হালিমারা মানুষ নয়, ক্রীতদাস

অবশেষে পাষবিকতার জয় হলো। মানুষ নামের হিংস্র হায়েনাদের বিষ নিঃশ্বাসে ভষ্ম হয়ে পঙ্কিল পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল হালিমা। আজ আর কোন পাষন্ড ছুতে পাবে না তাকে, বিষাক্ত ফনা তোলা গোক্ষুরের মতো পৌরুষ নিয়ে খোরশেদ আলমেরা আর পারবেবা ভুলিয়ে ভালিয়ে কামের আগুনে ঝলসে দিতে।
মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো ১৫ বছর বয়েসী কিশোরী গৃহপরিচারিকা হালিমা খাতুনকে, হার মানতে হলো মনুষত্বের, হার মানতে হলো লাম্পট্যের কাছে ভালবাসার।

বুধবার গভীর রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের কাশেম ঢালীর কন্যা হালিমা। মৃত্যুর আগে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে হালিমার। তবুও কি বিচার হবে খোরশেদ আলমদের, আইনের হাত পারবে কি চেপে ধরতে অসুরের টুটি।

শৈশব থেকেই হালিমারা বেড়ে ওঠে দারিদ্রের সাথে, বেড়ে ওঠে মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত জানোয়ারদের অবহেলা, বঞ্ছনা, অকথ্য গালাগাল আর শারীরিক র্নিযাতনে। মানুষ হয়েও ওরা কখনো মানুষের পরিচয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। আর পারবেই বা কি করে, ওরা যে ক্রীতদাস।

হ্যা, ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে ক্রীতদাস প্রথা। মানুষ হয়েও অন্য মানুষের মালিকানায় ছিল তাদের জীবন। এক শ্রেণীর মানুষই ওদের রবের স্থান দখল করেছিল। ইচ্ছে হলেই বিক্রি করা যায়, ইচ্ছ হলেই পৈশাচিক নির্যাতন করা যায়, ইচ্ছে হলেই এক কোপে দু’ভাগ করে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেয়া যায়। ইতিহাসবিদরা ক্রীতদাস প্রথাকে ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে রেখে তৃপ্ত। কিন্তু গৃহপরিচারিকা নামক মুখরোচক শব্দের আড়ালে যে ক্রীতদাস প্রথা দেশের আনাচে কানাচে মহিরুহের আকার নিয়েছে, তাকে কি করে লুকিয়ে রাখবে পন্ডিতেরা?

পুতুল খেলার দিনগুলোতে সন্তানের শরীর ভরে যায় বাবা মায়ের স্নেহ চুম্বনে। অথচ একই বয়েসী গৃহপরিচারিকার শরীর ঢেকে যায় উত্তপ্ত খুন্তির ছ্যাঁকায়। আরেকটু বড় হলে শরীর পঁচে যায় বাড়ীর ছোটবড় যত কামুক কুকুরের কামড়ে।

ভালবাসা বঞ্চিত হালিমারা প্রলুব্ধ হয় খোরশেদ আলমদের প্রেমের ফাঁদে। শুধু শরীরটাকেই বিষাক্ত লালায় অপবিত্র করতে খোরশেদ আলমেরা প্রেমের অভিনয় করে, ভালোবাসার কথা বলে, সুখ স্বপ্নে বিভোর করে লুটে পুটে নিঃশ্ব করে।

খুলনা মহানগরীর আরামবাগ এলাকার আহসানউল্লাহ কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুল আলমের বাসায় গৃহপরিচারিকা নামের কৃতদাসী ছিল হালিমা।খায়রুল আলমের কলেজ পড়ুয়া ভাই খোরশিদ আলম বিয়ের প্রলোভনে, ভালোবাসার দুষ্টু ফাঁদে ফেলে কিশোরী হালিমার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, লুটে নেয় ইজ্জত। ভৃত্য হলেও হালিমাদের ওটুকুই সম্বল। তাই প্রায়ই হালিমা বিয়ের আবদার জানাতো। তাইতো ভালোবাসার প্রতিদানে খোরশিদ আলম বুধবার সকালে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় হালিমার শরীরে। বুধবার দিবাগত রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবশেষে অভিমানী হালিমা চলে যায় ধরাছোঁয়ার আড়ালে।

এভাবেই বার বার জয় হয় পাশবিকতার, পরাজিত হয় মানবতা, পরাজয় হয় লাম্পট্যের কাছে মনুষ্যত্বের।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“হালিমারা মানুষ নয়, ক্রীতদাস” লেখাটিতে 6 টি মন্তব্য

  1. mushfiq বলেছেন:

    এ হিংস্রতার বিচার কে করবে ?
    হালিমাদের হত্যার বিচার চেয়ে রাস্তায় তো কোন রাজনৈতিক দল মিছিলে গলা ফাটাবে না ।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    হ্যা, ঘরে ঘরে নির্যাতন বন্ধ না হলে রাজনৈতিক ময়দানের নির্যাতন বন্ধ করার চিন্তা বাতুলতারই নামান্তর।

    [উত্তর দিন]

  2. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    আমাদের দেশে পরিবেশবাদী এবং মানবাধিকার রক্ষাকারী দল দরকার আরো বেশি। জেলায় জেলায় শাখা দরকার। থানায় থানায় কমিটি দরকার।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ভালো প্রস্তাব। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ভালো মানুষদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

    [উত্তর দিন]

  3. মোস্তাফিজ চার্চিল বলেছেন:

    খোরশেদের একটা সাক্ষাতকার নিয়ে জাতিকে জানান সেঞ্চুরি করতে তার কত দেরি। ও হ্যা একটা কথা ভুলবেন না। সাক্ষাতকারের একটা কপি প্রধানমন্ত্রীকেও পাঠাবেন, যাতে তিনি তার জন্য বিদেশে একটা সম্মানজনক চাকুরির ব্যবস্থা করতে পারেন।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    কুকুরের সাক্ষাৎকার হয় না, ওদের শুধু মুগুড় দিয়ে পেটানো যায়।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন