হারিয়ে গেল সোনালী বেড়ালটা

শাহানার বেড়াল প্রীতি দেখে আমার পিনতার কথা মনে পড়ে যায়। পনের বছর পরেও
পিনতার স্মৃতি বিদু্যৎ চমকের মতো আমার হৃদয়ে উঁকি দিয়ে যায়। আমার পিনতাকে
মনে পড়ে যায়।
পিনতা। আমার প্রিয় পোষা বেড়ালের নাম। একদম শিশু অবস্থায় ওকে আমরা রাস্তায়
কুড়িয়ে পাই। ক্ষুধার্ত, দূর্বল সোনালী ডোরাকাটা সাদা বেড়াল ছানাটা তখনো
মায়ের দুধ ছাড়েনি। ভারী মায়া হলো অবলা প্রাণীটার জন্য।
বাসায় এনে ছোট একবাটি দুধ দিলাম খেতে। এত ছোট বাচ্চা যে কি করে বাটি থেকে
দুধ খেতে হয় তা ও শেখে নি। উপায় না দেখে হাতের আঙ্গুল দুধে ভিজিয়ে ছানাটার
মুখে দিলাম। কাজ হলো তাতে। একটু একটু করে চেটে চেটে খেয়ে নিল অনেকটা দুধ।
এভাবেই পিনতা আমাদের পরিবারের সদস্যে হয়ে জীবন শুরু করে। আমাদের ভাই
বোনদের মাঝে পিনতাকে নিয়ে আগ্রহের শেষ ছিল না। পিনতাকে নিয়ে আমাদের
সময়গুলো প্রজাপতির রঙ্গিণ ডানায় ভর করে উড়ে যেতে লাগল। স্কুল থেকে ফিরে
মেতে উঠি পিনতাকে নিয়ে নানান খেলায়। হরেক রকম খেলা শিখেছিল সোনালী
বেড়ালটা। বল নিয়ে এত মজার মজার খেলা দেখাতো যে না হেসে কেউ থাকতে পারতো
না। খেলাধুলার পাশাপাশি শিকারেও বেশ ওস্তাদ ছিল সে। অতটুকু বেড়াল ছানা ইয়া
বড় ইদুর শিকার করত আর শিকারটাকে বাগে এনে তাড়িয়ে তাড়িয়ে হত্যা করত, সে এক
দেখার মতো দৃশ্য বটে।
পিনতা ছিল আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। মানুষের সাথে প্রাণীর এতো মধুর সমর্্পক
অনেকেই না দেখে বিশ্বাস করবে না হয়তো। আমি যেখানেই যেতাম পিনতা আমাকে
ছায়ার মতো অনুসরণ করত। কখনো আগে আগে দৌড়ায়, কখনো বা পায়ের পাশে চক্কর
খায়। বেশ ভালো লাগে ওর দুষ্টুমি।
খুব ভোরে মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে পিনতাও আমার সঙ্গী হতো। কাতারবন্দী হয়ে
আমরা সূরা ক্বেরাত পড়ি আর দুষ্টু পিনতা কাতারের সামনে থেকে দৌড়ে এপাশ
থেকে ওপাশে যেত। কখনো মসজিদের টীনের চালে উঠে শিকার খুঁজতো।
নামাজ পড়ার মাঝে হঠাৎ শুনতে পাই পাশের পুকুরে ভারী কিছু পতনের শব্দ। নামাজ
শেষে যা দেখলাম তাকে আমরা কেউ না হেসে পারলাম না। মসজিদের চালে বসে পিনতা
একটা বড় ইদুর তাড়া করে। ইদুরটাও প্রাণ বাঁচাতে ঝাপিয়ে পড়ে পুকুরের পানিতে।
আর আমাদের পিনতা কোন কিছু চিন্তা না করেই ঝাপিয়ে পড়ে ইদুরের সাথে সাথে।
একে তো শীত, তার ওপর আবার বেড়ালের অপছন্দের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান জলের।
টম এন্ড জেরির খেলায় টমের নিয়ম মাফিক পরাজয়ের মতো আমাদের পিনতাও নাকানি
চুবানি খেল ঠান্ডা পানিতে।
এভাবেই বেশ কেটে যাচ্ছিল পিনতার দিনকাল।
একদিন ভোরে হঠাৎ ছোট বোনের কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এক দৌড়ে উঠোনের
পাশে আম গাছটার নীচে গোল হয়ে দাড়িয়ে থাকা মা ও ভাই বোনদের জটলাটার কাছে
ছুটে যাই। যে দৃশ্য সেখানে দেখলাম তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। দেখি
গাছ তলায় পড়ে আছে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পিনতার লাশ। বুকের কাছে অনেকটা
স্থান খুবলে কলজেটা নিয়ে পালিয়েছে কোন পিশাচ বন বেড়াল। দেখে এতো কষ্ট হলো
যে এক দৌড়ে রাখরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দূর থেকে ছোট বোনের কান্না
আমার কান ভেদ করে হৃদয়ের গভীরে টুকে যেতে লাগলো। মনে হলো কেউ যেন আমার
কলজেটা ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না।
পিনতার জন্য আমার হৃদয় গলে গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রুধারা।
আজও যখন শাহানার বেড়ালগুলো দেখি, আমার পিনতার কথা মনে পড়ে যায়। পিনতার
ছুটোছুটি আর দুষ্টুমিভরা মুখটা আমার চোখে ভেসে ওঠে। আমার পিনতাকে মনে পড়ে
যায়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন