বাতাসে লাশের গন্ধ

বাতাসে লাশের গন্ধ। দেশের প্রতিটি কোনে কোনে মৃত্যুর ফাঁদ। ঢাকা মহানগরী যেন মৃত্যু উপত্যাকা। আজ আর স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই, বেঘোরে প্রাণ দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। যার ভাগ্য কিছুটা ভালো সে হয়তো মরার আগে জানতে পারে কি তার অপরাধ, কারো কারো তা জানারও সুযোগ মেলে না।

গতকাল রাতে ঢাকাবাসী আবারও মুখোমুখি হলো কঠিন বাস্তবতার। কর্মব্যস্ত সারাদিন শেষে ক্লান্ত মানুষ যখন ছুটে চলে নিরাপদ আশ্রয়ে, ইট পাথরের অট্টালিকার মাঝে সে যখন নিশ্চিন্ত সুখ স্বপ্নে বিভোর, তার আর জানা হয় না এ ঘুম আর ভাঙ্গবে না কোন দিন। যে মা ‘আয় আয় চাঁদ মামা” সুরে সুরে আচলের ছায়ায় ঘুম পাড়ালো আদরের সন্তান, তার আর জানা হয় না, সে ঘুম আর ভাঙ্গবে না কোন দিন।

গতকাল রাজধানীর তেজগাওয়ের বেগুনবাড়িতে চারতলা বিল্ডিং উপড়ে পড়ে পাশের টিনসেড বাড়ীতে, যেখানে অন্তত ২৫টি খেটেখাওয়া সাধারণ পরিবারের বাস ছিল। ইতোমধ্যেই ২৫ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঝিলের মাটি ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে, অনুমোদনবিহীন বাড়ী তৈরীর খেশারত দিতে হলো খেটেখাওয়া মানুষগুলোকে। কি করে দিনের পর দিন রাজধানীতেই আইন প্রয়োগকারী সংস্খার নাকের ডগায় এভাবে মানুষ মারার কারখানা চালু হয় তা খতিয়ে দেখার কি কেউ নেই?

একেকটি দূর্ঘটনার পরে আইন-শৃংখলা বাহিনী তৎপর হয়, মিডিয়ার ভয়ে সরকারী হোমরা-চোমরা আমলারা নড়েচড়ে বসেন, বুদ্ধিজীবীরা বসেন গোলটেবিলে, অতপর এতসব মহাযজ্ঞ শেষে সবাই আবার ক্লান্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তী আরেকটি গণহত্যা না হওয়া পর্য়ন্ত কুম্ভকর্ণদের ঘুম ভাঙ্গেনা। আহা! কতই না ভালো হতো, বেগুনবাড়ী বস্তির ঐ শিশুগুলোর বদলে এসব সরকারী আমলা মন্ত্রী-এমপিরা যদি চীরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়তো ইটপাথরের স্তুপের নীচে।

এর আগে ২০০৫ সালে গার্মেন্টস ভবন ধ্বসে নিহত হয়েছিল ৭৩ জন, নিখোঁজ ছিল আরো শতাধিক। জানি না, নিখোঁজ ব্যক্তিরা ফিরে এসেছিল কিনা মা-বাবার ঘরে, নাকি সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় লাশগুলো গুম করা হয়েছিল। তবে সেদিনও একই অভিযোগ উঠেছিল, অননুমোদিতভাবে তৈরী করা হয়েছিল বিল্ডিংটি। নকশা পরিবর্তন করে, অতিরিক্ত কয়েক তলা বাড়িয়ে মৃত্যুর ফাঁদ পেতেছিল শিল্পপতিরা। আমাদের জানার অধিকার আছে কি, সেদিনের গণহত্যার জন্য আদৌ কি কারো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে? নাকি অবৈধ কালো টাকার দাপটে এভাবেই হারিয়ে যাবে খেটেখাওয়া মানুষের মুখের হাসি, একের পর এক খালি হতে থাকবে অসহায় অভাবী মায়ের বুক। আর কত লাশ পেলে, আর কত মায়ের বুক খালি হলে তবেই হুশ হবে সরকারের?

ঢাকা শহররের ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া ৭২৬টি বাড়ী সনাক্ত করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। কিন্তু সে বাড়ীগুলো থেকে নিরাপদে বসবাসকারীদের সরিয়ে আনার কোন কার্যকরী ব্যবস্থা কি সরকার নিয়েছে? জানতে চাই। যদি জনগণের নিরাপত্তার কথা ভাবা হতো, যেমনটা ভাবা হয় প্রধানমন্ত্রীদের নিজের নিরাপত্তার কথা, তাহলে শাখারীবাজারের বিল্ডিং ধ্বসে কাউকে অকালে প্রাণ হারাতে হতো না। ২০০৪ সালে যখন সরকার ঝুঁকিপুর্ণ বাড়ী সনাক্ত করে তার কয়েকমাস পরে জুনে শাখারী বাজারে নির্মমভাবে নিহত হয় ১২ জন। তারপরও হুশ হয়নি কারো। তাহলে কি ধরে নেব সরকারগুলো মানুষের কান্না শুনতেই ভালো বাসে, যেমন করে মানুষ ভালোবাসে থিয়েটারে ট্রাজেডী মঞ্চায়িত হতে দেখে? যত দূর্ঘটনা, তত লাশ, তত মন্ত্রীদের ছুটোছুটি, ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। আর কে না চায় তেলতেলে মুখখানি টিভির স্ক্রীণ জুড়ে ঝুলিয়ে রাখতে।

মাঝে মাঝেই বিশেষজ্ঞদের কলাম পড়ি, ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা মহানগরী। একটি মাঝারী মাত্রার ভূমিকম্পে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তার পরিসংখ্যান দেখে আতৎকে উঠতে হয়। না, কাউকে ভয় দেখাতে চাই না, শুধু এটুকুই বোঝার জন্য যথেষ্ট যে, যে শহরে বিনা কারণে উপড়ে পড়ে বিল্ডিং, যখন তখন দেবে যায়, ধ্বসে পড়ে ঝড়-ঝঞ্জা ছাড়াই, সে শহরটি কতটুকু বাসযোগ্য তা একবার ভেবে দেখা উচিত। সরকারের উচিত এখনই বিকল্প ভাবা, ঢাকা শহরকে চাপমুক্ত রাখতে এখনই রাজধানীকে নিরাপদ কোন স্থানে সরিয়ে নেয়ার চিন্তা ভাবনা শুরু করা।

আর আমরা যারা ঢাকায় থাকি, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি তাদের উচিত অন্যের বেঁচে থাকাটা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা, কিংবা বলতে চাই আমার দ্বারা যেন অন্যের জীবন বিপন্ন না হয় তা নিশ্চিত করা। যিনি কোন কিছু যাচাই বাছাই না করেই, ঘুষ খেয়ে বিল্ডিংয়ের অনুমোদন দিলেন তিনি ভাবেন, খুব ঠকা ঠকিয়েছি। অবৈধ টাকায় তিনি ছোটেন বাজারে, কেনেন বাহারী ফল-ফলাদি। যে দোকানী ফরমালিন মিশিয়ে আম বিক্রি করেন, তিনিও ভাবেন খুব ঠকা ঠকিয়েছি। অবৈধ টাকা নিয়ে তিনি ছোটেন মনোহরী দোকানে,সন্তানের জন্য দুধ কিনবেন বলে। যে দোকানী মেলামাইনযুক্ত দুধ বিক্রি করে সেও ভাবে, খুব ঠকা ঠকিয়েছি। অবৈধ পয়সা নিয়ে তিনি ছোটেন ওষুধের দোকানে, কয়েকদিন ধরেই তার আদরের সন্তানটি জ্বরে কাতরাচ্ছে। যে ফার্মেসি নকল ঔষুধ ধরিয়ে দিল, সে ভাবে খুব ঠকা ঠকিয়েছি আজ। নকল ওষুধ খেয়ে এভাবে হয়তো বেঘোরে প্রাণ হারায় অনেকেই। যে ওষুধ বিক্রেতা নকল ওষুধ গছিয়ে দিল সে হয়তো আবার ছোটে অবৈধ বাড়ী তৈরীর নকশা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারের দ্বারে। এভাবেই আমরা একে অন্যকে ঠকানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি কিন্তু একবারও ভেবে দেখিনা, এভাবে অন্যকে ঠকাতে গিয়ে নিজেও অন্ধকার বৃত্তে বন্দী হয়ে যাই।

তাই শুধু সরকার নয়, প্রতিটি মানুষকেই জেগে উঠতে হবে, ১৬ কোটি বাংলাদেশীকে উদ্ধার করতে হবে মৃত্যু উপত্যকা থেকে। যে বাতাসে লাশের গন্ধ আছে ছড়ায়ে, সে দেশে শকুনেরা আকাশ কালো করে উড়বেই। শকুনের থাবা থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রতিটি মানুষকেই জেগে উঠতে হবে। অপঘাতে মৃত্যু সম্মিলিতভাবে রোধ করতে হবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“বাতাসে লাশের গন্ধ” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    ২০০৪ সালে জাকির আবু জাফরের লেখা একটি কবিতা তার নিজ মুখে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন, কবিতার নাম ছিল “আতংকের ইশতেহার”। আজ সে কবিতার কথা মনে পড়ছে খুব। কবির কল্পনা যে এত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে কখনো ভাবিনি।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ। কবিতাটি পড়ার শখ হচ্ছে। এখানে তুলে দেয়া সম্ভব হবে কি?

    [উত্তর দিন]

  2. আর কত লাশ দেখবো খোদা | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] বাড়ী উপড়ে পড়ে ২৫ জন নিহত হলে সকালে “বাতাসে লাশের গন্ধ” শিরোনামে ব্লগ লিখেছিলাম। কিন্তু কে […]

মন্তব্য করুন