বিমানে স্কাই মার্শাল!

ভাবতে খুব অবাল লাগে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে আজ প্রকাশ্যে ঠাট্টা মষ্করা করার সাহস দেখাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো। না, সরাসরি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেনি, তবে এমন কিছু কর্মকান্ড ও প্রস্তাবনা বন্ধুত্বের নামে প্রতিবেশী দেশগুলো দিয়ে যাচ্ছে, তাতে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবজ্ঞাই কেবল প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে বাংলাদেশী নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও তা যথেষ্ট নয় এমনটাই মনে করে ভারত, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের জন্য এসএসবি শিরোনামে যা প্রকাশিত হয়। তাই ৫০জন নিরাপত্তা রক্ষীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশ পাঠানো হয়, বাংলাদেশ সরকারের সাথে কোনরূপ আলাপ আলোচনা না করেই। বাংলাদেশকে না জানিয়েই ভারতীয় দূতাবাস ও সামনের রাস্তা পাহারা দেয়া শুরু করে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষী, অথচ বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দিল্লী উদ্বিগ্ন, এতটুকু মেসেজ সরকারের কানে দিলে পুরো কূটনৈতিক পাড়াকেই ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে দিত বাংলাদেশ।

সম্প্রতি জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় ভারত তাদের যাত্রিবাহী বিমান, বাংলাদেশের বিমানবন্দর ও বাংলাদেশের ভারতের হাইকমিশনে স্কাই মার্শাল মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে। ‘জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও প্রতিকার’ শীর্ষক সভা শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক ১১ জুন ২০১০ এ কথা জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ মুহুর্তেই প্রস্তাবটি লুফে নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং বিভিন্ন দিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে বলে গত ৩১ মে Press Trust of India এর বরাত দিয়ে  Bangladesh examines Indian proposals to put marshals on planes শিরোনামে ভারতে সংবাদ প্রকাশিত হয়।  সংবাদে শুধু ভারতীয় বিমানেই নয় বরং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভারতগামী ফ্লাইটেও ভারতীয় স্কাই মার্শাল নিয়োগের ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হবে বলে উল্লেখ করা হয়। খুব শীঘ্রই উচ্চ পর্যায়ের ভারতীয় প্রতিনিধ দল বাংলাদেশ সফর করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন বলে জানা যায়। তবে বিষয়টি যেহেতু পররাষ্ট্র নীতির সাথে সম্পর্কিত তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ পাওয়ার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেছে এবং খুব সম্ভব এ কারণেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজানো হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি  বলেন, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এবং এর কাঠামোগত পুনর্গঠন করা হবে। আশ্চর্য এই যে কূটনৈতিক সমতার কথা বলা হলেও বাংলাদেশের বিমানেও ভারতীয় স্কাই মার্শাল নিয়োগের তদবির করা হয়, অথচ ভারতগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে বিমান বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করার দাবী যদি জানাতো বাংলাদেশ, তবে তাতে কূটনৈতিক সমতা কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হতো।

ইদানিং ভারত বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিয়েও ভারত পেরেশান, যতটা না পেরেশান তাদের দেশের রাষ্ট্রনায়কদের নিয়ে। NSG boost to Hasina inner cordon শিরোনামে প্রকাশিত খবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষীর ন্যায় একই মানের প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী উপহার দেয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়। ভারতের এমন প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকারের অহংবোধে বাধা উচিত ছিল কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতটাই দূর্বল যে আমরা আমাদের দেশের সম্মানে ন্যূনতম প্রতিবাদ টুকু করতেও জানি না। ভারতের এমন প্রস্তাবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবজ্ঞাই কেবল প্রকাশ পায়।

ভারত কি ভুলে গেছে তারা তাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা দিতে পারে নি, তারা রাজিব গান্ধীর নিরাপত্তা দিতে পারে নি, এমনকি তারা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জীবনের নিরাপত্তাও দিতে পারে নি। তারা পারেনি তাদের বিমান গুলোর নিরাপত্তা দিতে। ১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারী তাদের একটি বিমান ছিনতাই হয়, ধ্বংস করে দেয়া হয় বিমানটি, ১৯৮২ সালের ২২ আগস্ট ছিনতাই হয় আরেকটি বিমান, ১৯৮৪ সালের ২৪ আগস্ট ছিনতাই হয় আরো একটি বিমান, ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ছিনতাই হয় আরো একটি এবং ১৯৯৯ আরো একটি। ভারতের স্মরণ করা উচিত তারা তাদের রেলগুলোতে নিরাপত্তা দিতে পারেনি, নিয়মিত বোমায় নিহত হয় অসংখ্য মানুষ। তারা নিরাপত্তা দিতে পারে নি পাঁচতারা মানের হোটেল তাজমহলের। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৬৭ জন, আহত হয়েছিলেন আরো অন্তত ২৯৩ জন।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করা, ভারত যদি বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তবে তাদেরকে পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়ে আশ্বস্ত করা কিন্তু কোন ক্রমেই ভারতের আদেশ নির্দেশকে শিরোধার্য করে নতজানু পরারাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা করার কোন অধিকার সরকারের নেই। আমরা ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্র বলেই মনে করি, কিন্তু কোন ক্রমেই সে বন্ধুত্বের সীমা দাসত্বে পরিণত হতে দিতে পারি না।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“বিমানে স্কাই মার্শাল!” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    আমাদের সমাজে কিছু অতি মাতুব্বর লোক আছে যারা সবসময়ই তার আশে পাশের লোকদের উপর মাতুব্বরি ফলাতে পছন্দ করে।
    ভারত সব সময়ই বাংলাদেশের উপর মাতুব্বরি ফলাতে চেষ্টা করে। আর আমাদের দেশে কিছু রাজনীতিক আর আমলা আছেন তারা ভারতে দাদাদের কথায় ওঠেন আর বসেন। তাদের যন্ত্রনায় আমাদের প্রাণ হাসফাঁস।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে অনেক দিন ধরেই সমালোচনা চলছে। বলতে গেলে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে ব্যর্থ মন্ত্রণালয় এটি। মন্ত্রণালয় ঢেলে সাজানোর আগে বরং মন্ত্রী পরিবর্তনটাই বেশী জরুরী বলে মনে হয়।

    [উত্তর দিন]

  2. মোস্তাফিজ চার্চিল বলেছেন:

    ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় খাকতে হবে। দেশ গোল্লায় গেলে ওনাদের কি? তখন আমেরিকা বা কানাডায় পারি জমাবেন। দেশ স্বভাবিক হলে আবার দেশে ফিরবেন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করবেন, তারপর আবার …………

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    হ্যা, এভাবেই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের বৃত্তবন্দী করেই শেষ করে দিতে চায় দেশটাকে।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন