অলৌকিক

অলৌকিকতা সম্বন্ধে আমাদের কৌতুহলের সীমা নেই। সুফী, দরবেশ, সাধু, সন্নাসীদের জীবনের সাথে অলৌকিক শব্দটি একাকার হয়ে আছে।

ছোটকালে স্বপ্ন ছিল অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, যেখানে খুশী বাতাসে ভেসে বেড়াবো, জলের উপর দিয়ে হেটে নদী পেরিয়ে দূর-বহুদূরের দেশে চলে যাব।

মানুষ সম্পর্কে আমি যতই ভাবি ততই বিস্মিত হই। আমাদের নিজেদের মাঝে ক্ষমতার কমতি কোথায়? ইচ্ছে করলে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি, অসাধ্য সাধন করতে পারি, অতীতে অনেকে করেও দেখিয়েছেন।

আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, আমরা কেউ তা জানি, কেউ জানি না বা জানার চেষ্টা করিনি। মানুষ তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করছে, খেলছে, যুদ্ধ করছে, এসব কিছুইতো শুধুমাত্র ইচ্ছে শক্তির মাধ্যমে করছে, নয় কি? ইচ্ছে শক্তি দিয়ে কি অন্য কাজ করা অসম্ভব? কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম (অথবা টিভিতে) কিছু ছেলে তাদের ইচ্ছে শক্তি দিয়ে চামচ বাঁকিয়ে ফেলছে। অবাক লাগলেও আমারও ভাবতে ইচ্ছে হয় , চেষ্টা চালালে আমরাও আমাদের ইচ্ছে শক্তির জোড় বাড়াতে পারি।

যাদের নামের সাথে অলৌকিক শক্তির সম্পর্ক জড়িত তাদের প্রত্যেকের জীবন ইতিহাসে দেখা যায় সবাই একান্ত নিভৃতে ধ্যান করেছেন, আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য একাগ্রভাবে দিনের পর দিন সাধনা করেছেন, ফলে ধৈর্যশীলদের অনেকে অর্জন করেছেন অলৌকিক শক্তি। অবশ্য সবাই যে সৃষ্টিশীল শক্তি পায় তাও নয় কেউ কেউ অশুভ শক্তির আরাধনা করে পেয়ে যায় ধ্বংসাত্মক শক্তি।

আমার দাদী (২৪ ফেব্রুয়ারী তাঁর মৃতু্যবার্ষিকী গেল) জীবনের শুরুতেই দাদাকে হারান। দাদীর কৈশোরের যুগটা আবার ছিল বাল্যবিবাহের স্বর্ণযুগ। তাই পুতুল বিয়ে শেষ হওয়ার আগেই কয়েকটি সন্তান ধারণ করেছেন, পরিপূর্ণ যুবতী হওয়ার আগেই শরীরে জড়িয়েছেন বৈধব্যের সাদা শাড়ি। এ কারনেই তিনি পেয়েছিলেন অফুরন্ত অবসর। পর্দানশীল হওয়ার কারণে রাতের আধারে হয়তো তিনি কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে ডেকেছেন, দুঃখের সাগর পাড়ি দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে শক্তি চেয়েছেন, তাই হয়তো কিছুটা ক্ষমতাও তিনি অর্জন করেছিলেন। শুনেছি, তিনি কোন এক কুষ্ঠরোগীকে ভালো করে তুলেছিলেন শ্রেফ ঝাড়ফুঁক দিয়ে। কেউ আবার ভেবে বসবেন না যে তিনি ঝাড়ফুঁকের ব্যবসা করতেন বরং খুব ঘনিষ্ঠ কিছুলোক তার এ ক্ষমতা জানতো। তিনি আবার কাউকে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতেন না, তার ক্ষতি হতো বলে, ব্যতিক্রম শুধু আমি। আমার রোগ থেকে মুক্তির জন্য তিনি দোয় করে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

কোন এক সন্ধ্যায় আমি প্রচন্ড অসুখে মৃতু্যযন্ত্রণায় ছটফট করছি। দাদী থাকেন গ্রামের বাড়ীতে, অনেক দূরের পথ। সে যুগে তো আর মোবাইল ছিল না যে তাকে খবর দিয়ে আনা হবে। অসুস্থ দাদী, দূর্বল দেহ টেনে টেনে আমাকে দেখতে চলে আসেন গ্রাম থেকে আমাদের মফস্বলের বাড়ীতে। কেউ তাঁকে খবর দেয়নি, কিন্তু তিনি খবর পেয়েছিলেন শ্রেফ অলৌকিক ক্ষমতাবলে।

প্রতি সন্ধ্যায়, মাগরিবের নামাজের পরে তিনি জায়নামাজে বসে ধ্যান করতেন। নিজের দু’টো ছেলের একজন থাকে ঢাকায় । প্রথমেই চেষ্টা চালালেন ঢাকায় সবাই কেমন আছে জানার। সন্তুুষ্টচিত্তে এবার তাকালের কাছের মফস্বলের বড় ছেলের বাড়ীর দিকে। আঁতকে উঠলেন তিনি, সারারাত কান্নাকাটি করে গ্রামের লোক জড়ো করলেন। সুবেহ সাদেকের আগেই প্রতিবেশী মুনসুরকে নিয়ে চলে এলেন আমাকে দেখতে।

দাদীর মৃতু্যর পরে আরেকবার এমনি অসুখে পড়ি আমি। মা বললেন, আহারে! তোর দাদী যদি আজ বেঁচে থাকতেন তবে নিশ্চয়ই ঝেড়ে দিতেন। ভোর রাতেই মা বললেন, আজ আম্মাকে স্বপ্নে দেখলাম, দেখলাম তিনি তোকে ঝেড়ে দিচ্ছেন”। অলৌকিকভাবে সেদিনই আমার অসুখ সেরে যায়। স্বপ্নে কথা মা বলার পর আর কোনদিন এমন স্বপ্ন তিনি দেখেন নি।

আসলে মানুষ পারে না এমন কোন কাজ নেই। শুধুমাত্র ইচ্ছে শক্তিটা যদি আমরা ক্ষুরের মতো ধারালো করতে পারি তবে সমাজের সকল অসঙ্গতির রগে ছোট্ট একটু আঘাত হেনেই অসঙ্গতিগুলো পঙ্গু করে দিতে পারি। একটি সোনালী সমাজের জন্য, আমাদের ভবিষ্যত সোনামনিদের জন্য কি আমরা আমাদের ইচ্ছে শক্তিটাকে কাজে লাগাতে পারি না?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন