নজর এবার ঢাকার পানে

ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে ঢাকা শহর। জ্যামিতিক হারে কমছে নাগরিক সুযোগ সুবিধা। পানি নেই, গ্যাস নেই, বিদ্যুত নেই, আছে শুধু নেতা-নেত্রীদের গালভরা প্রতিশ্রুতি। বিগত দিনগুলোতে ঢাকা মহানগরকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ দেখা যায় নি বরং একে পরিণত করা হয়েছে বর্জের ভাগারে। মৃত্যু কূপে পরিণত হয়েছে মহানগর। অসহ্য যানজট, ময়লা আবর্জনা, শিল্পকারখানা নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও বর্জ, ছিনতাই, রাহাজানি, হত্যা তথা মানুষের জীবনের জন্য ক্ষতিকর এমন কোন কিছুরই অভাব নেই ঢাকা মহানগরে।

শীর্ষ নিউজ ডট কম প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায় গত ৫ মাসে বিভিন্ন ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে মোট ১১৪ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১৯, মার্চে ২৫, এপ্রিলে ২৭ ও মে মাসে ২৬ জন হত্যার শিকার হন। এর মাঝে জানুয়ারিতে রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে ৪, পল্লবীতে ৩, তেজগাঁওয়ে ২ এবং খিলগাঁও, কদমতলী, খিলক্ষেত, হাজারীবাগ, গুলশান, দক্ষিণখান, ধানমণ্ডি, মতিঝিল, সূত্রাপুর ও শাহআলীতে ১ টি করে, ফেব্রুয়ারিতে পল্লবীতে ৩, মোহাম্মদপুরে ও খিলক্ষেতে ২ এবং মিরপুর, ডেমরা, কাফরুল, শাহ আলী, দারুস সালাম, কোতয়ালী, বংশাল, ক্যান্টনমেন্ট, শেরেবাংলা নগর, আদাবর, উত্তরা মডেল ও সূত্রাপুর থানায় ১টি করে, মার্চে মতিঝিল ও খিলগাঁওয়ে ৩, পল্লবী, শাহ আলী, সূত্রাপুর, লালবাগ ও গুলশানে ২ এবং কাফরুল, হাজারীবাগ, শেরেবাংলা নগর, কলাবাগান, দক্ষিণখান, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, যাত্রাবাড়ী, পল্টন ও বাড্ডায় ১ টি করে, এপ্রিলে মোহাম্মদপুরে ৭, পল্লবী ও যাত্রাবাড়ীতে ৩, মিরপুর ও আদাবরে এবং গুলশান, কাফরুল, বংশাল, বাড্ডা, সূত্রাপুর, কলাবাগান, মতিঝিল, রামপুরা, হাজারীবাগ ও ডেমরাতে ১ টি করে এবং মে মাসে শেরেবাংলা নগরে ৪, বাড্ডা, সবুজবাগ, কদমতলী ও খিলগাঁওয়ে ২ এবং কোতয়ালী, যাত্রাবাড়ী, পল্লবী, পল্টন, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মতিঝিল, তুরাগ, উত্তরা মডেল, দারুস সালাম, শাহবাগ, হাজারীবাগ ও কাফরুল থানায় ১টি করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

ক্রমবর্ধমান হারে ঢাকায় বাড়ছে গুপ্ত হত্যা। এপ্রিল মাসে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীতে গুপ্তহত্যার শিকার হয় ৬ জন, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন পুলিশেরই একজন এসআই। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে চালানো হচ্ছে এসব গুপ্তহত্যা। রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় গুপ্ত ঘাতকেরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার চরম অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা ঢাকতে গত একবছরে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছেন বলে দাবী করেছেন।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা মহনগরীর, এমনটি ঢাকা বিভাগের সবকটি আসন চারদলীয় জোটের হাত ছাড়া হয়ে যায়, একচ্ছত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চলে যায় আওয়ামী লীগের হাতে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা হয়ে পরে বেপরোয়া। ঢাকার সন্ত্রাসীরা দলে দলে চলে আসে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায়, ঢাকা মহানগর হয়ে পড়ে অপরাধের অভয়ারণ্য। নারী-শিশু পাচার ও মাদক চোরাচালানের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে ঢাকা। আর এ সব কিছুর সাথেই প্রশাসন ওতোপ্রতভাবে জড়িয়ে পড়েছে, বরং কখনো কখনো মাদকের ক্যারিয়ার হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনকি ঢাকায় মাদক সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে মাদক লোডিং আনলোডিংয়ের সময় পুলিশ টহল ও পাহারা দিচ্ছে, এক এ এলাকার মাদক অন্য এলাকা পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে।

ঢাকা মহানগরকে সম্ভাব্য সব ধরণের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ফিরিয়ে আনা দরকার ক্ষমতার ভারসাম্য। ঢাকা মহানগরে বিরোধীদের একটি আসনও না থাকায় সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কাধে কাধ মিলিয়ে অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে রাজধানীকে । এ থেকে পরিত্রাণে রাজধানীতে বিরোধীদের অবস্থান শক্ত করা প্রয়োজন। আর সামনের ঢাকা মহানগরীর নির্বাচনই পারে ক্ষমতার ভারসাম্যা কিছুটা ফিরিয়ে আনতে। একথা সত্যি যে ঢাকা মহানগরের নগরপিতা চারদলীয় জোট সমর্থিত। কিন্তু বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যেভাবে পরাস্থ হয়েছে তাতে মেয়রের পক্ষে ঢাকা মহানগরে শক্ত কোন ভূমিকা নেয়া অসম্ভব ছিল বলেই মনে হয়।

চার দলীয় জোটকে এখন থেকেই ভাবতে হবে ঢাকা মহানগরীর নির্বাচনের কথা। বর্তমান মেয়র কতটুকু সফল, কতটুকু ব্যর্থ তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে, যতটুকু বাধা আছে তা যথেষ্ট আন্তরিক হলে সাদেক হোসেন খোকা রাজধানীর উন্নতি করতে পারতেন কি না, উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার কোন গাফিলতি আছে কি না, রাজধানী উন্নয়নের নামে কোন লুটপাট হয়েছে কিনা ইত্যাদি এখনই খতিয়ে দেখা দরকার। আর চট্টগ্রাম মহানগরীর নির্বাচন থেকে এ শিক্ষা নেয়া দরকার যে জনগণ একটানা কারো কর্তৃত্ব পছন্দ করে না, বরং তাতে স্বেচ্ছাচারের আশংকা থাকে। তাই সামনের নির্বাচনে বিকল্প কোন যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া যায় কি না, দিলে সাদেক হোসেন খোকাকে দিয়ে তার পক্ষে স্বতস্ফূর্তভাবে কাজ করানো যাবে কি না, তা এখনই চিন্তা করা প্রয়োজন। আর চট্টগ্রামের নির্বাচনে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ নির্বাচন যে ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে তা বজায় রাখতে ঢাকাতেও জোটের ঐক্য আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জোটনেত্রীকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

আওয়ামী সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা, টেন্ডারবাজি, নারী নির্যাতন, গণধর্ষণ, দ্রব্যমূল্য, গ্যাস বিদ্যুত পানিসমস্যা, ভারতপ্রীতি প্রভৃতি মানুষকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তারা বাঁচতে চায়, আওয়ামী অপশাসন থেকে মুক্তি চায়। তাই চারদলীয় জোটকে মানুষের এ দূর্দিনে ভূমিকা রাখতে হবে। আর সে জন্য এখন থেকেই ঝাপিয়ে পড়ছে হবে নির্বাচনী আন্দোলনে। মনে রাখতে হবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ঘর গুছানো শুরু করলে ফলাফল কারো জন্যই শুভ হবে না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“নজর এবার ঢাকার পানে” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. mushfiq বলেছেন:

    সুহৃদ !
    আপনাকে ধন্যবাদ দিতে না পারায় দু:থিত ।
    গণতন্তের মূলমন্ত্র হলো ”সংখ্যাগরিস্ঠ দলের মনোবৃত্তিই আইন” ।
    আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিস্ঠ দল হিসেবে শুধু ঢাকা মহানগরী কেন সারা দেশের মানচিত্র পাল্টে ফেললেও সেটাকে বেআইনী বলাটাই বরং অন্যায় মনে করি ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন