কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের প্রতি করজোর মিনতি

বিদেশী বাবু নতুন বাঙ্লা শিখেছেন। বিশুদ্ধ বাঙ্লা। নদীর তীরে দাড়িয়ে আছেন পাড়াপাড়ের আশায়। একের পর এক নৌকা যায়, তিনি হাঁক দেন, “ওহে কর্ণধর, তরী তটে ভিড়াও”। কিন্তু কোন কর্ণধরের কর্ণকুহরে সে শব্দ পৌঁছে না। বাবু বিশুদ্ধ বাঙ্লা ব্যাকরণ শিখেছ, বাঙ্লা জানো না।
ইদানীং বাঙ্লা নিয়ে বিদেশীদের আগ্রহের শেষ নেই। বাঙ্লা ভাষার মাধুর্য তাদেরকে পাগল করেছে এমন ভাবার কোন কারন নেই। তবে কিনা ১৪ কোটি জনতার ভাষা বাঙ্লা, স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাঙ্লা, সেই বাঙ্গালীদের বাজার দখল করতে বাঙ্লা নিয়ে চর্চাতো কিছুটা হতেই পারে।
গুগল ট্রান্সলেটররা বাঙ্লা ভাষা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন, গুগল ডট কম ডট বিডি চালু করে তাতে বাংলিশ শব্দ প্রয়োজ করে লোক হাসানোর চেষ্টা চলছে। মাইক্রোসফ্ট তো আরেক কাঠি সরেস। তারা ইনডিয়ান বেঙ্গলী আর বেঙ্গলী (বাংলাদেশ) বাজারে ছেড়েই ক্ষ্যান্ত হয় নি. ইতোমধ্যে পুরো বাঙ্লা ইন্টারফেস আমাদেরকে ফ্রি গছিয়ে দিয়েছে।
হুজুগে বাঙ্গালী বলে কথা। খবরটা শোনার সাথে সাথেই ডাউনলোড করি। কিন্তু সফ্টওয়ারটি ইনস্টল করে আমার আক্কেল গুড়ুম। মাইক্রোসফ্ট নির্মাতাদের রসবোধ আছে বলতে হবে। এটা করা হোক, ওটা করা হোক জাতীয় ডায়ালোগ দেখে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারি না।
অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। কথাটার মানে এতোদিনে বুঝতে পারলাম। কথায় কথায় হিন্দী, ইংরেজী, উর্দূ বলা পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীরা বাঙ্লার প্রতি অতি মহব্বত দেখাতে গিয়ে বাঙ্লার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছে। এমন সব জটিল জটিল বাঙ্লা শব্দের অত্যাচারে আধা ঘন্টাও আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হলো না। বাধ্য হয়ে আনইনস্টল করতে হলো সফ্টওয়ারটা।
আমি অবাক হয়ে ভাবি, অফিসের আট তলার গ্লাস ঘেরা এসি রুমে বসে এই যে আমি চেয়ারে আরাম করে বসে ক্ষণে ক্ষণে চা পান করছি আর টেবিলে রাখা খাতায় লিখে যাচ্ছি, এর কোথাওকি আমি খাঁটি বাঙ্লা প্রয়োগ করছি?
বিদেশী হাজারো শব্দ গ্রহণ করেছি আর এখন অতি মহব্বত দেখাতে গিয়ে বাঙ্লাকে আরো জটিল করার কোন অর্থ আমি খুঁজে পাই না। আমরা চেয়ার অর্থ করি কেদারা, অথচ কেদারাও বিদেশী শব্দ। তাও না হয় চালিয়ে নেয়া যায় কিন্তু টেবিলের কি অর্থ করবো, গ্লাসের বা কি হবে?
যে জিনিসটা আমি তৈরী করিনি, সে জিনিসটার নামকরণ আমাকেই করতে হবে এতো গোড়ামী ছাড়া আর কিছুই নয়। কম্পিউটার ওরা আবিস্কার করেছে, কম্পিউটার উপযোগী সফ্টওয়ার ডেভেলপ করেছে, ইন্টারনেট চালু করেছে আর এখন এসবের বাঙ্লা নাম করণ করলেই কি কোন কৃতিত্ব আমাদের ঘরে চলে আসবে?
যে লোক আজ প্রথম কম্পিউটার দেখলো তাকে আমি এর নাম কম্পিউটার না কলে যদি পরিগণক বলি, কিংবা হেয়ালী করে বলি জাদুর বাক্স তো তার কাছে ওটা সেই নামেই কম্পিউটারের কাজ দেবে। দেশের মানুষ এখন এ সকল শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছে, এখন কেন বাঙ্লায় রুপান্তরের নামে এই জটিলতা সৃষ্টির প্রয়াস?
আচ্ছা না হয় মেনেই নিলাম বাঙ্লা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য নতুন নতুন শব্দ যোগ করা হচ্ছে কিন্তু এমন কোন ভাষা কি পৃথিবীতে পাওয়া যাবে যা বিদেশী শব্দ নিজেদের ভাষায় আত্ত্বীকরণ করেনি। ইংরেজী ভাষায় প্রতিবছর দু’হাজারেরও বেশী নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে, আর তাই তো এ ভাষা এতটা সজীব। গোড়ামীতে বাঙ্লা ভাষার মৃতু্য হতে পারে, নব জীবন আসবে না। অবশ্য ইহুদীরা জোর করে আবার হিব্রু ভাষাকে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু আমাদের ভাষাতো এমন নয় যে ধর্মীয় অনুভূতি ও ধর্মগ্রন্থের বাণী এর সাথে জড়িত, তাই ও চেষ্টা আমাদের বাঙ্লা ভাষার ক্ষেত্রে খুব বেশী ফল দায়ক হবে না বলে মনে হয়। আবার এমনও তো নয় যে আমাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ নেই বরং আমাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ খুঁজতে গেলে লোম বাছতে কম্বল উজাড়ের মতো অবস্থাই হবে। তাই আমার মনে হয় অহেতুক ঝামেলা করে লাভ কি?
আমার এ লেখা পড়ে কেউ আবার ভেবে বসবেন না যে আমি কম্পিউটারের বাঙ্লা ইন্টারফেস চাই না বরং আমি চাই ইন্টারফেস তৈরীর নামে যেন ভাষাটাকে ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণকে জটিল করে ফেলানা হয়। আমি মনে করি এ কাজের সাথে ভাষা বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভূক্ত করা জরুরী। তারা হয়তো কম্পিউটার ভালো বুঝতে না ও পারেন, সেক্ষেত্রে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞরা তাদের সহযোগিতা করবেন। বই পড়তে শিখলেই যেমন ডাক্তারি বই পড়ে অপারেশন করা নির্বুদ্ধিতার কাজ, ঠিক তেমনি বাঙ্লা ভাষায় কথা বলতে পারি বলেই এ ভাষা নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদেরকে গিনিপিগ মনে করে প্রায় প্রতি বছরই সিলেবাস পাল্টায়) পরীক্ষা নীরিক্ষা করার অধিকার আমাদের থাকতে পারে না।
কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের কাছে করজোড় মিনতি করছি, যার কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নিন, দয়া করে আমাদেরকে বিদেশী বাবুর মতো পিদগ্রস্থ করবেন না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন