সৃষ্টির সেরা জীব, মানব বন্দনা

মানুষ সম্পর্কে যত ভাবি, ততই বিস্মিত হই, বিভ্রান্ত হই। মেঘনা-ডাকাতিয়ার ঘূর্ণিজলে খাবি খাই, তবু জীবনের কোন মানে আমি খুঁজে পাই না। মন কেন যেমন মেনে নিতে চায় না যে, জীবনের মানে শুধুই বেঁচে থাকা।

আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না, মানুষ আর দশটা জীবের মতো পশু ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই শৈশব থেকে শুনে আসা “মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব” বাণী আমার বিশ্বাস করতে ভালো লাগে। যারা বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী তারা মানুষকে বানর বা সমগোত্রীয় কোন প্রজাতির বিবর্তিত আধুনিক প্রজাতি ভাবতে ভালোবাসেন, অন্য প্রাণীদের মতোই আচরণ করতে চায়। পশুদের জীবন তো খাওয়া আর প্রজনণের এ্যাকুরিয়ামে বন্দী, সেখানে সোনালী চিলের মতো আকাশের নীলে ডানা মেলার অবকাশ কোথায়!

সৃষ্টির জগতে মানুষই একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী নয়। প্রতিটি প্রাণীর রয়েছে অবাক করা বুদ্ধি ও দতা। বাবুই পাখির বাসা বাঁধার সুনিপুন কৌশল আমাদের তাক লাগিয়ে দেয়। ুদ্রাতিুদ্র আনুবিণিক প্রাণী থেকে শুরু করে প্রকান্ড নীল তিমি পর্যন্ত সকল প্রাণীর রয়েছে চমকপ্রদ শিকার কৌশল, আত্মরার বিচিত্র পদ্ধতি। কিন্তু এর কোন কিছুই মানুষের বুদ্ধির সাথে তুলনীয় নয়।

প্রতিটি প্রাণীর বুদ্ধি প্রায় সুনির্দিষ্ট ছকে বাধা। শত শত বছর ধরে বাবুই পাখি বাসা বাধছে, অন্য কোন পাখি তো সে বাসার অনুকরণে বাসা বাধতে পারে না। কাকের বাসা আদ্দিকাল থেকে ছন্দহীন, টুনটুনির বাসা বলতে দু’তিনটি পাতায় সেলাই করে বসবাস। এ যেন সুইং মেশিনের এমব্রয়ডারী, নির্দিষ্ট ডিজাইনের বাইরে যাওয়া ঘোরতর অন্যায়। কিছু কিছু প্রানীয় অনুকরণপ্রিয়। বানর হয়তো মানুষের দেখাদেখি কিছু একটা করার চেষ্টা চালায়, কিন্তু তা মৌলিক কোন অর্থবহন করে না।

ভালোবাসা ছাড়া এ সৃষ্টি জগতের কোন গুরুত্ব নেই। প্রেমই জীবন, প্রেমই সৃষ্টির মূল রহস্য। প্রেমটাও কি মানুষ ছাড়া অন্যকোন প্রাণীর মাঝে প্রজাপতির রঙ্গিন পাখায় ভর করে উড়ে বেড়ায়? অধিকাংশ প্রাণীই নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ভালোবাসতে পারে না। ওদের ভালোবাসায় নেই কোন উত্তাপ আছে শুধু বীর্য স্খলনের সুতীব্র তাড়ণা। প্রাণীকূল প্রেম বোঝে না, জানে শুধু প্রজনন।

মানুষ জানে কিভাবে ভালোবাসতে হয়। সে কোন পশুর মতো ছকে বাধা নিয়ম মেনে ভালোবাসেনা, সে ভালোবাসায় বৈচিত্র খোঁজে। প্রেমিক-প্রেমিকা একে অন্যকে কাছে পেতে খুঁজে ফেরে নিত্যনতুন ছন্দ, রপ্ত করে অজানা সব কৌশল। মানুষ ভালোবাসাকে শুধু জৈবিক চাহিদা মনে করে না, প্রকৃতির ডাকে মতো নিয়মমাফিক সাড়া দেয়ার ধার ধারেনা, সে চায় প্রতিণ, প্রতি মূহুর্তে ভালোবাসা পেতে, ভালোবাসার উত্তাল সাগরে অবগাহন করতে। ভালোবাসার জন্য মরনেও তাই তার কোন ভয় নেই।

মানুষ প্রতিনিয়ত চায় তার পরবর্তী প্রজন্ম তাদের চেয়ে আরো বুদ্ধিমান হোক, আরো কুশলী হোক। হাসের ছানা বড় হয়ে খালে বিলে নাক ডুবিয়ে শামুক খুঁজে বেড়াবে এ যেমন সত্যি, মানুষের বেলায় ধ্রুব সত্যি হলো সে তার মেধা, যোগ্যতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করে মানব জাতিকে কাঙ্খিত ল েপেঁৗছে নিয়ে যাবে। সন্তান ধারন করেই আমরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখি, নিজের চেয়ে যোগ্য করে গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাই। প্রতিটি মানুষের এমন অব্যাহত প্রচেষ্টায় মানব সভ্যতা প্রতিদিন, প্রতিণ অতীতের চেয়ে আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়, উন্নত হয়। কাকের বাসা পূর্বের মতোই থাকে ছন্দহীন।

আমি যেখানেই যাই মানুষের জয়গান শুনতে পাই, যেদিকে তাকাই মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের স্বার দেখতে পাই। সেই মানুষের জীবন পশুর মতো খাওয়া আর প্রজননের গোলকধাঁধায় মাথাকুঁটে মরবে তা মেনে নেয়া যায় না। নিজের জীবনকে আলোকিত করার মাধ্যমে মানবজাতিকে প্রতিনিয়ত আরো সমৃদ্ধ করার মাঝেই তো জীবনের স্বার্থকতা।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন