ন্যূনতম দেশপ্রেম আছে সে পতাকার অবমাননা হয় এমন কোন কাজ স্বজ্ঞানে  করতে পারে না। জাতীয় পতাকাকে কেউ অসম্মান করে কোন বাংলাদেশীর সামনে থেকে সুস্থ্য দেহে ফিরে যেতে পারবে কি না সন্দেহ। তাহলে একবার ভাবুন তো বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় যদি ল্যাটিন আমেরিকার দেশের নাগরিক অগ্নি সংযোগ করে তবে হৃদয়ে কতটুকু ব্যথা অনুভূত হবে? নিশ্চিত যে, সুযোগ পেলে অনেকেই সেদেশীয় দূতাবাসে আগুন ধরিয়ে দিতে ছুটবেন গুলশান বনানীর ডিপ্লোমেটিক জোনে। অথচ সে একই কাজ করে চলেছি আমরা। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে না হতেই ভিনদেশী পতাকায় আগুন দিলাম আরেকটি ভিন দেশের  পক্ষ নিয়ে, অথচ ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নাগরিকেরা এভাবে প্রতিপক্ষের পতাকা পোড়ানোর মতো ধৃষ্টতা দেখায় না। যে অন্য দেশের পতাকার সম্মান বাঁচাতে জানে না, অন্য দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে মর্যাদা দেয় না সে নিজের দেশকে আসলে কতটুকু ভালোবাসে তা চিন্তার বিষয়।

বিশ্বকাপ শুরু হলেই বাংলাদেশে শুরু হয় পতাকা উত্তোলন নিয়ে বাড়াবাড়ি যা পাগলামিকেও হার মানায়, কেড়ে নেয় অনেক জীবন। এ বছরও পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে পতাকা নামাতে গিয়েও। পতাকা টানানো নিয়ে হয়েছে সংঘর্ষ,  ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘর্ষে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটে এদেশে। পতাকা টানানোর পাগলামি থেকে মুক্ত নয় শিক্ষিত অশিক্ষিত কোন গোষ্ঠীই। প্রাচ্যের অক্সফোর্ট নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ২৭০ গজ দীর্ঘ একটি পতাকা নিয়ে শোভাযাত্রা এবং গোপালগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ৩২০ হাত দীর্ঘ পতাকা প্রদর্শণী আমাদের হুজুগেপনাই প্রমাণ করে। সবচেয়ে লজ্জার কান্ডটি প্রতিবারই ঘটানোর রেকর্ড করছে দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে খ্যাত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রতিবার খেলা দেখার জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে সংঘর্ষ হয়, এবারও বিশ্বকাল ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বুয়েট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আমি জানি না শিক্ষামন্ত্রী,বুয়েটের ভিসি, শিক্ষকমন্ডলী এ ঘটনায় লজ্জিত কি না, তবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের বেহায়াপনা দেখে আমরা সাধারণ মানুষেরা মরমে মরে যাই তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পতাকা ব্যবহারের বিধিমালা আছে, কোথায় কোথায় পতাকা উত্তোলন করা যাবে, কে কে পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন, কতটুকু সময় পতাকা উত্তোলিত হবে ইত্যাদি নিয়ম সকল দেশেই আছে। পতাকার সাইজ, রং, পতাকা কিভাবে প্রদর্শিত হবে, উলম্বভাবে, নাকি সমান্তরালে এসবও নির্ধারিত আছে। নিয়ম বেধে দেয়া আছে কিভাবে পতাকা উত্তোলন করতে হবে এবং কিভাবে আবার তাকে নামাতে হবে, কিভাবে পতাকা সংরক্ষণ করতে হবে, পূরাতন বা জীর্ণ হলে পতাকা কিভাবে সম্মানের সাথে সমাহিত করতে হবে। অথচ এ সবের কোন বালাই নেই আজ দেশে। এমনকি দেশের প্রায় প্রতিটি বাসগৃহে, মার্কেটে, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র পতাকা টানিয়ে রাখা হলেও তা দেখভালের কোন প্রতিষ্ঠান নেই।

বিদেশী পতাকা এ দেশে ইচ্ছে করলেই যে কেউ উত্তোলন করার অধিকার রাখে না। শুধুমাত্র বৈদেশিক মিশনগুলো উত্তোলন তাদের অফিস এবং বাসগৃহে উত্তোলন করতে পারে, এর বাইরে যদি উত্তোলন করতে হয় তবে সরকারী নিয়ম মেনে এদেশীয় পতাকা এবং তাদের দেশীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে। বাংলাদেশের পতাকার সাথে অন্য কোন দেশের পতাকা উত্তোলন করলে অবশ্যই বাংলাদেশের পতাকা সর্বোচ্চে উত্তোলিত হবে এবং আলাদা ফ্লাগ স্ট্যান্ডে উত্তোলিত হবে। কোন পতাকা কোন পাশে উড়বে তাও পতাকা আইনে বলা আছে। পতাকা উত্তোলনের সময় সবাইকে পতাকার দিকে সশ্রদ্ধচিত্তে তাকিয়ে থাকতে হবে এবং বাহিনীর লোকদের স্যালুট সহকারে তাকাতে হবে। অথচ আমরা দেশকে এতটাই ভালোবাসি যে কিসে দেশের অসম্মান হয়, কিসে দেশের অকল্যাণ হয়, কিসে দেশের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় তা দেখার প্রয়োজন বোধ করি না।

জাতীয় সঙ্গীত-পতাকা অবমাননায় শাস্তি থাকবে এমন আশার বাণী সংসদে শুনিয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তবে তা বাস্তবায়িত হয় নি। গালে গালে জাতীয় পতাকা আঁকা নিয়েও প্রশ্ন হয়েছিল, মন্ত্রী জানালেন এতে দোষের কিছু নেই। যে কাজটি করা না করা নিয়ে সুস্পষ্ট আইন আছে তাকে কি করে মন্ত্রী সংসদে দাড়িয়ে বৈধতা দেন তা বোধগম্য নয়। হ্যা, সংসদ আইন পাশ করে, তাহলে সাধারণ মানুষদের ভালোবাসাকে মূল্য দিতে পতাকা আইন পরিবর্তন করা যেতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ না পরিবর্তন হচ্ছে ততক্ষণ আইনকে উপেক্ষা করার অধিকার কারো নেই এমনকি আইন অমান্য করায় প্ররোচিত করার অধিকার কোন মন্ত্রীরও থাকতে পারে না। আইন থাকার পরও আইন প্রয়োগে সরকারের উদাসীনতায় বিশ্বকাপ ক্রিকেটে পাকিস্তানের পতাকা পর্যন্ত উত্তোলিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ নিয়ে কাউকেই কোন জবাবদিহি করতে হয় নি, শুধু জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্যই পাকিস্তানী পতাকা উত্তোলনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

বিশ্বকাপ উন্মাদনা এখানেই শেষ হবে না, সামনে আরো ভয়াবহ শোক সংবাদ শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে দেশবাসীকে। বিগত বিশ্বকাপগুলোতে প্রিয় দলের হেরে যাওয়ায় সন্তান হারা হন অনেক বাবা-মা, আত্মহত্যার হিরিক পরে যায় বাংলাদেশে। এবছরও যে তার ব্যতিক্রম হবে তার কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না বরং পারিপার্শ্বিক অবস্থা আরো ভয়াবহ শোক সংবাদেরই বার্তা বহণ করছে।  এখনই যদি গণ আত্মহত্যা প্রতিরোধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তবে বাংলাদেশের প্রতিটি কোনে কোনেই শোকের মাতম বয়ে যেতে পারে। নিমতলীতে অগ্নিদগ্ধ হলে আমরা রাষ্ট্রীয় শোক করি, একসাথে এত মৃত্যু আমাদের স্নায়ুকে বিচলিত করে, কিন্তু সমসংখ্যক ফুটবল প্রেমী যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তখন তা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয় না, একসাথে তো আর মরছে না, ওগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু যতই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হোক না কেন, সন্তান হারা বাবা-মায়ের বিলাপ সরা দূনিয়ায়ই সমান বেদনার।

অবিলম্বে এ ধরণের অপমৃত্যুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে উদ্যোগ নেয়া হোক। দেশের, প্রয়োজনে বিদেশী সাইকিয়াট্রিকের সমন্বয়ে দ্রুত একটি কমিটি গঠন করে এখনই আত্মহত্যা রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হোক। এক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন আশা করি। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা ভক্তের আত্মাহুতি নিঃসন্দেহে পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর মতো চমকপ্রদ সংবাদ কিন্তু তার চেয়েও একটি জীবনের মূল্য অনেক বেশী, হোক না সে নগণ্য ভিখারীর সন্তান। পাশাপাশি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত জাতীয় পতাকার মর্যাদা নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপ ফুটবলেরও উর্ধ্বে। তাই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রতীক জাতীয় পতাকার অবমাননা রোধে এ বিশ্বকাপের পরপরই বেআইনীভাবে পতাকা উত্তোলন নিষিদ্ধ করণে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হোক, যাতে পরবর্তী সময়ে আর কেউ পতাকা উড়ানোর নামে পতাকার অবমাননা ও অর্থের অপচয়ে সাহস না দেখায়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“বিশ্বকাপ উত্তেজনায় পতাকা অবমাননার অবসান হোক” লেখাটিতে 5 টি মন্তব্য

  1. sharif বলেছেন:

    ভাই আপনি ভালো লিখেছেন সন্দেহ নাই।কিন্তু পতাকা সম্প্ররকে আপনার অভিযোগ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে বিশের নানা দেশ পতাকা দিয়ে অর্ন্তবাস ও বানায়,তাছায়া বুটের লোগো হিসাবেও ব্যবহার করে।তার চেয়ে আমরা অনেক ভালো আছি।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    তা ঠিক। তবে পতাকা আইনই কিন্তু আমাদের সে অধিকার দেয় না। যেহেতু একটা আইন আছে, আমাদের তা মেনে চলা উচিত নয়তো আইন সংশোধন করা উচিত। আইন থাকার পরও যদি আমরা আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাতে থাকি তবে বিশৃংখলা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ থাকে।
    http://www.scribd.com/doc/21966234/Bangladesh-National-Flag-Usage-Guidelines লিংকটা দেখতে পারেন।

    [উত্তর দিন]

  2. Shariful Islam বলেছেন:

    আমাদের দেশের হুজুগেপনা বন্ধ হবে কখণ???

    [উত্তর দিন]

  3. Liku বলেছেন:

    Your complain against flag hoisting is baseless. Try to evaluate public feelings. Just listen…, it’s not possible to count how many flags have been hoisted during the current world cup. But do you think all those who have hoisted the flags of other countries love those countries more than Bangladesh. The answer is ‘no’. If it happened, Bangladesh would lose its existence. Pls never try to go against public feelings with trivial complain. Hoisting flags over roof has no bad intension except support to that particular country.

    [উত্তর দিন]

  4. শাহরিয়ার বলেছেন:

    নেত্রকোনায় ব্রাজিল সমর্থকের মৃত্যু
    নিউজ বিএনএ, নেত্রকোনা, ০৩ জুলাই : প্রিয়দল হেরে যাওয়ায় স্ট্রোক করে পলাশ নামে এক ব্রাজিল সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাতে নেত্রকোনা শহরের রাজুর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, রাজুরবাজার এলাকার গাড়ী চালক পলাশ গত শুক্রবার রাতে তার প্রিয়দল ব্রাজিলের খেলা দেখছিল। নেদারল্যান্ডের কাছে তার দল ২-১ গোলে হেরে যাওয়ায় সে হঠাৎ স্ট্রোক করে। এসময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকা তাকে মৃত ঘোষণা করে।
    http://newsbna.com/index.php?cPath=118&showme=5033&dt=04&mt=Jul&yr=2010

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন