ক্যামনে বইবো বল শোকের পাহাড়

বাতাসে লাশের গন্ধ। চারিদিকে শোকের মাতম। স্বজন হারানো ব্যাথায় বাকরুদ্ধ দেশ। যে দিকে দৃষ্টি যায় শুধুই লাশের মিছিল। মিছিল চলেছে আজিমপুর গোরস্থান পানে। গোরখোদকের দল খুড়ে চলেছে সারি সারি শতাধিক কবর। এ খোড়াখুড়ির যেন শেষ , এ কষ্টের বুঝি কোন সীমা নেই।
স্বজন হারিয়ে উদ্ভ্রান্ত যুবক বোবা দৃষ্টিতে তাকায় লাশের দিকে। দু’পা ছড়িয়ে আকুল হয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে থাকা মায়ের মাথা টেনে নেয় কোলে, আরেক কোল জুড়ে স্বর্গের পরী ছোট্ট খুকি। কাকে রেখে কার দিকে তাকাবে সে? এক হাতে পৃথিবী আর এক হাতে বেহেস্ত পেলেও যে মায়ের মুখের হাসি হারাতে রাজি নয় সে, সে আজ কি করে বিদায় দেবে মাকে সীমারের মতো? যে সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী কাটিয়ে দেয়া যায়, ভুলে থাকা যায় জাগতিক যত দু:খ, কষ্ট, যন্ত্রণা, সে সন্তানের ‘বাবা’ ‘বাবা’ ডাকগুলো কি করে আজ মাটিচাপা দেবে সে?

দূরে বাবা যেন তাকিয়ে আছে আকুতি নিয়ে। ছোট্টবেলায় আগুনে এতটুকু ফোস্কা পড়ে অসহ্য যন্ত্রণায় যখন ছটফটিয়ে আর্তনাদ করেছে সে, সারারাত কোলে নিয়ে আদরে আদরে ঘুম পাড়িয়েছেন বাবা। সে বাবা আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে শুয়ে আছে আজ তারই সামনে। “আর যে পারি না খোকা, অসহ্য জ্বালায় শরীর খসে খসে যায়। আয় না বাপ, একটু কোলে তুলে নে আমায়, একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই, একটু শান্তি চাই”। বুক ভেঙ্গে যায় অভিমানে। কি করবে সে আজ, এভাবেই যদি কেড়ে নেবে সবটুকু ভালোবাসা, তবে কেন কারো সন্তান করে পাঠালে পৃথিবীতে, কেন পাঠালে তবে নিষ্পাপ ফুলের বাবা করে, কেন তবে পাঠালে না মোরে আবেগহীণ পাথর করে, খোদা।

পড়ে আছে আদরের বোন, পুড়ে গেছে যত আব্দার, অভিমান। শুয়ে আছে ডানপিটে ছোট ভাই, উড়ে গেছে প্রজাপতির রঙ্গীণ পাখার মতো বাঁধনহারা স্বপ্নগুলো। শুয়ে আছে প্রিয়তমা বউ, বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে ছিনিয়ে আনা একশ আটটি নীল পদ্ম নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ভালোবাসা। পড়ে আছে ছোট্ট সন্তানকে বুকের মাঝে জাপটে ধরে। কিছুতেই আগুনের লেলিহান শিখা যেন ছুতে না পায় প্রাণভোমরা সন্তানেরে। বড় হয়ে ডাক্তার হবে সে, সবার অসুখ ভালো করে দেবে, কাউকে আর মরতে দেবে না বিনে চিকিৎসায়, অপঘাতে। কোথায় তবে তোমরা, আমার ডাক্তারকে ফিরিয়ে দাও আমার কোলে, ভালোবাসার ব্যান্ডেজ দিয়ে সাড়িয়ে তুলুক আজ যত নরক যন্ত্রণা।

হ্যা, নরকই বটে। অথচ আজ তো ছোট্ট ঘরে স্বর্গ নামানোর কথা ছিল। কথা ছিল স্বপ্নের অমৃত বাসরের। পানচিনিতে এসেছিল ওরা সবাই। চারিদিকে আনন্দের বান, হাজীর বিরিয়ানীর সুঘ্রাণে মৌ মৌ পুরো পাড়া। অথচ বিরিয়ানির সুতীব্র ঘ্রাণ ছাপিয়ে লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পাগলা ঘোড়ার মতো, ছড়িয়ে পড়ে পাড়া ছাড়িয়ে পুরো শহরে, শহর ছাড়িয়ে দেশের প্রতিটি কোনে কোনে, সীমানা পেরিয়ে টোকিও থেকে টেক্সাসে।

এত কেন কাঁদাও প্রভু, এত কষ্ট কোথায় রাখি খোদা। রেখে দেখ একবার কষ্টটুকু এভারেস্টের চুড়ায়, হিমালয় গলে গলে, সমুদ্র মহাসমুদ্র ভাসিয়ে, কষ্টের নোনাজলে সুনামির তীব্রতায় প্লাবিত হবে সারা পৃথিবী, তবু কষ্টের বুঝি শেষ হতে নেই। তবু এত কষ্ট কি করে চাপিয়ে দাও হৃদয় মন্দিরে। সবাই বলে পাহাড় নাকি দূর্গম দূর্ভেদ্য। এও বলে, সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী পাহাড় আজো তুমি সৃষ্টি করনি, তবু এত ভারী বোঝা কেন চাপিয়ে দাও বারে বার। আর যে সইতে পারি না, আর যে বইতে পারি না। এবার তবে মুক্তি দাও প্রভূ।

বাবা হারালে সান্ত্বনা দেয়া যায়, মা আগলে রাখে সন্তান। মা হারালে সান্ত্বনা দেয়া যায়, সন্তানের দিক চেয়ে ভুলে থাকা যায় কষ্টগুলো। অথচ আজ আর সান্ত্বনা দেয়ার কেউ নেই, মা-নেই, বাবা নেই, স্ত্রী-পুত্র, ভাই-বোন, আত্মী স্বজন নেই, কেউ নেই। লাশের মিছিলে চলেছে ওরা গোরস্থানের দিকে। গোরখোদকের দল খুড়ে চলেছে সারি সারি কবর। এ খোড়াখুড়ির যেন শেষ , এ কষ্টের বুঝি কোন সীমা নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সান্ত্বনা দিয়েছেন, দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। দেশবাসীকে শোকে ভাসাতে ঘোষিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোক। অথচ কোন ঘোষণাই আজ আর ফিরিয়ে দেবে না হারানো সোনার সংসার। এভাবেই বুঝি বার বার পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হবে ঢাকাবাসী। আবার আগুন জ্বলবে, আবার বাতাস ভারী হবে লাশের গন্ধে, আবার শোক দিবস পালিত হবে, এবং এক সময় ভুলে যাবে সবাই, যতক্ষণ না আরো ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ঝলসে না যায় মানুষের বিবেক। অথচ মৃত্যুকূপ গুলো বন্ধের উদ্যোগ নেই, লাশের কারখানা সীলগালা করার প্রচেষ্টা নেই আছে শুধু লাশের সংখ্যাগোনা শিক্ষিত সরকারী আমলা। ধিক তবে এ সব বিবেকহীন অমানুষদের, ধিক তবে এসব নরখাদক পিশাচদের।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ক্যামনে বইবো বল শোকের পাহাড়” লেখাটিতে 5 টি মন্তব্য

  1. স্বদেশ হাসনাইন বলেছেন:

