সূর্য ডুবে যায় লাশখেকো শকুনের ডানায়

খুব ছোট বেলায় গল্প পড়েছি। “অল্প স্বল্প গল্প কই” । বইটি কে লিখেছেন তা আর মনে পড়ে না। তবে, গল্পগুলোর উপজীব্য কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদ। এমনই এক গল্পের কথা ইদানিং খুব মনে পড়ে। গল্পটি জনৈক ভোক্তাকে নিয়ে যিনি আলুর বাম্পার ফলনে কম মূল্যে দু’মন আলু কিনেছেন, সারা বছর খাবেন বলে। সে যুগে তো আর এখনকার মতো কোল্ড স্টোরেজ ছিলনা, বিদ্যুতের অভাবে কোল্ডস্টোরেজে পড়ে পড়ে আলু পঁচতো না বরং তখনকার যুগে পচঁতো চৌকি কিংবা খাটের তলায়। তো, কিছু দিন যেতে না যেতেই ক্রেতার আলুতে পঁচন শুরু হয়। ক্রেতা মহা বুদ্ধিমান, দমে যাবার পাত্র নন। ঠিক করেন, পঁচা আলু গুলো ফেলে না দিয়ে পঁচে যাওয়া অংশটুকু ফেলে বাকীটুকু খেয়ে নেবেন এবং ভালো আলুগুলো পরে খাবেন। এভাবে প্রতিদিন নিত্য নতুন আলুতে পঁচন ধরে, ভোক্তাও নব উদ্যমে পঁচা আলুর ভর্তা, আলুর রুটি, আলুর চচ্চরি, আলুর চিপস বাহারি খাবার তৈরী করে করে উদরপূর্তি করেন। এভাবে বছরব্যাপী বেচারা শুধু পঁচা আলুই খেয়ে কাটিয়ে দেন, ভাল আলুগুলো পড়ে থাকে পঁচনের অপেক্ষায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ঠিক তেমনি পঁচা আলু খাওয়ার বাতিক আছে কোন কোন দলের। নিত্য নতুন ইস্যু থাকার পরও ইস্যুগুলোর সুরাহা না করে পুরণো পঁচে যাওয়া ইস্যুগুলো নিয়ে লম্ফঝম্ফ হয়, নতুন ইস্যু গুলো পড়ে থাকে পঁচে পঁচে দূর্গন্ধ ছড়ানোর জন্য। অবশ্য এর কারনও আছে। কিছু কিছু জিনিস আছে যত পঁচে, যত পুরণো হয় তত তার দাম বাড়ে। এইতো কিছুদিন আগে ৪শত বছরের পুরণো মদ উদ্ধার হলো সমুদ্রের তলদেশে ডুবন্ত জাহাজ থেকে। একেকটি বোতলের দাম ধরা হয়েছে ৪০ হাজার ডলার করে। হ্যা, মাতাল করা জিনিসগুলো যত বাসি হয় তত তার গুরুত্ব বাড়ে, বিশেষ করে শকুন জীবিত খাবারের চেয়ে গলে যাওয়া মাংসই খেতে বেশী পছন্দ করে বলেই সবাই জানে।

জলজ্যান্ত একটা লোককে খুন করার জন্য গলায় ছুড়ি চেপে ধরেছে সন্ত্রাসীরা। এভাবেই একদিন হয়তো আপনার বাবাকে কিংবা মাকে কিংবা আদরের ভাই বোনদের হত্যা করেছিল রক্তপিয়াসী হায়েনার দল। আজো হয়তো আপনার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ প্রতিনিয়ত ব্যাকুল করে। এখন আপনারই সামনে যখন নিরপরাধ মানুষগুলোকে পশুর মতো জবাই করতে থাকে অন্য কোন হায়েনা, আপনারই সামনে ছুড়ি চেপে বসে নিরপরাধ কারো গলায়, আপনি তবে কি করবেন? প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন? ঠেকাতে না পারলে আইনের আশ্রয় নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবেন? নাকি এই অন্যায় দৃশ্য থেকে নিজের চোখ ফিরিয়ে নেবেন এবং দূনিয়ার সকল মানুষের দৃষ্টিকে আড়াল করতে প্রায় অর্ধশত বছরের সেই পুরণো হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে চেয়ে মিছিল করে রাজপথ প্রকম্পিত করবেন? পঁচা আলুর ফেলে দিয়ে নতুন আলু খাবেন নাকি পঁচে যাওয়া আলু গুলো নব উদ্যমে ঝাঁঝালো সরিষার তেলে ভর্তা বানাবেন? আর নতুন আলুগুলোকে রেখে দেবেন ভবিষ্যতে পঁচিয়ে আলুর্দম বানানোর জন্য? তবে লাশ খেকো সেসব শকুনের সাথে আপনার পার্থক্য কোথায়?

আবারও চাষীর কাছে ফিরে আসি। চাষী যত্ন করে, কষ্ট করে অনাবাদী জমিকে চাষের উপযোগী করে তুলেছেন। কাছেপিঠে পনির সংস্থান না থাকায় দূরবর্তী খাল থেকে পানি বয়ে এনেছেন। ফসল ফলাতে গিয়ে নির্যাতিন হয়েছেন, প্রতিযোগী কৃষকেরা মাঝে মাঝেই ফসল মাড়িয়েছে, গাছের গোড়া কেটেছে। তারপরও বাগানে ইর্ষণীয় ফসল ফলেছে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বী কৃষকেরা কোন ভাবেই যখন তাকে থামাতে ব্যর্থ হলো, যখন সুস্বাদু ফলের ঘ্রাণে ক্রেতা সাধারণ মোহিত হলো, ফলের বাগানে ভীড় বাড়লো বাগান থেকে টাটকা ফল-ফসল কেনার আশায়, কেউ বা নয়নাভিরাম বাগানটি এক নজর দেখার আশায়, তখনই দোষ চাপানো হলো, “এই বাগানের ফল খেয়ে চল্লিশ বছর আগে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে”, “এ চাষী খুনী, ফলের বাগানের আড়ালে মানুষকে মৃত্যুর দিকে হাকিয়ে নেয়াই এর পেশা”। অনেকেই শুনেছে বিষবৃক্ষের মাকাল ফলে, নাকাল হয়েছে মানুষ, মৃত্যুর নীল ছোঁবলে লাশ হয়ে লাখো মানুষ। কিন্তু তার দায় আজ এ চাষীর ঘাড়ে! কেউ বিশ্বাস করার কোন যুক্তি পেল না যে এ বাগানের ফলেই মৃত্যু হতে পারে, কিংবা হয়েছে কোন কালে। প্রতিপক্ষ বিশ্বাস করাতে এবার জোড় খাটাতে লাগলো। ক্রেতাদের পিটিয়ে পিটিয়ে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা চালানো হলো, কাউকে দিয়ে জোর করে বলানোও হলো, “এ চাষী চকচকে সাদা মুলো আমুল পেটে ঢুকিয়ে হত্যা করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, এ চাষী ভয়ংকর খুনী”। চাষীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেয়া হলো না, ইশপের মেষশাবকের মতো ফাঁসিয়ে দেয়া হলো তাকে। ওদের যে এক দাবী, “আমরা যেহেতু বলেছি ও খুনী, অবশ্যই ওকে তাই ঝূলতে হবে ফাঁসির কাষ্ঠে”।

ভয়ে হয়তো সবাই মুখ বুঁজে সয়ে গেল সবকিছু। কিন্তু সবাই জানে কেন এ নিরপরাধ কৃষককে আজ খুনের দায়ে হত্যার আয়োজন। কারন, যারা বিচার করছে, যারা দোষী সাব্যস্ত করছে, তাদের মদিরা বাগান কানায় কানায় পূর্ণ বিষাক্ত ধুতরা ফলে। ধুতরাকে শ্রতিমধুর নামে জোর করে গিলতে বাধ্য করছে ওরা ক্রেতা সাধারণকে, বিষক্রিয়ায় ছটফট করে বাংলাদেশ। তবুও কৃষিতে চরম ব্যর্থতা ঢাকার লক্ষ্যে নির্লজ্জ মিথ্যাচারে মরিয়া ধুতরা চাষী। চারিদিকে নরবলির আয়োজন, দিকে দিকে উলুধ্বনি, রক্তের হোলি খেয়ায় বিভোর হায়েনার দল। উষর মরুর বুকে নয়নাভিরাম মরুদ্যানে সুস্বাদু ফল আর বাহারী ফুল উৎপাদনের অপরাধের বিচারে উন্মাতাল লাশখেকো শকুনের দল।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“সূর্য ডুবে যায় লাশখেকো শকুনের ডানায়” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    অনেক গভীর একটি লেখা। পড়েই মনটা কেমন যেন হয় যায়।

    তবে চাষীর জন্য দোয়া আর শুভ কামনা করা ছাড়া আর এই মুহূর্তে আর কি করার আছে তাই ভাবছি।

    [উত্তর দিন]

  2. আল আমিন বলেছেন:

    অনেক কিছুই করার আছে । সময় অনেক কঠিন হচ্ছে আমাদের যদি সময় থেকে কিছু সময় বের করা দরকার সেই চাষী যারা আসলেই দোষী না তাদের রক্ষা করার জন্য।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন