মাগো! আমি রাজনীতিবিদ হতে চাই

আবারো গার্মেন্টস অগি্নকান্ডে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন আমার মা, মায়ের উষ্ণ ভালোবাসায় মোড়ানো পবিত্র শরীর, ঝলসে গেছে কাজলা দিদির মেহেদী রাঙ্গানো হাত, স্বপ্ন মাখানো নিষ্পাপ মুখখানি, হারিয়ে গেছে বিপদে আপদে ছায়াদানকারী বাবা নামের বটবৃক্ষটা। ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে কারো কোলে আর ঝাপিয়ে পরা হবে না, কেউ আর দুধমাখা ভাত মুখে তুলে দেবে না। অভিমান করে বাবাকে আর বলা হবে না, “টুকটুকে লাল জামা না হলে এবার আর ঈদই করবো না বাবা”। কাজলা দিদির গলা জড়িয়ে শুয়ে শুয়ে সুয়োরানী-দুয়োরানীর গল্প শোনা হবে না আর। জ্বরতপ্ত কপালে শীতল হাত রেখে কেউ আর শুষে নেবে না আমার সকল দুঃখ, কষ্ট, বেদনা।
আমি যে দিকে তাকাই, আমার মায়ের ঝলসানো বিভৎস্য মুখখানি দেখতে পাই। বহুদূর থেকে মা যেন বলেন, খোকা, “সোনা মানিক আমার, আয় দু’টো দুধ মাখা ভাত খেয়ে যা”।
সারারাত আমি ঘুমোতে পারি না। সদা হাস্যেজ্জল কাজলা দিদির আর্ত চিৎকারে আমার ঘুম টুটে যায়।
পত্রিকার পাতা ছাপিয়ে মাগো তোমার শরীর পোড়া গন্ধ দেশ বিদেশের মানুষগুলোর নাকে আঘাত হানে। সবার দম বন্ধ হয়ে আসে, এক ফোঁটা বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য সবাই কেমন হাপিত্যেস করে বুক চাপড়ায়, একবার দেখে যাও মা।
পৃথিবীর সব প্রান্তে তোমার ঝলসানো শরীরের পোড়া গন্ধ ভেসে বেড়ায়, শুধু পৌঁছে না সুরম্য অট্টালিকা ভেদ করে খালেদা-হাসিনার এয়ারকন্ডিশন্ড বেহেস্তখানায়। ওদের মায়েরা তো তোমার মতো দিন মজুরে না মা, ওদের মায়েরা কখনো আগুনে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয় না।
মাগো, দু’মুঠো খাবারের জন্য তুমি কত কষ্ট করেছে। সকাল সন্ধ্যা, হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষেও নিস্তার মেলে নি। ওভারটাইমের নামে জোড় করে খাটিয়ে নিয়েছে মানুষ রূপী হায়েনার দল।
তোমরা নেই, তাই আজ আর আমার মুখে কেউ মমতা ভরে তুলে দেবে না কলমী শাক আর ইরি চালের দু’মুঠো গরম ভাত। তোমার মৃতু্যতে আমাদের মতো এতিম শিশুদের জীবন থেমে যাবে, হয়তো রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে করে এক সময় হারিয়ে যাব সমাজ থেকে।
সবাই বলে, তোমরা নাকি দেশটাকে বাঁচিয়ে রেখেছ। তোমাদের ঘামের উপর নাকি ভেসে বেড়ায় বাংলাদেশের অর্থণীতি নামের নৌকাটা। তবে মা আমরা কেন না খেয়ে থাকি, খালেদা-হাসিনারা কেন ুক্ষুধায়-তৃষ্ণায় মৃতু্যবরণ করে না।
শুনেছি ওরা নাকি রাজনীতি করে। রাজনীতি নাকি ওদের পেশা। তাই ওরা কোন চাকুরী না করেও, কোন ব্যবসা না করেও কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়তে পারে। আমাদের তো রাজনীতি নেই, আছে পেটনীতি। ুক্ষুধার আগুন নেভাতে আমাদের চবি্বশটা ঘন্টাই পার হয়ে যায়, তবু পেটতো ভরে না। একটা মাত্র তালিদেয়া শার্ট দিয়ে আর কত ঈদ করবো মা?
মাগো, তুমি তো এখন ওপারে আছো। আল্লাহর সাথে দেখা হলে বলো আমাকে যেন রাজনীতিবিদ করে দেয়। রাজনীতিবিদ হলে আর আমার কোন কষ্ট থাকবে না, দু’মুঠো ভাতের জন্য দুয়ারে দুয়ারে কুকুরের মতো ভিক্ষে করতে হবে না। যাকাতের কাপড়ের জন্য লাইনে দাড়িয়ে দক্ষিণ পাড়ার কানা বুড়ির মতো পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মরতে হবে না।
মাগো, আমি রাজনীতিবিদ হতে চাই। তাহলে আর তোমার মতো লাখো মা-বোনের শরীর অঙ্গার হলেও আমার নাসারন্ধ্রে ঢুকতে পারবে না পোড়া শরীরের উৎকট গন্ধ। ঘুমের ঘোরে তোমাদের বিভৎস্য মুখ দেখে আমাকে আর নির্ঘুক রাত কাটাতে হবে না। আমি শান্তি চাই মা, একবার মন ভরে ঘুমাতে চাই। তুমি তো খোদার খুব কাছে চলে গেছ মা, তাঁকে বলো আমি রাজনীতিবিদ হতে চাই, মাগো- আমি রাজনীতি করতে চাই।
(“মাগো, আমি রাজনীতিবিদ হতে চাই” শিরোনামটির জন্য আরাফাত রহমানের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি)

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।