    আমরা সুখে থাকি কারণ সহজে ভুলে যাওয়া সুখে থাকার অন্যতম উপায় ।

    নির্মাণ কার্যে সতর্কতা লাগে । বাড়ি যাতে ধ্বসে না যায়, তার জন্য মাটি পরীক্ষা লাগে । বাড়ি নির্মাণকালে উপর থেকে ইট-সুড়কি পড়ে যাতে কেউ আহত না হয় তার জন্য জাল বিছিয়ে দেয়া লাগে । শব্দদুষণ, জলদুষণ আর কত কিছুই তো আছে । শুধু নির্মাণ সতর্কতাই নয় সামাজিক ভাবে সবার উপকারের জন্য বাড়ির আসে পাশে কিছুটা জায়গা ছেড়ে দেয়া বাঞ্ছনীয় । বাড়ির পাশের রাস্তা ছাড়া দুরের কথা, সম্ভব হলে রাস্তা দখল করে বাড়ি নির্মাণ মজ্জায় ঢুকে গেছে । সেই অসতর্ক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, শর্টকাট পদ্ধতি আমাদের স্বভাব । জিজ্ঞেস করলে বলি, “আরে কী আর হবে” ।

    যখন বাড়ি বানাই তখন পয়সার খরচ বাঁচানোর জন্য হোক আর যে কারণেই হোক, সমস্ত বিধিবিধান উপেক্ষা করে ..বাড়ি বানাই । শুধু অশিক্ষিত কেন, এমন কি উচ্চ শিক্ষিত মানুষটি যখন ঢাকায় থাকেন, চলা ফেরা করেন – তখন সে হয়ে যায় “আরে কী আর হবে!” মানুষ । যে নিয়ম মানে সে অতি ভদ্র অথবা গাধা ।

    সৌভাগ্যক্রমে অধিকাংশ দুর্ঘটনা হয়না । এটাই হয়েছে সমস্যা । বিপদের ঝুঁকি নিয়ে ফেরীতে চলন্ত গাড়িতে উঠে ডুবে মারা গেছেন চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবীর এবং অভিনেত্রী টিনা । সেটা কার মনে থাকে । অনেকেই তো মরছে না। কত লোক ভাঙা বাসে চড়ে, হলুদ লাইন অতিক্রম করে, কত লঞ্চ পাঁচ গুণ যাত্রী নিয়ে ঠিকই গন্তব্যে পৌছে, কত ফরমালিনে ডুবানো মাছ থেকে মানুষ অসুস্থ হয়না, কত বাড়ি পাইলিং ছাড়া দশতলা হলেও ভেঙে পড়ে না, কত চুলা দিন রাত জ্বললেও আগুন লাগে না, কত ভাঙা পুল মেরামত না হলেও ভেঙে পড়ে না সুতরাং ” আরে কী আর হবে, যেমন ইচ্ছা চলুক, অসুবিধাটা কোথায়”? দু:খজনক এমন চরম দায়িত্বহীন যুক্তিতে সয়লাব বাংলাদেশ ।

    ভেজাল খাদ্য খেয়ে সবাই অসুস্থ হয়না ( অথবা হয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না ) এই অজুহাতে আমরা ভেজাল কে জীবনের অংশ করে ফেলছি । ট্রাফিক নিয়মে মাঝে সাজে অন্যদের ল্যাং মেরে নিজে আগে চলে যাওয়া যায়, তাই ট্রাফিক নিয়ম ভাঙাকে সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য করেছি । যদিও বছরের বাকি দিনগুলোতে নিজেই যে ল্যাং খাচ্ছি তা কে দেখবে । সস্তায় ব্যবসা করতে গিয়ে অন্যের জীবনের ক্ষতি করছি । নিজে ঘুষ খেয়ে কালার টিভি কিনলেও পদে পদে যে অন্যের দুর্ণীতিতে ঠকে যাচ্ছি তা কে ভাবছে?

    সবাই তার মতো দুধ দিক । আমি ভেজাল দিয়ে উপরে চলে যাবো । সবাই নিয়ম মানুক । আমি নিয়ম না মেনে একটু চালাক হবো । এর ফলে বাংলাদেশের পুরোটাই দুধের বদলে এখন ভেজালের পুকুর । এখন যে ভেজাল দিচ্ছে , যে নিয়ম ভেঙে সাময়িক সুবিধা পাচ্ছে । কিন্তু অন্য দিন নিজেও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে । তখন হয়তো অনেক দেরী ।

    হাতে বানানো নৌকাতেও সমুদ্র পাড়ি দেয়া যায় । সেই নৌকাতে পাড়ি দিয়ে অন্য মহাদেশ দখল করা যায় । ইংরেজরা সেটা দেখিয়েছে । কিন্তু তার জন্য অবশ্যই অনেক পরিকল্পণা লাগে । পরীক্ষা করতে হয় সমস্যাটা কোথায় । দীর্ঘপরিকল্পণায় এগুতে হয় । আবহাওয়ার খোঁজ নিতে হয় । আর আমরা বড্ড নিশ্চিন্তে ভাঙা নৌকাতে সমুদ্র পাড়ি দিতে যাই । কি আর হবে – এই একই প্রশ্রয়ের যুক্তিতে । তারপর মাঝ দরিয়ায় গিয়ে যেখানে ফুটা হয় সেখানে ছুটে বন্ধ করতে গিয়ে আর কোন উপায় থাকেনা , কিন্তু সেই বিশাল সংখ্যক ফুটা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ডুবে যাওয়া অবিসম্ভাব্য । হচ্ছেও তাই । পত্রিকায় বাড়ী ধ্বসে পড়ার পর দিন সবাই হৈ হৈ করবে, ইলেকট্রিসিটি নেই বলে মিছিল হবে, বস্তি পুড়ে ছাই হলে পরদিন বস্তি নিয়ে বিতর্ক হবে, বুড়িগঙ্গায় কিছু হলে সবাই পরিবেশের জন্য উচ্ছেদ শুরু করবে । এই তো ।

    আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী জাতি । এর কারণ আমরা নিজেদের জন্যই সবচেয়ে কম দায়িত্ব পালন করি । ঘুমাই আর বংশবৃদ্ধি করি আজকের আনন্দের জন্য । কাল কী হবে পরে দেখা যাবে । আর সব গন্ডগোলে ডুবলে শেষ ভরষা আল্লাহ তো আছেন ই ।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    শতভাগ একমত। আসলে আমরা নিজেরাই মরবো বলে পণ করেছি, নিজেরাই নিজেদের গোর খুড়ে চলেছি।
    সামনে ভয়াবহ দূর্যোগ, এড়ানোর পথ ক্রমশ সরু হয়ে আসছে। প্রতিরোধ যদি অসম্ভব হয়, তবে পালানোর এখনই সময়।

    [উত্তর দিন]

  2. royo বলেছেন:

    ক্যামনে বইবো বল শোকের পাহাড় লেখাটি ভালো হয়েছে…
    কতটা ভালো হয়েছে তা বলতে পারব না, শোকবাক্যের কোনো রেটিং হয় না; কালো
    রঙের যেমন কোনো রকম নেই, ঠিক সেরকম।
    ধন্যবাদ
    p.s. আপনার সাইট্টা খুউব ভালো হইছে, কিভাবে কি করলেন জানতে চাই…

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ।
    শোক প্রকাশের কোন ভাষা হয় না, তাইতো শোকে আমরা অশ্রু ঝরাই।
    http://www.solutionarena.com/ রেজিষ্ট্রেশন, হোস্টিংসহ সাইটের সার্বিক টেকনিক্যাল বিষয়ে সহযোগিতা করছে। তরুন ও উদ্যমী ডেভেলপার টীম এটি।

    [উত্তর দিন]

  3. সাবিনা বলেছেন:

    “এবং এক সময় ভুলে যাবে সবাই, যতক্ষণ না আরো ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ঝলসে না যায় মানুষের বিবেক। অথচ মৃত্যুকূপ গুলো বন্ধের উদ্যোগ নেই, লাশের কারখানা সীলগালা করার প্রচেষ্টা নেই আছে শুধু লাশের সংখ্যাগোনা শিক্ষিত সরকারী আমলা।”
    সুন্দর লেখা, ধন্যবাদ!

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন