বই পাগলা কয়েদী

মোস্তাফিজ ভাই কোথা খেকে যেন একটা উপন্যাস সংগ্রহ করেছে। মরু পথিকের মতো এক ফোঁটা জল দেখে আমার তৃষ্ণা লক্ষ গুণ বেড়ে গেল। যে করেই হোক বইটা আমার চাই-ই চাই।
কয়েকদিন ধরে আমরা ১১ জন সেন্ট্রাল জেলের নাইনটি সেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছি। জেল খানা হলো দূনিয়ার ভেতর আজব আরেক দূনিয়া। আর নাইটি সেল সেই দূনিয়ার জেলখানা অথাৎ জেলখানার জেলখানা। অন্য বন্দীরা জেলের এদিক সেদিক ঘুরে দেখানোর সময় পায়, শুক্রবারে জুমুয়ার নামাজে যায়, কিন্তু নাইনটি সেলের বাউন্ডারীর বাইরে যাওয়া আমাদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ভোরবেলা মুরগীর খোপগুলো খুলে দিলে একটু বাউন্ডারীর ভেতরে পায়চারি করি আবার বিকেল হলেই খোপের ভেতরে আত্মগোপন।
বই প্রেমিকদের জন্য জেলখানায় একটা লাইব্রেরী আছে, তবে বই সংগ্রহ করতে বেশ কিছু ডলার (সিগারেট) খরচ করতে হয়। সরকারের চোখে আমরা যেহেতু খুব বড় মাপের ক্রিমিনাল তাই আমাদের পক্ষে বই সংগ্রহ করা আরো কঠিন।
বারবার মোস্তাফিজ ভাইর পাশে ঘূরঘুর করছি।তিনিও আমার মতলবখানা আঁচ করতে পেরে বেশ সতর্ক হয়ে ওঠেন। আমিও ভাই নাছোর বান্দা। এটা ওটা নিয়ে তার কাছে যাই, খাতির জমানোর চেষ্টা চালাই। সৌদি সরকারের অনুদানে প্রাপ্ত কোরআন শরীফের অর্ধেকটা ইতোমধ্যে শেষ করেছি কিন্তু একটা উপন্যাস পড়ার লোভ সামলানো আমার মতো বই পাগলার জন্য এভারেস্ট জয়ের মতোই কঠিন। ঠোঙ্গা সাহিত্যেরও আমি আবার একনিষ্ঠ পাঠক। হোটেল রেস্তোরায় গরম পরোটার সাথে যে ফ্রি পেপারের টুকরো দেয়া হয় তার লেখাও গোগ্রাসে সাবাড় করি নাস্তার ফাকে ফাকে। আর এখন এ দূর্বিষহ জেলখানায় একটা আস্ত উপন্যাস পেয়েও ছেড়ে দেব এমন সন্যাসব্রত আমার ধাতে সইবে না।
অনেকক্ষণ পড়তে পড়তে মোস্তাফিজ ভাইর মাথা ধরে গেল। বললাম মাথা টিপে দেই? সায় পেয়ে আমার বিশ্বস্ত হাতদুটো তার মাথায়, হাতে, ঘাড়ে বিচরণ করতে শুরু করল।
সময় যায়, আমার হাতের পেশি শিথিল হয়ে আসে কিন্তু আমাকে তো নিরব থাকলে চলবে না। তার বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো শব্দ আমার মনের সুখ পাখিটার ডানা ঝাপটানোর মতোই কানে বাজে। ধীরে ধীরে পৃষ্ঠা সংখ্যা কমে আসে, বই পড়া শেষ হয়, আর আমার মনে আনন্দের বান ডেকে যায়।
কিন্তু ভাগ্য বলেও তো একটা বিষয় আছে। কোথা হতে একটা অসুর এসে নিমেষেই আমার স্বপ্নের জাল ছিন্ন ভিন্ন করে দিল। মোস্তাফিজ ভাইকে জিজ্ঞেস করলো, কিরে তোর এখনো শেষ হয় নি, যার কাছ থেকে ধার এনেছিলাম সে ব্যাটা বইটা এক্ষুণি চাচ্ছে, বলেই ঈগলের মতো ছোঁ মেরে বইটি নিয়ে মূহুর্তেই মিলিয়ে গেলে। আমি হেমিংওয়ের বিধ্বস্ত বুড়ো নাবিকের মতো অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি কিভাবে স্বপ্নগুলো ধোয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন