ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) : নির্বাচনের আগেই বিতর্কের সমাধান হোক

শেষ হলো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, ক্রমে ক্রমে শান্ত হয়ে আসছে সাইক্লোন, শীতল হয়ে আসছে নির্বাচনী উত্তাপ। ইতিহাস সৃষ্টিকরা এ নির্বাচনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি ছিল প্রথম ব্যবহত  ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ পদার্পন করলো ইলেট্রনিক ভোটিং সিস্টেমে যা সারা বিশ্বে ই-ভোট নামেই পরিচিত। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের (আইআইসিটি) চৌকষ গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এ ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন। তাদের ডিজাইনে মেশিনটি তৈরী করেছে পাই ল্যাবস বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাসে তাদের এ অনন্য অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।

কেন এ যন্ত্রের ব্যবহার? এ যন্ত্র ভোট গ্রহণের সময় বাঁচাবে, চসিক নির্বাচনে সত্তুর বছর বয়স্ক রেদু মিয়ার ভোটদানে সময় লেগেছে মাত্র ৩০ সেকেন্ড।  এর পাশাপাশি ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায়ও সময়ের সাশ্রয় হবে। এ কারণেই চসিক নির্বাচনে ইভিএম এ গৃহীত ভোটকেন্দ্রগুলোর ফলাফলই সর্বাগ্রে প্রকাশিত হয়েছে। শুধু সময় বাচানোই নয়, ইভিএম জালভোট প্রতিরোধে কার্যকরী হবে এমনটিই আশা সবার।

তবে যারা বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনগুলো সম্পর্কে খবর রাখেন তারা সবাই জানেন কিভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘুরিয়ে দেয়া হয়, কিভাবে সুক্ষ/স্থুল কারচুপির মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়, কিভাবে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা হয়, বোমা মেরে অস্ত্রের মুখে কিভাবে কেন্দ্র দখল করা হয়। তাই নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে নির্বাচনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রের প্রতি, ভোটারদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা সর্বাগ্রে প্রয়োজন, নয়তো কোন যন্ত্র দিয়েই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাই ইভিএম নিয়ে আলোচনার আগে আসুন ভোটের পরিবেশ নিয়ে কিছু কথা বলি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ চূড়ায় থেকেও আওয়ামী লীগ সুস্থ্য নির্বাচন করে নি, বিরোধী মতকে একদমই সহ্য করতে পারতেন না শেখ মুজিব, তাই বিরোধী কেউ সংসদে আসুক তা তিনি কখনোই চান নি। এরপরেও সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য কোন সরকার ফেয়ার ইলেকশনের কাছে ঘেষেনি, এ ক্ষেত্রে ভোট ডাকাতিতে এরশাদ কিংবদন্তী হয়ে আছেন। এরশাদের শাসনামলে প্রাইমারী ও হাই স্কুলের ছাত্ররা ব্যালটে সীল পেটাতো, বড়রা শুধু শুধু সময় নষ্ট করতে চাইতো না, কারণ ফলাফল আগেই যে নির্ধারিত হয়ে থাকত। এরশাদ পতনের পর বিএনপি সরকারের আমলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবীতে আন্দোলন হয়েছে, এ আন্দোলন নিয়ে সংসদ বর্জন, অসহযোগ আন্দোলন এবং বিএনপি জামায়াতের মাঝে বিস্তর দূরত্ব তৈরী হয়েছিল। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মূলার রূপকার অধ্যাপক গোলাম আজম হওয়ায় যে কোন মূল্যে তা আদায় করে নিতে জামাত মরিয়া ছিল। ফলে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবীতে নির্বাচন বর্জন করে, ফলে বিরোধী দল বর্জিত একদলীয় নির্বাচনের জয়ী বিএনপি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।

অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং একানব্বইয়ে অত্যন্ত সফল ও সবর্জনগৃহীত নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অন্য নির্বাচনগুলোও প্রশ্নাতীত ছিল না। ফলে সব সময়ই ইলেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ভোট ডাকাতি, কারচুপির অভিযোগ রয়েই যাচ্ছে। বিশেষ করে কেন্দ্র থেকে বিরোধীদের এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল, প্রিজাইডিং অফিসারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট চুরি, বোমাবাজি, আতংক ছড়িয়ে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসতে বাধা দান প্রভৃতির অভিযোগ ছিল। আমার পরিচিত একজন কলেজ শিক্ষক একানব্বইয়ে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালনকালে ভোট কেটে না দেওয়ার অপরাধে হেনস্তা করা হয়, নির্বাচনে জয়ী হয়েও ময়লা দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয় তার বাসা। নির্বাচন পরবর্তী এ চিত্র দেশের সর্বত্র। আর অনেকেই একদিনের ক্ষমতার জোরে সততা দেখিয়ে মার খেতে নারাজ, তাই সহজেই আপোষরফা করে ফেলেন নেতাদের এজেন্টদের সাথে। আর যে সব আসনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার নির্বাচন করেন সেখানে সেনাবাহিনীর নাকের ডগায়ই নির্বিঘ্নে ভোট ডাকাতি হয়, যেখানে প্রতীক মূখ্য না হয়ে সেনাবাহিনীর স্বজনপ্রীতিই মূখ্য বিষয় হয়ে দাড়ায়।

বাংলাদেশে ইভিএম এ প্রথম শুরু হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইভিএম এ বেশ আগে থেকেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত ই-ভোট ডাকাতির অভিযোগও উঠছে। ভারতে গত লোকসভা নির্বাচনে ই-ভোট ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের পুরসভা নির্বাচনে ইভিএম মেশিনে দুবারের গননায় দু রকম ফল এসেছে বলেও অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত  ইভিএম এবং ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম একই ধরণের মেকানিজমে চলে বলেই মনে হয়। তাই ভারতের নির্বাচনে যেমন ইভিএম নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, ব্যাপক অবিশ্বাস আর প্রতিহিংসার রাজনীতির বাংলাদেশে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক যে উঠবেই তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। যেখানে খোদ যুদ্ধরাষ্ট্রও ই-ভোট কেলেঙ্কারীর অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়, যেখানে সিআইএ ই-ভোট ডাকাতির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, সেখানে বর্তমান বুয়েট উদ্ভাবিত যন্ত্রটি কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে তা বিবেচনার বিষয়।

ইভিএম ব্যাটারী চালিত একটি কন্ট্রোল ইউনিট, একটি ব্যালট ইউনিট এবং একটি ডিসপ্লে ইউনিট সমন্বয়ে গঠিত। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার কন্ট্রোল ইউনিটের স্টার্ট বাটনে ক্লিক করে একটি স্মার্ট কার্ড ইভিএম এ প্রবেশ করিয়ে নির্বাচন শুরু করার পর যতবার তিনি কন্টোল ইউনিটের ব্যালট বাটনে ক্লিক করবেন ততবার ব্যালট ইউনিট কার্যকর হবে এবং ভোট দেয়া যাবে। এখন প্রশ্ন হলো যদি সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার একাধিকবার ব্যালট বাটন চাপেন এবং ভোটারও ভোট দিয়ে দেন কিংবা আরো সহজ ভাষায় যদি কেন্দ্র দখল করে প্রতিপক্ষের এজেন্টদের বের করে দিয়ে বিংবা এজেন্টদের মুখ বন্ধ রাখতে টাকা দিয়ে পোষ মানিয়ে প্রিজাইডিং অফিসারের কাছ থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ভোট কেন্দ্রের, তাহলে সকলের ভোট একার পক্ষে দেয়া কি কোন সমস্যা? অবশ্য কন্ট্রোল ইউনিটে একটি স্টপ বাটন আছে বটে, তবে তাতে ক্লিক করার সুযোগ কিংবা সাহস অফিসারদের হবে কি না তাও ভেবে দেখা দরকার।

এছাড়া ইভিএম এ ওটিপি চিপ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশনেই যদি দলীয় লোক ঢুকে যায়, আর নির্বাচন কমিশন নিয়ে এ ধরণের অভিযোগ বরাবরই শোনা যায়, তাহলে তাদের কেউ যদি প্রতি কেন্দ্রে অন্তত একটি করে মেশিনে এ প্রোগ্রাম করে দেন যে নির্বাচন শেষে ক্লোজ বাটনে ক্লিক করলেই যেন স্বয়ক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট কোন প্রতীকে অতিরিক্ত ২০০/৩০০ ভোট যুক্ত হবে তাহলে সহজেই নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেয়া সম্ভব।

কিংবা যদি নির্বাচনী কর্মকর্তার স্মার্ট কার্ডের নকল কার্ড তৈরী করা হয় এবং তা যদি ইভিএমএর প্রোগ্রামকে বিভ্রান্ত করে একবারে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট কাস্ট করে দেয় তবে তা কি নির্বাচনের ফলফলকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট হবে না।একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোটারের ভোটের পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকে আমলে আনা হয় নি। আমার ধারণা প্রকৌশলীরা ইলেকশন রিগিংএর ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন নি, যদিও তাদের মনে রাখা উচিত ছিল যে পৃথিবীতে চোরের আগমন পুলিশ বাহিনী তৈরীর অনেক আগেই। চোর সব সময়ই একধাপ এগিয়ে থাকে, ভাইরাস ছড়ানোর পরই এন্টিভাইরাসের আপডেট বাজারে আসে।

কিছু প্রস্তাবনাঃ

১। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) এর ডিজাইন পরিবর্তন করা হোক। এখানে ব্যালট প্যানেল অংশে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ম্যাগনেটিক ইনক ক্যারেকটার রিকশনিগশ প্যানেল বসানো হোক, যাতে কার্ড SWAP করার পরই ব্যালট এক্টিভেট হয়।

২। ব্যালট এক্টিভেট হওয়ায় স্ক্রীণে প্রার্থীদের তালিকা ও প্রতীক ফুটে উঠবে। ভোটার তার বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ (যা ন্যাশনাল আইডি কার্ড তৈরীর সময় নেয়া হয়েছে এবং ডাটাবেইজে সংরক্ষিত আছে) পছন্দনীয় প্রতীকের টাচ স্কীনের উপর চাপ দেবেন, প্রকৃত ভোটারের ফিংগার প্রিন্ট ডাটাবেজের ফিংগার প্রিন্টের সাথে মিলে গেলেই ভোটটি কাস্ট হবে।

৩। ভোট কাস্ট হলেই ছোট্ট আকারের একটি প্রিন্টআউট বের হবে যাতে দুটি অংশ থাকবে, এক অংশে প্রতীক ও সিরিয়াল নম্বর এবং অন্য অংশে শুধু সিরিয়াল নম্বর। ভোটার প্রতীকের অংশটি ব্যালট বাক্সে ফেলে চলে যাবেন। এখানে ব্যালটবাক্স এ কারণে রাখা হবে যে যদি কখনো ফলাফল নিয়ে কোন অভিযোগ ওঠে তবে ঐ ব্যালট বাক্সে রক্ষিত ব্যালটগুলো গনণা করা হবে। আর অভিযোগ না উঠলে কখনোই এ বাক্স খোলা হবে না। বাক্সটি হবে স্বচ্ছ এবং আকারে খুবই ছোট।

আমার প্রস্তাবনা নিয়ে যারা চিন্তায় পড়ে গেছেন এ তো বিশাল বাজেটের ব্যাপার, তাদের জন্য বলছি, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে এ ধরণের যন্ত্রপাতি তৈরী হয়েছে। আমি আমার বুয়েটের বন্ধুদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে যন্ত্র ইতোমধ্যে আবিস্কৃত হয়ে উৎকর্ষের ইর্ষণীয় প্রান্তে পৌঁছে গেছে, সে যন্ত্রের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের ধাপগুলি আমাদের নতুন করে কেন শুরু করতে হবে? হ্যা, গবেষণার স্বার্থে আমাদের তা করবে হবে কিন্তু ব্যবহারে জন্য অবশ্যই উৎকৃষ্টটাই বেছে নিতে হবে। আমাদের বন্ধুরা দেশীয় প্রযুক্তিদিয়ে কম্পিউটার তৈরী করবেন, কিন্তু ল্যাপটপের যুগে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরী দোতলা বাড়ীর মতো কম্পিউটার অফিস আদালতে বসিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন তবে তা মেনে নেয়া ঠিক হবে না। আমরা কি স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফরাসী উড়োজাহাজে ওড়া বাদ দিয়ে, নিজেরাই আবার নতুন করে শুরু করবো রাইটব্রাদার্সের মতো?

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি ইভিএম ব্যবহৃত হয় তবে তা দিয়ে যে ফলাফল আসবে তা একবাক্যে পরাজিত দল প্রত্যাখ্যান করবে, বলা হবে ডিজিটাল কারচুপির কথা। এ নিয়ে বহু তর্ক বিতর্ক হবে, মিডিয়ায় টকশো (talk show) পরিণত হবে তিতকুঁটে শোতে। তার আগেই যদি আমরা ইভিএম নিয়ে বিতর্কটা শেষ করতে পারি, নির্বাচনের আগেই যদি ইভিএমকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারি তবে তা দেশের জন্য এবং আমাদের সবার জন্যই মঙ্গলময় হবে।

তাহলে বন্ধুগন আসুন না, নির্বাচন পরবর্তী বিতর্ক এড়াতে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে এখনই বিতর্কে মেতে উঠি।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন এর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালা ২০১০ এর ৩ থেকে ৬ নম্বর বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিভাবে ইভিএম এর মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন হবে, একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।

৩। ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট প্রদান।- সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর এবং সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদের নির্বাচনে গোপন ব্যালট বা, ক্ষেত্রমত, ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা যাইবে।
৪। ইভিএম গঠন, ইত্যাদি।- (১) এই বিধিমালার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রতিটি ইভিএম-
(ক)       ব্যাটারী চালিত একটি কন্ট্রোল ইউনিট, একটি ব্যালট ইউনিট এবং একটি ডিসপ্লে ইউনিট সমন্বয়ে গঠিত হইবে;
(খ)       কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট এবং ডিসপ্লে ইউনিট আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে কার্যকর থাকিবে; এবং
(গ)       কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত ডিজাইনের হইতে হইবে।
(২)        কন্ট্রোল ইউনিট।-
(ক)       কন্ট্রোল ইউনিটে একটি ডেমো রেজাল্ট, একটি ক্লিয়ার মেমোরী, একটি স্টার্ট, একটি ব্যালট, একটি ক্লোজ এবং একটি ফাইনাল রেজাল্ট সুইচ বা বাটন থাকিবে;
(খ)       কন্ট্রোল ইউনিটের স্টার্ট, ক্লোজ এবং ফাইনাল রেজাল্ট সুইচ তিনটি সীলকৃত অবস্থায় সুরক্ষিত থাকিবে এবং প্রতিটি ভোট কক্ষে একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে থাকিবে;
(গ)       প্রত্যেক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের-
(অ)       তথ্যসহ একটি স্মার্ট কার্ড থাকিবে;
(আ)      কার্ডটি যতক্ষন কন্ট্রোল ইউনিটে সঠিক পন্থায় ঢুকানো অবস্থায় থাকিবে ততক্ষণ পর্যন্ত উক্ত ইউনিটটি চালু থাকিবে;
(ঘ)       সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার কার্ডটি বাহির করার সংগে সংগে ইউনিটটির কার্যকারিতা বন্ধ হইয়া যাইবে এবং পুনরায় চালু করিতে হইলে স্মার্ট কার্ডটি কন্ট্রোল ইউনিটে ঢুকানোর সংগে সংগে উহা চালু হইবে এবং পূর্বে প্রদত্ত ভোটও সংরক্ষিত থাকিবে; এবং
(ঙ)       কন্ট্রোল ইউনিটে “ব্যালট” নামের একটি সুইচ থাকিবে এবং উহা চাপিবার মাধ্যমে ব্যালট ইউনিট কার্যকর হইবে; একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর ব্যালট ইউনিটটি অকার্যকর হইয়া যাইবে; অকার্যকর অবস্থায় আবার ভোট দিলেও মেশিন উহা গ্রহণ করিবে না; পরবর্তী একজন ভোটারকে ভোটদানের জন্য বুথের গোপন কক্ষে প্রবেশ করাইবার আগে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার বা পোলিং অফিসার কন্ট্রোল ইউনিটের “ব্যালট” সুইচটি চাপিয়া ব্যালট ইউনিটটি ভোটদানের জন্য পুনরায় কার্যকর করিবেন; ব্যালট ইউনিটটি কার্যকর হইবামাত্র উহার সর্বডানে নীচের দিকে অবস্থিত “ভোট দিন” নামক বাতিটি জ্বলিয়া উঠিবে।
(৩)        ব্যালট ইউনিট।-
(ক)       ব্যালট ইউনিটে রিটার্নিং অফিসার কর্তক প্রস্তুতকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তালিকা মোতাবেক এক পার্শ্বে বাংলা বর্ণমালার ক্রমানুসারে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম এবং অপর পার্শ্বে উক্ত প্রার্থীর বিপরীতে বরাদ্দকৃত প্রতীকের ছবি সন্নিবেশিত থাকিবে; প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নামের পাশে ভোটদানের জন্য একটি করিয়া সুইচ এবং প্রতিটি সুইচের পার্শ্বে একটি করিয়া ছোট বাতি থাকিবে; পছন্দনীয় প্রার্থীকে ভোটদানের জন্য উক্ত প্রার্থীর প্রতীকের পার্শ্বের সুইচটি চাপিয়া দিতে হইবে; সুইচ চাপা সঠিক হইলে সুইচের পাশ্বের বাতিটি জ্বলিয়া উঠিবে এবং “ভোট সঠিক হয়েছে” ধ্বনি শোনা যাইবে;
(খ)       ব্যালট ইউনিটের দুইটি সুইচের উপর একসাথে চাপ দিলে মেশিন কোন ভোটই গ্রহণ করিবে না এবং “হয়নি” ধ্বনি শোনা যাইবেঃ
তবে যদি সুইচদ্বয় চাপার মধ্যে সময়ের পার্থক্য হয়, সেইক্ষেত্রে যে সুইচটি আগে চাপা হইয়াছে সেই সুইচ সংশ্লিষ্ট ভোটটি গৃহীত হইবে;
(গ)       একজন ভোটার তাহার পছন্দের প্রার্থীর পাশ্বের সুইচ যতবারই চাপুন না কেন, প্রথম চাপে যে ভোট প্রদান করা হইয়াছে শুধুমাত্র উক্ত ভোট-ই গৃহিত হইবে, অতিরিক্ত চাপের ক্ষেত্রে “হয়নি” ধ্বনি শোনা যাইবে;
(ঘ)       একজন ভোটার যদি ব্যালট ইউনিটের এমন কোন সুইচে চাপ দেন, যাহার বিপরীতে কোন প্রার্থী নাই সেই ক্ষেত্রে ভোটটি গৃহীত হইবে না এবং এই ক্ষেত্রেও “হয়নি” ধ্বনি শোনা যাইবে, তবে সঠিক সুইচে পুনরায় চাপ দিয়া ভোটার তাহার ভোট দিতে পারিবেন;
(ঙ)       কোন পদে যতজন প্রার্থীকে ভোট প্রদান করিবার কথা রহিয়াছে তাহা হইতে অধিক সংখ্যক প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার নিমিত্তে সুইচ চাপিলে অতিরিক্ত কোন ভোট গৃহীত হইবে না এবং “এই পদে ভোট দেয়া শেষ” ধ্বনি শোনা যাইবে;
(চ)        ব্যালট ইউনিটের সর্বডানে নীচের দিকে “ফাইনাল” নামক একটি বড় আকারের সুইচ থাকিবে; একজন ভোটারের যত সংখ্যক পদে ভোট প্রদানের সুযোগ রহিয়াছে যদি তিনি তাহা অপেক্ষা কম সংখ্যক প্রার্থীকে ভোট প্রদান করিতে চাহেন, তাহা হইলে তাহার পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থী বা প্রার্থীগণের পাশ্বের সুইচ চাপিবেন এবং সর্বশেষে ফাইনাল সুইচ চাপিয়া ভোট প্রদান সম্পন্ন করিতে পারিবেন;
(ছ)        যতজন প্রার্থীকে ভোট প্রদানের সুযোগ রহিয়াছে, একজন ভোটার যদি ততজন প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেন সেইক্ষেত্রে প্রদত্ত সকল ভোট ইভিএম কর্তৃক স্বয়ংক্রিয়ভাবে গৃহীত হইবে এবং ভোটারের ভোট প্রদান সম্পন্ন হইবে, সেইক্ষেত্রে ফাইনাল সুইচ চাপিবার প্রয়োজন হইবে না;
(জ)        দফা ‘(চ)’ অথবা ‘(ছ)’ মোতাবেক ভোটারের ভোট প্রদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হইবার পর ব্যালট ইউনিটের সর্ব ডানে নীচের দিকে অবস্থিত “ভোট দিন” নামক ছোট বাতিটি নিভিয়া “ভোট সম্পন্ন” নামক ছোট বাতিটি জ্বলিয়া উঠিবে এবং “সকল ভোট গৃহীত হয়েছে” ধ্বনি শোনা যাইবে, ইহার পর ভোটার যদি পুনরায় ভোট প্রদানের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে ভোট গৃহীত হইবে না এবং “ভোট দেয়া শেষ” ধ্বনি শোনা যাইবে; এবং
(ঝ)        দফা (খ), (গ), (ঘ), (ঙ) অথবা (জ) এ বর্ণিত কোন পরিস্থিতিতে যখনই কোন ভোট গৃহীত হইবে না, তখন ব্যালট ইউনিটের সর্বডানে নীচের দিকে অবস্থিত “ভুল” নামক ছোট বাতিটি পর্যায়ক্রমে জ্বলিতে ও নিভিতে থাকিবে।
(৪)        ডিসপ্লে ইউনিট।- প্রতিটি ইভিএম এর সহিত একটি ডিসপ্লে ইউনিট থাকিবে, যাহা ভোটকক্ষের গোপন কক্ষের বাহিরে দৃশ্যমান থাকিবে; প্রতিটি সফল ভোটের পর ডিসপ্লে ইউনিটে প্রদর্শিত সংখ্যা একটি করিয়া বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে অর্থাৎ ঐ সময় পর্যন্ত কতজন ভোটার উক্ত ইভিএম-এ ভোট প্রদান করিলেন উহা জানা যাইবে।
(৫)       স্মার্ট কার্ড ও মাষ্টার কার্ড।- কোন কারণে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের  ̄স্মার্ট কার্ডটি অকেজো হইয়া পড়িলে অথবা হারাইয়া গেলে অথবা চুরি বা ছিনতাই হইয়া গেলে তিনি সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারকে উহা অবহিত করিবেন, সেইক্ষেত্রে প্রিজাইডিং অফিসার কন্ট্রোল ইউনিটটি পুনরায় চালু করিবার লক্ষ্যে তাহার মাস্টার কার্ডটি সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রদান করিবেন এবং একই সাথে সংশ্লিষ্ট সহকারী রিটার্নিং অফিসার/রিটার্নিং অফিসারের নিকট হইতে অতিরি৩ একটি স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করিবেন, অতঃপর প্রিজাইডিং অফিসার সংগৃহিত স্মার্ট কার্ডটি সংশ্লিষ্ট সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রদানপূর্বক পূর্বে প্রদত্ত মাষ্টার কার্ডটি ফেরৎ লইবেন।
৫।         সফ্টওয়ার ও হার্ডওয়ার সংক্রান্ত।- (১) ইভিএম একটি মাইক্রো-কন্ট্রোলারভিত্তিক এমবেডেড সিস্টেম, ইহাতে একটি ওটিপি মাইক্রো- কন্ট্রোলার ব্যবহার করা হইবে, যাহার ফলে একবার প্রোগ্রাম লোড করার পর ইভিএমটিতে নতুন প্রোগ্রাম লোড করা যাইবে না।
(২)      ভোটের তথ্য সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি ইভিএম-এ চারটি স্মৃতি ভান্ডার (Memory Storage) থাকিবে।
(৩)      একজন ভোটার ভোট দেওয়ার সংগে সংগে উহা এমনভাবে উক্ত চারটি স্মৃতি ভান্ডারে সংরক্ষিত হইবে যাহাতে ভোট সংক্রান্ত কোন তথ্য কোনভাবেই হারাইয়া যাইবার বা নষ্ট হইবার সুযোগ থাকিবে না।
৬।      ব্যালট ইউনিটে প্রার্থীর নাম ও প্রতীকের তালিকা সম্বলিত কাগজ সংযোজন।- (১) প্রতিটি ব্যালট ইউনিটের উপরিভাগে প্রার্থীদের নাম ও প্রতীকের তালিকা সম্বলিত কাগজ সংযোজনের ব্যবস্থা থাকিবে।
(২)      কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত দিন ও সময়ে রিটার্নিং অফিসারগণ নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হইয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত স্ব স্ব এলাকার জন্য বরাদ্দকৃত নাম ও প্রতীক সম্বলিত সংশ্লিষ্ট কাগজে স্বাক্ষর করিবেন।
(৩)       ̄স্বাক্ষর প্রক্রিয়া শেষ হইবার পর কমিশনের মনোনীত প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত কাগজসমূহ ব্যালট ইউনিটে সঠিকভাবে সংযোজন করা হইয়াছে কিনা তাহা পরীক্ষা করিয়া মেশিনটি সীল করিয়া দিতে হইবে।
(৪)      সীল করিবার পর প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীদের নাম ও প্রতীকের বিপরীতে কোন্ কোন্ সুইচ বরাদ্দ করা হইয়াছে, তাহা ‘ফরম-ক’ অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করিয়া সংরক্ষণ করিতে হইবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) : নির্বাচনের আগেই বিতর্কের সমাধান হোক” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. Shamsul Alam বলেছেন:

    বাংলাদেশের রাজনীতি গনতন্ত্র ও সামাজিক শান্তির জন্য খুব দরকারী একটা বিষয় এটি। যদিও অনেকের কাছে মনে হতে পারে আলোচনার বিষয়টা খুব প্রিম্যাচিওর। কিন্তু না, সময় খুব দ্রুত গড়াচ্ছে। যেখানে কারচুপি আর অনিয়ম আমাদের ভোটের অনুষঙ্গ। আমরা চাই, ইভিএম যেনো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করে, কিন্তু রেজাল্ট কারচুপির অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার না হয়। তাই এ নিয়ে টেকনিক্যাল ও লজিক্যাল আলোচনা কাম্য।

    [উত্তর দিন]

  2. Hasan Khan বলেছেন:

    কাগজের ভোটের চেয়ে ইভিএম বেশি তো নয়ই বরং কম নিরাপদ বা রিগিংসহায়ক ; কাজেই এটা আধুনিক ভোট গ্রহন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহনযোগ্য নয় । আধুনিক এবং দ্রুত ভোটিঙ ব্যাবস্থা চালু করতে চাইলে সবচেয়ে ভালো হবে ই ভোটিং (ওয়েব ভোটিং) এবং মোবাইল ভোটিং । নাম-পরিচয় প্রকাশ করে ভোট দেবার ব্যাবস্থা থাকলে, ই ভোট বা মোবাইল ভোটিঙে কারচুপির কোন সুযোগ থাকে না । কারন প্রত্যেকের ভোট সহ যখন ইন্টার্নেটে ফলাফল প্রকাশ করা হবে তখন ভোটার বা প্রার্থি, কারো সন্দেহ হলে নাম পরিচয় ধরে সেই ফলাফল যাচাই করতে পারবে । দেশে ই ভোট বা মোবাইল ভোট দেবার মতো শিক্ষিত এবং সক্ষম মানুষ এখন অনেক ; আর নতুন ভোটারদের অধিকাংশই ইন্টার্নেট বা মোবাইল লিটারেট । এর সাথে যোগ হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় কর্মি, নেতা এবং সমর্থকেরা, যাদের প্রকাশ্যে ভোট দিতে কোন অসুবিধাই নেই । সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন ৩/৪ কোটি ভোট ইন্টার্নেটে আর মোবাইলে কাস্ট করতে পারবে । বাকি থাকবে যারা প্রকাশ্যে ভোট দিতে সাহস করবে না বা দিতে পারবে না, তারা । সেই কম সংখ্যক ভোটারদের জন্য খুব অল্প সময়েই কাগজের ভোট নেয়াটা অনায়াস হয়ে যাবে । মোট কথা যারা স্বেচ্ছায় প্রকাশ্যে ই ভোট বা মোবাইল ভোট দিতে পারবে, নির্বাচন কমিশনের অবশ্যই উচিত, তাদের সেই সুযোগ করে দেয়া । আর খুব শিঘ্রি বাতিল হয়ে যাবার মতো ইভিএম ভোটিঙের চিন্তা বাদ দেয়াই উচিত হবে ।

    [উত্তর দিন]

    Hasan Khan উত্তর দিয়েছেন:

    এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের প্রত্যেক ইচ্ছুক ভোটারকে ১টি আলাদা নির্বাচনি সিম বা ওয়েব আই ডি দিতে হবে, যেখান থেকে ভোটার তার ভোট টি নির্ধারিত সময়ে প্রদান করবেন ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন