অচেনা কোকিল

মাওয়া লঞ্চঘাটে এসেই কাওড়াকান্দীগামী ছোট লঞ্চটা পেয়ে গেলাম। লঞ্চে উঠেই সবার মতোই একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে আমারও ভালো লাগে। প্রথমেই লঞ্চের নীচতলায় ঢুকে গেলাম। সকাল বেলা বাসা থেকে রওয়ানা করে এ পর্যন্ত এসেও এককাপ চা খাওয়া হয় নি, তাই লঞ্চের একেবারে পেছন দিকে টি স্টলটার কাছে চলে এলাম। কিন্তু অভাগা যে দিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায় বলে যে প্রবাদটা প্রচলিত আছে তা সত্য প্রমাণ করতেই বোধহয় চা ওয়ালা তখনো স্টোভে আগুন জ্বালেনি।

নীচ তলাটা আরেকটু ভালোকরে দেখেই উপরে চলে এলাম। লঞ্চটা ছাড়তে হয়তো আরো কিছু দেরি হবে। ইতোমধ্যে খালি লঞ্চটাও ধীরে ধীরে যাত্রী বোধাই হয়েছে বেশ। এখনই একটা যুৎসই সীট খুঁজে নিতে না পারলে পরে সারাটা পথ হয়তো রেলিংয়ে হেলান দিয়ে প্রমত্তা পদ্মার অপরূপ সুধা পাণ করেই তৃপ্ত হতে হবে।

সাংরেঙ মাস্টারের কেবিনের পরেই যাত্রীদের প্রথম বেবিনটার দিকে চোখ গেল। দু’জন পুরুষ, দু’জন বোরখা পড়া মহিলা ও একটি সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। মেয়েটাকে আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হলো। মেমোরি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোন কূল কিনারা করতে পারলাম না। একটা পরিচিত মুখের টানে নাকি সুন্দরের আকর্ষণে জানি না শেষ পর্যন্ত এ কেবিনেই ঢুকে পড়লাম। কিছুণের মধ্যেই বেশ কয়েকজন যাত্রীতে কেবিনটা ভরে গেল। নববিবাহিত দম্পতি একেবারে আমার মুখোমুখি। নতুন বউটার দুধে আলতা আভা পাতলা কালো নেকাব ভেদ করে সবার চোখেই মোহজ্বাল বিছিয়ে দিচ্ছিল। পাশে বসা বিদেশ ফেরত হাঙ্লা পাতলা ছেলেটাকে বেশ বেমানানই লাগছিল আমার কাছে। সুন্দরী মেয়েদের বুঝি সুন্দর ছেলেদের সাথে বিয়ে হতে নেই, হলে বোধহয় অকল্যাণ হয় এমনই বিধান কোন ধর্মগ্রন্থে আছে কিনা কে জানে! মেয়েটা বেড়ালের মতো ঘোলা চোখে মুখোমুখি বসা এই আমার চোখে গভীর ভাবে তাকাতেই কেন যেন ওর জীবনটাও বর্ষায় ফুঁসে ওঠা প্রমত্তা পদ্মার ঘোলা পানির মতোই বিুব্ধ মনে হয়।

একে একে ভিখেরি আসছে, কারো হাতে অসুস্থতার সার্টিফিকেট, কারো হাতে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে থাকা নিষ্পাত শিশু। খুব একটা পাত্তা দিতে মন চাইলো না। ভিখেরিদের মিছিলের শেষে একটি আট দশ বছরের অন্ধ ছেলে অন্ধকার হাতরে হাতরে আমাদের কেবিনে ঢুকল। সানিতে পুরোপুরি ডুবে যাওয়া চোখদু’টো দেখে পকেট হাতরে এক টাকার কয়েনটা বের করে প্রস্তুতি নিলাম। দরজার কাছে দাড়িয়ে ছেলেটি এতটা সুন্দর, এতটা আবেগ জড়ানো কন্ঠে গান শুরু করল যে মুহুর্তেই লঞ্চের পরিবেশটা ভারী হয়ে গেল। নতুন বউটার হাত ধরে এতণ খুঁনসুটি করছিল যে ছেলেটা সেও তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলো। অন্ধ ছেলেটার আধার ভূবন চুইয়ে চুইয়ে পড়ে মোহনীয় গানের সুর, আমার সমস্ত শরীর, প্রতিটি স্নায়ু কোষ, প্রতিটি লোমকূপ সে সুরের মুচ্র্ছনায় হাসের ছানার মতো ভেসে ভেসে যায়, কখনো বা থৈ হারিয়ে ভেসে যায় দূর অজানায়। আমার সমস্ত শরীর এক অজানা ভালোলাগায় কেপে কেপে ওঠে, বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো বাস্পহয়ে কন্ঠনালীর কাছে খাবি খায়, ঝাপসা হয়ে ওঠে চোখের দৃষ্টি। পাশের বসা অল্পবয়স্ক তরুনটা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির কাছে হার মানে, রুমালের কোন দিয়ে পাহাড়ি ঢল থামাতে ব্যস্ত হয়। পাশের বোরখাওয়ালী ভদ্রমহিলাও গানের সুরে সকল দুঃখ কষ্টগুলো ভাসিয়ে দিলেন।

আমি এতগুলো লোকের সামনে কিছুতেই হার মানতে চাই না। আমি দৃষ্টি ফেরাই নদীর চরে ভেসে বেড়ানো বালি হাসের দিকে, দূরে বহুদূরে কলসী কাখে জলকে চলা রমনীদের মিছিলে, কিন্তু কোন কিছুই গানের স্রোত ঠেকাতে পারে না। আমার কানে কানে, আমার হৃদয়ে হৃদয়ে, আমার সকল চেতনা জুড়ে ভেসে বেড়ায়
“এত যত্নে মানুষ আল্লাহ তুমি বানাইয়া
কেমন করে জাহান্নামে দিবা ফালাইয়া”
গান গাইতে গাইতে ছেলেটি আমার কাছে আসে। আমার হাতের একটাকার কয়েনটা পকেটে ফেলে খুঁজি উপযুক্ত দাম। মাত্র দুশত টাকা পকেটে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি, ইচ্ছে থাকতেও ওর গানের মূল্য দিতে পারি না। পাঁচ টাকার কয়েনটা হাতে তুলে দিতেই ছেলেটা থমকে দাড়ালো। কয়েনটা আঙ্গুলের মাঝে বার কয়েক ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। অন্ধ ছেলেটা কি দেখতে পায় তা আর আমার জানা হয় না, আমি শুধু দেখি সাদা চোখের পেছনে কেবলই অন্ধকার, শুধুই হতাশা।

(পদ্মার বুকে, 1 মার্চ 2006, বুধবার)[

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন