পিলখানা হত্যাযজ্ঞের রিপোর্ট প্রকাশের জন্য নিষিদ্ধ হলো দৈনিক আমার দেশ

বন্ধ হয়ে গেল অত্যন্ত জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকা দৈনিক আমার দেশ। গ্রেফতার করা হলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। অত্যন্ত হাস্যকর অভিযোগ দিয়ে গ্রেফতার করা হলো তাকে। তাকে গ্রেফতারের জন্য আগেই পত্রিকাটির প্রকাশক হাশমত আলী হাসুকে গোয়েন্দা সংস্থা গ্রেফতার করে দীর্ঘ ৫ ঘন্টা আটকে রেখে দু’টি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। পরে ঐ স্বাক্ষরিত কাগজের মাধ্যমে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতারণা মামলা দায়ের করা হয় এবং আজ ভোর রাতে তাকে গ্রেফতার করা হলো। এর আগে রাত ১১টার সময় পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রতারণার অভিযোগে শুধু মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হলে বিষয়টি সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করতে পারতো কিন্তু পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়ায় সরকারের হীণ উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাহলে এমন কি ঘটেছে যে কারণে বন্ধ হলো পত্রিকাটি? ঘটনার আড়ালের ঘটনাই বা কি? এর উত্তর খুঁজতে একটু পেছনের দিকে তাঁকাতে হয়। কয়েকদিন আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা, প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃতভাবে উপস্থাপনের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক ওয়েবসাইট ও বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ফেসবুক সরকার বন্ধ করে দেয়। এরও কিছু আগে ভিজিও ব্লগ ইউটিউবও সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। এ সবগুলো ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা, একটাই মাত্র সুস্পষ্ট কারণে এসব পত্রিকা ও ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ হলো।

গত বছরের শুরুতে পিলখানায় নজিরবিহীন যে নির্মম ও পাশবিক গণহত্যা সংঘটি হয়েছিল তাই মূলত দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধের মূল কারন। পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর প্রধানমন্ত্রী সেনাকুঞ্জের সমাবেশে যোগ দিয়ে সেনা অফিসারদের তোপের মুখে পরেন, বিক্ষুব্ধ সেনা অফিসাররা বিডিআর বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ সমাবেশের অডিও ফাইলগুলো ইউটিউবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত হয়ে পরে। তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে ইউটিউব বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে বাকশালী স্টাইলে মুখ বন্ধ রাখা যায় না তা হয়তো সরকারের চিন্তায় আসে নি।

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের তদন্তে কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সরকারী তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষ করলেও পুরো তদন্ত রিপোর্ট কেউ জানতে পারে নি। সরকারের নিয়ন্ত্রণে তদন্তের সরকারের পক্ষে যায় এমন একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এবারও শেষ রক্ষা হয় নি। সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেসবুকের মাধ্যমে সরকারী তদন্ত রিপোর্ট আবার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরে। আর এ তদন্ত রিপোর্ট ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে দৈনিক আমার দেশ-এ।

সরকার এক ঢিলে দু’পাখি মারার সুযোগ পেয়ে গেল অবশেষে। বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে যখন তুমুল আন্দোলন, পাকিস্তান বন্ধ করে দিল যখন ফেসবুক, ঠিক তখন বাংলাদেশেও ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হলো। কারন স্পষ্ট করে কেউ জানাতে পারে নি, না বিটিআরসি, না সরকার। কখনো প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করার কথা বলা হলো, কখনো বা ধর্মীয় অনুভূতির কথা। কিন্তু প্রকৃত কারণ এই যে বাংলাদেশের প্রায় যে ১০ লাখ ফেসবুক ইউজার রয়েছে তাদের কাছ থেকে পিলখানা হত্যাযজ্ঞের মূল কারণ আড়াল করতেই সরকার ফেসবুক বন্ধ করল। কিন্তু অত্যন্ত জনপ্রিয় দৈনিক আমার দেশের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই তদন্ত রিপোর্ট সাধারণ মানুষ পড়তে শুরু করায় সরকার বেসামাল হয়ে অবশেষ বন্ধ করে দিল পত্রিকাটি।

কিন্তু অবাক হওয়ার আসলে কিছুই নেই। আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে বাকশাল কায়েম করে ঠিক একই ঘটনা ঘটিয়েছিল, স্তব্ধ করে দিয়েছিল প্রতিবাদের কন্ঠ, বন্ধ করে দিয়েছিল ৪টি দৈনিক বাদে সকল দৈনিক পত্রিকা। একই ভাবে এ সরকার বন্ধ করেছে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ওয়ান, বন্ধ করে দিয়েছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি টকশো বাংলাভিশনের “পয়েন্ট অব অর্ডার”। আরো পত্রিকা ও টিভি ট্যানেল বন্ধের কথা জানিয়েছেন সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী। প্রতিবাদের গনতান্ত্রিক ভাষা সভা-সমাবেশ বন্ধ করা হচ্ছে ১৪৪ ধারা জারি করে। এভাবে সরকার সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিবার্য সংঘাতের দিকে।

আসুন একবার চোখ বুলিয়ে নেই কি রিপোর্ট প্রকাশ করছিল দৈনিক আমার দেশ, আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি অসম্পূর্ণ রিপোর্ট তুলে দেয়ার জন্য, এর দায়ভার আমার নয়, দৈনিক আমার দেশেরও নয়, শুধুই সরকারেন।

_________________________________________

বিডিআর বিদ্রোহের অপ্রকাশিত সরকারি তদন্ত রিপোর্টের চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য সম্প্রতি জানা গেছে। রিপোর্টে ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন জওয়ানদের পিলখানা বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করে ওই ব্যাটালিয়ন কমান্ডারসহ অন্যান্য অফিসারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এ নিয়ে অধিকতর তদন্তের কথা বলা হয়েছে। অপ্রকাশিত ওই রিপোর্টে তদন্ত কমিটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষাত্কারী ১৪ বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যের নামের তালিকা তদন্ত কমিটি জানতে পারেনি। কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেছে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২ মাস আগে থেকে বিদ্রোহের পরিকল্পনা চলে। পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে ষড়যন্ত্রকারীরা বেশ কিছু বৈঠক করে। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপসের অফিস ও তার বাসভবন ‘স্কাই স্টার’-এর বৈঠকে উপস্থিত বিডিআর জওয়ানদের ক’জনের নামও উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। বিদ্রোহের কিছুদিন আগে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমান এমপি শেখ সেলিমের সঙ্গে বিডিআর সদস্যদের বৈঠক ও তাদের দাবি-দাওয়াসংবলিত কপি হস্তান্তর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার জন্য বিডিআর জওয়ানরা সচেষ্ট ছিল বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কমিটি বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা, অস্ত্র জমা দেয়া এবং আটককৃত শিশু ও মহিলাদের মুক্তি দেয়ার শর্ত ছাড়া আর কোনো শর্ত আরোপ করা হয়েছিল কিনা জানা যায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার সময় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে যে বিবৃতি পাঠ করেন তাতে বলা হয়েছিল, ‘বিডিআর প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনাক্রমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহী সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন এবং অস্ত্র জমা দিয়ে তাদের ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি আটক শিশু ও মহিলাদের ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান।’ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বিবৃতিতে মহাপরিচালক বা অন্যান্য অফিসারের পরিণতি বা তাদের ছাড়ার ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। ২০০৯ সালে পিলখানা ট্র্যাডেজির শিকার হয়ে বিডিআরের ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল, ডেপুটেশনে বিডিআরে কর্মরত ৫৭ চৌকস সেনা অফিসারসহ ৭৪ জন নৃশংসভাবে খুন হন। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনা দেশবাসীকে মর্মাহত, বেদনাহত করে। বিদ্রোহের দিন সকাল ১১টা নাগাদ বিদ্রোহীরা তাজা গোলাবারুদ লুট করে। তার আগে বিদ্রোহীদের হাতে তাজা গোলাবারুদ তেমন কিছুই ছিল না। বাইতুল ইজ্জত বিডিআর ট্রেনিং সেন্টারে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু ব্ল্যাঙ্ক কার্তুজ এর আগ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা ব্যবহার করেছিল বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, সকাল সাড়ে ৯টায় ঘটনার সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে পিলখানা বিদ্রোহের খবর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে র্যাবের প্রথম দল পিলখানা পৌঁছায়। সকাল সোয়া ১০টা নাগাদ র্যাব-এর একটি করে দল পিলখানার ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গেটে পৌঁছায়। এর ঘণ্টাখানেকের পর বেলা ১১টা নাগাদ সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের একটি দল ধানমন্ডি মেডিনোভা ক্লিনিকের সামনে অবস্থান নেয়। ব্রিগেড কমান্ডার ট্যাঙ্ক ও এপিসি ছাড়া পিলখানার অভ্যন্তরে কোনো অভিযান চালানো সম্ভব নয় বলে মূল্যায়ন করলে সে অনুযায়ী ৭টি এপিসি ডিপো থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে ক্যান্টনমেন্টে প্রস্তুতি নিলেও ঘটনাস্থলে অভিযানের জন্য আনা হয়নি। ডিএমপি কমিশনার ৯টা ৫০ মিনিটে ঘটনার খবর পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ফোর্স মোতায়েনের জন্য রমনা জোনের ডিসি এবং লালবাগ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। সকাল ১০টা নাগাদ আকাশে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার টহল শুরু করে। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, জিম্মি অফিসার ও তাদের পরিবার-পরিজনদের উদ্ধারে কোনো উদ্ধার অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয়নি। তারা আরও জানান, তাত্ক্ষণিক অভিযান পরিচালনা না করার কারণ এ জন্য কোনো নির্দেশ না পাওয়া।
বিদ্রোহের প্রথমদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টায় পিলখানা ৩ নম্বর গেটে সামনে ‘জয় বাংলা-জয় বিডিআর, বিডিআর-জনতা ভাই ভাই’ বলে স্লোগান দিয়ে শতাধিক মানুষ মিছিল করে।
পিলখানা ট্র্যাজেডির পর সাবেক সচিব আনিস-উজ-জামান খানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। সামরিক ও বেসামরিক লোকদের সমন্বয়ে এ তদন্ত কমিটি কয়েক দফা সময় নেয়ার পর সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয়। প্রায় ৫০ পৃষ্ঠার মূল রিপোর্ট হলেও সরকারের তরফ থেকে তাদের পছন্দানুযায়ী রিপোর্টের কিছু অংশ বাছাই করে ৬ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করা হয়। ২০০৯ সালের ২৭ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের উপস্থিতিতে আনিস-উজ-জামান খান তদন্ত প্রতিবেদনের সরকারের বাছাইকৃত অংশ প্রকাশ করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত এসব বিষয় ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি ‘ফেসবুকে’ সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে।
ফেসবুকে অনলাইনে পাওয়া তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে তদন্ত কমিটির প্রধান আনিস-উজ-জামান খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ নিয়ে কোনো বক্তব্য প্রদান করতে রাজি হননি। কয়েক দফা যোগাযোগের পর তার বক্তব্য ছিল ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কী দিয়েছি, তা আমার মনে নেই। ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের প্রধান ও কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত বক্তব্য নিয়ে তার অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি পুরোপুরি মনে করতে পারছি না, ওখানে কি লিখেছি। একইভাবে সরকারি দলের সঙ্গে বিদ্রোহী জওয়ানদের বিদ্রোহের আগে একাধিক বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব নিয়ে আমি এখন আর কথা বলতে চাই না। এছাড়া আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি। আমার সময়ও হবে না। ফেসবুকে পাওয়া রিপোর্টটি তাদের দেয়া রিপোর্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেসবুক কি আমি জানি না। অনলাইনের কথা বললে তিনি বলেন, আমি এসব এখন যাচাই করতে পারব না। ওই তদন্ত কমিটির সদস্য বিডিআরের নতুন ডিজি মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আমরা তাদের বক্তব্য জানতে পারলে তুলে ধরব। কিছুদিন থেকে ফেসবুকে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও এ নিয়ে সরকার কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
পিলখানা বিদ্রোহের পর ২ মার্চ আনিস-উজ-জামান খানকে সভাপতি করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পাশাপাশি লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে পৃথক একটি সেনা তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তখন সেনা তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে ২০০৯ সালের ২৯ মে আমার দেশ ও পরে কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হয়। কিন্তু বেসামরিক তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এ পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ হয়নি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে দুই তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিভিন্ন সময় আমার দেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বিদ্রোহের আগে জওয়ানদের বৈঠকের বিষয় এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত পর্যায়ে সিআইডি সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি স্থান পেয়েছে।
আনিস-উজ-জামান খানের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ৬.১ (ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, “নির্বাচনের পূর্বে বিডিআরের বেশ কিছু সদস্য ব্যারিস্টার তাপসের (বর্তমান এমপি) অফিসে যান। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাবিলদার মনির, সিপাহী তারেক, সিপাহী আইয়ুব, ল্যা. না. সহকারী সাইদুরসহ ২৫/২৬ জওয়ান ও জনৈক জাকির হোসেন সেখানে উপস্থিত ছিল। (খ) নির্বাচনের ক’দিন পর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিডিআর সদস্য এমপি তাপসের বাসভবন স্কাই স্টার-এ যায়। সেখানে তাকে দাবি পূরণের কথা বলা হলে তিনি রেশনের বিষয়টি ছাড়া অন্য কোনো বিষয় বিবেচনায় আনা সম্ভব হবে না বলে জানান। (গ) ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের বাসায় ২ জন ডিএডি এবং বেসামরিক জাকিরের নেতৃত্বে ১০/১২ জন বিডিআর সদস্য যায়। এমপি সেলিম জানান, এসব দাবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়, তবে তিনি একটি লিখিত কপি চান। (ঘ) পরবর্তীতে এ দলটি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার জন্য সচেষ্ট হয় বলে জানা যায়।”
তদন্ত প্রতিবেদনের ৪১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই ডিজি মহোদয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদেরকে মোবাইলে কথা বলার সময় ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ান বিদ্রোহ করেছে বলে উল্লেখ করেন। আরো জানা যায়, বিদ্রোহ পূর্ববর্তীতে বিডিআর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্পিত বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল লে. কর্নেল শামসকে, যিনি ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি দরবারের নিরাপত্তাসহ সকল প্রশাসনিক আয়োজনের দায়িত্বও ছিল ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের ওপর। অপরদিকে দেখা যায়, এ বিদ্রোহের পর ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের মোট ৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে অধিনায়ক লে. কর্নেল শামসসহ সকলেই প্রাণে বেঁচে যান, যা আপাতদৃষ্টিতে কাকতালীয় মনে হলেও ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটি মনে করে। উল্লেখ্য, এদের মধ্যে লে. কর্নেল শামস নিজে সৈনিকদের হাতে ধরা পড়ার পর বিদ্রোহের ২ দিন জনৈক সুবেদার মেজর সিরাজের বাসায় নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন। উপরোক্ত তথ্যসমূহ পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়, এ বিদ্রোহের ঘটনায় অধিনায়কসহ ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ান সদস্যদের ভূমিকা সন্দেহজনক। এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটি মনে করে।”
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে ১৪ সদস্যের বিডিআর বিদ্রোহী প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় প্রবেশ করে। বিদ্রোহী প্রতিনিধিদল সব চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বেরিয়ে না গেলে আলোচনা করবে না বলে শর্তারোপ করে। এ পর্যায়ে সেখানে অবস্থানরত তিন বাহিনীর প্রধানসহ নিরাপত্তা উপদেষ্টা বের হয়ে যান। তবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য এসএসএফ-এর ৪ জন সদস্য রয়ে যায়। প্রতিনিধিদল তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “জনাব জাহাঙ্গীর কবির নানক ও জনাব মির্জা আজম বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে অনেক আলোচনার পর তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের রাজি করান। পরে তারা ১৪ সদস্যের বিডিআর প্রতিনিধিদকে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার জন্য যমুনায় রওনা হন। কিন্তু এই ১৪ জনের কোনো নামের তালিকা এ পর্যন্ত তদন্ত কমিশন পায়নি।’
বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আগামীকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে আমার দেশ-এ প্রকাশিত হবে।

বিডিআর বিদ্রোহ : সরকারি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট

১.০ সূচনা
বাংলাদেশ রাইফেলস সংক্ষেপে বিডিআর নামে পরিচিত। ঢাকার পিলখানায় এর সদর দপ্তর অবস্থিত। বিডিআরের মহাপরিচালকসহ অন্য কমান্ডিং পদগুলোয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। বর্তমানে বিডিআরের বিভিন্ন স্তরে প্রায় ৪৪ হাজার সদস্য কাজ করছে। বিডিআরের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৭৯৫ সালে প্রথম রামগড় লোকাল ব্যাটেলিয়ন নামে এটি কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে তা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর নামে পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতাযুদ্ধে বিডিআরের ৮ জন সৈনিক জীবন উত্সর্গ করেন এবং তাঁদের মধ্যে দুজন অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন।
বিডিআর মোট ৪৪৬ জন কর্মকর্তার পদ রয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে ৩৮৬ জন এবং বিডিআর জওয়ান থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৫৯ জন। তা ছাড়াও একটি পশু ডাক্তারের পদ রয়েছে। পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরের মোট জনবল ৪,৮৬৬ জন (১,০১১ জন বেসামরিক জনবলসহ), যার মধ্যে কর্মকর্তার সংখ্যা ৮৬ জন। ঢাকার বাইরে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা ৩৬০ জন (সংযোজনী-১)। বিডিআর সদর দপ্তরে মোট পাঁচটি ব্যাটেলিয়ন রয়েছে—সদর, ১৩, ২৪, ৩৬ এবং ৪৪ রাইফেলস ব্যাটেলিয়ন।
মূলত বিডিআর একটি প্যারা-মিলিটারি ফোর্স। এর মূল কাজ দেশের সীমান্ত পাহারা দেয়া, চোরাচালান রোধ করা এবং যুদ্ধকালীন সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে সহায়তা করা। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বিডিআর জওয়ানদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে সীমান্ত রক্ষাসহ এসব কাজে তাদের দক্ষ ও উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের প্রায় ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় এ বাহিনীর সদস্যরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করেন। তা ছাড়াও বিশেষ দায়িত্বের আওতায় এ বাহিনী দুর্যোগ মোকাবিলা, সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, খাদ্যপণ্য বিক্রয় ইত্যাদি কাজে সরকারকে সহায়তা করে থাকে।
পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে প্রবেশের জন্য মোট পাঁচটি গেট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২ নম্বর গেট ইটের দেয়াল দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ১ নম্বর গেটের অবস্থান লালবাগের কাছাকাছি, ৩ নম্বর গেট নিউমার্কেটসংলগ্ন, ঝিগাতলার কাছে ৪ নম্বর গেট যা প্রধান ফটক হিসেবে সমধিক পরিচিত এবং ৫ নম্বর গেটের অবস্থান হাজারীবাগের বাংলাদেশ লেদার টেকনোলজি কলেজসংলগ্ন (সংযোজনী-২)।
প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিডিআর সপ্তাহ’ পালিত হয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত বিডিআর সদর দপ্তরে ‘বিডিআর সপ্তাহ’ উদ্যাপনের জন্য নির্ধারিত ছিল। অনুষ্ঠানসূচির আওতায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে বিডিআর জওয়ানদের প্যারেডে সালাম গ্রহণ করেন। কর্মসূচি অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখ সকাল ৮টায় বিডিআরের বার্ষিক দরবার নির্ধারিত ছিল। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বার্ষিক নৈশভোজ ও টাটু শোর জন্য নির্দিষ্ট ছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বার্ষিক দরবার হচ্ছে আনুষ্ঠানিক। এ দরবারে সাধারণত নীতি-নির্ধারণী বিষয়াদি অবহিত করা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও বিডিআরের সেক্টর ও ব্যাটেলিয়ন পর্যায়েও দরবার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেক্টর ও ব্যাটেলিয়ন পর্যায়ের দরবার সাধারণ সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে একটি মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের দরবারে সাধারণ সৈনিকরা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভাব-অভিযোগ জানানোর সুযোগ পেয়ে থাকেন।
বিডিআর সপ্তাহ উপলক্ষে পিলখানা এলাকা রং-বেরংয়ের ফেস্টুন ও পতাকা দিয়ে সজ্জিত ছিল। ২৪ তারিখ রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত টাটু শোর মহড়া চলে। মহড়া শেষে মহাপরিচালকের নির্দেশে পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারির সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিতব্য দরবারের সময় পরিবর্তন করে সকাল ৯টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ খ্রি. তারিখ ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন (সংযোজনী-৩)। নিহতদের মধ্যে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ ও উপমহাপরিচালকসহ সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আগত অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। বিদ্রোহীরা শুধু সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, তারা অস্ত্রাগার লুট করে, ১৬টি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়, ১৮টি গাড়ি ভাঙচুর করে, বাড়িঘর লুটপাট ও তছনছ করাসহ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার-পরিজনদের ওপর অমানবিক মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালায়। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ এবং জীবিত অফিসার ও তাদের পরিবার-পরিজনদের জিম্মি করে কার্যত দেশকে এক বিভীষিকাময় ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।
২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯ ঘটিকায় বিডিআর দরবার হলে মহাপরিচালক ও উপমহাপরিচালকসহ বিডিআরে কর্মরত ব্যাটেলিয়ন সেক্টর কমান্ডার এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৩৩ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৮৬ জন সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন, বাকি ৪৭ জন বিডিআর সপ্তাহ হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন।
পিলখানা ট্র্যাজেডিতে এ পর্যন্ত মোট ৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে বিডিআরে প্রেষণে আসা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, ১ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, ২ জন সেনা কর্মকর্তার সহধর্মিণী, ৯ জন বিডিআর সদস্য, ৩ জন নিরীহ পথচারী, ১ জন সেনাবাহিনীর সিপাহি ও ১ জন পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন। তা ছাড়াও ২ জন সেনা কর্মকর্তার লাশ এখনও শনাক্তের অপেক্ষায় আছে। বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর জেনারেল ছিলেন ১ জন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ১ জন, কর্নেল ১৬ জন, লে. কর্নেল ১০ জন, মেজর ২৩ জন, ক্যাপ্টেন ২ জন এবং এএমসি অফিসার ৪ জন। যারা প্রাণে বেঁচে গেলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন লে. কর্নেল ৩ জন, মেজর ১৪ জন, এএমসি অফিসার ১৫ জন, নতুন যোগদানকৃত অফিসার ১ জন, অপারেশন ডাল-ভাত মেজর ৫ জন, প্যারেডের জন্য আগত অফিসার মেজর ১ জন, নিমন্ত্রণপত্র বিতরণের জন্য আগত মেজর ৫ জন, পুরস্কার গ্রহণের জন্য আগত মেজর ৭ জন, বিভাগীয় অফিসার (আরডিও) ৮ জন ও বেসামরিক অফিসার ১৪ জন।
বিডিআর সপ্তাহের নির্ধারিত টাটু শোতে প্রায় ৩,০০০ জওয়ানের অংশ নেয়ার কথা ছিল। বিডিআর সপ্তাহ উপলক্ষে ঢাকার বাইরে থেকে ১৭৮৩ জন বিডিআর সদস্যকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় উপস্থিত জওয়ানের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১০,০০০।

২.০ তদন্ত কমিটি গঠন ও কমিটির কর্মপরিধি
২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার ২০০৯ সকাল ৯টা থেকে ঢাকার পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে সংঘটিত বিদ্রোহ ও তত্সহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য গত ২ মার্চ ২০০৯ তারিখ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন (রাজ-২)/গোপ্র-বিবিধ/৪-৫/২০০৯/২০৮ নম্বর স্মারকমূলে (সংযোজনী-৪) সাবেক সচিব আনিস-উজ-জামান খানকে সভাপতি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সদস্য সচিব করে ১০ সদস্যবিশিষ্ট নিম্নরূপ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
১. সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়—কাজী হাবিবুল আওয়াল।
২. মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস—ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মইনুল ইসলাম, এনডিসি, পিএসসি।
৩. প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি—এহছানুল হক, অতিরিক্ত সচিব।
৪. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রতিনিধি—মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, যুগ্ম সচিব।
৫. সশস্ত্র বাহিনীর ৩ জন প্রতিনিধি
(ক) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির, এনডিসি, পিএসসি, পরিচালক, আর্টিলারি, সেনাসদর।
(খ) কমোডর এম নাসির, (এন), এনসিসি, পিএসসি, নৌ-প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা।
(গ) এয়ার কমোডর এম সানাউল হক, এনডিসি, পিএসসি, জিডি(পি), এয়ার অফিসার কমান্ডিং, ঘাঁটি বাশার, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।
৬. অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (প্রশাসন)— নববিক্রম ত্রিপুরা, এনডিসি।
৭. জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল, সেনাসদর—ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নূর মোহাম্মদ।
৮. অতিরিক্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সদস্য সচিব মোঃ গোলাম হোসেন। (চলবে)

২.১ তদন্ত কমিটির কর্মপরিধি
১. ঘটনার পটভূমি
২. ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং
৩. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করা।
প্রাথমিকভাবে কমিটিকে ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় দেয়া হয়। পরবর্তীকালে এ সময়সীমা যথাক্রমে আরও ৭ (সাত) এবং ৪ (চার) কর্মদিবস সময় বাড়ানো হয়।

৩.০ বিবেচ্য বিষয়
গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ খ্রি. তারিখ ঢাকার পিলকানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিডিআর সদস্যদের বিদ্রোহ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কমিটি যে বিষয়াবলী সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বিবেচনায় এনেছে তা হচ্ছে নিম্নরূপ :
(ক) এটি কি কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছিল?
(খ) বিদ্রোহীদের তথাকথিত দাবি-দাওয়া কী কী ও তার যৌক্তিকতা;
(গ) এসব দাবি-দাওয়া মেটানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ নিয়েছিল কি না;
(ঘ) এ বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড কি বিডিআরের ভেতরকার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ;
(ঙ) এর পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না;
(চ) বিডিআর সৈনিকদের দাবি-দাওয়ার সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা কী;
(ছ) বাইরে থেকে অন্য কোনো শক্তি বা মহল এর মদদ দিয়েছিল কি না;
(জ) এ ঘটনার সুবিধাভোগী কারা;
(ঝ) এ বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুদূরপ্রসারী প্রভাব; এবং
(ঞ) এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়গুলো কী কী?

৪.০ তদন্ত পদ্ধতি
কমিটি গত ৩/০৩/২০০৯ তারিখে বিডিআর সদর দপ্তর এবং আনুষঙ্গিক স্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শন করে (সংযোজনী-৫)। পরবর্তী সময়ে কমিটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আহত/উদ্ধারকৃত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, পিলখানার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দরবার হলে উপস্থিত সৈনিক/বেসামরিক সদস্য, বিডিআর হাসপাতালের ডাক্তার, সেনা কর্মকর্তাদের স্ত্রী ও সন্তান, বিডিআর গেটসংলগ্ন ব্যাংকের ম্যানেজার, বিদ্রোহী বন্দি, সাবেক সব মহাপরিচালক ও বিডিআরের কতিপয় কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিডিআর-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীসহ অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের মতামত শ্রবণ ও লিপিবদ্ধ করেছে (সংযোজন-৬)।
বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ও কারণ, নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মোটিভ, বিডিআর অসন্তোষ, ডাল-ভাত কর্মসূচি ও আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আহরিত তথ্য সংগ্রহের প্রয়াস নেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখের নৃশংস ঘটনার আগের ও পরের কয়েকদিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব সংস্থা সরকারকে আগাম কোনো সতর্ক বার্তা দিয়েছিল কি না, বিশেষ করে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখের ঘটনাপ্রবাহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনিটর করেছিল কি না, তা জানার জন্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান অথবা মনোনীত প্রতিনিধিকে কমিটি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা ডিএমপি, এসবি, সিআইডি, র্যাব, এসএসএফ ইত্যাদির কাছ থেকে লিখিত বক্তব্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা-পরবর্তী সময়ে তদন্ত কার্যে সম্পৃক্ত সংস্থাগুলো যেমন—সিআইডি, র্যাব ইত্যাদির সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে ঘটনা বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
কমিটির অনুরোধে র্যাব, ডিএমপি ও এসবি ইলেকট্রনিক মিডিয়া হতে প্রাপ্ত ও তাদের নিজস্ব যেসব ভিডিও ফুটেজ কমিটিকে সরবরাহ করে তা কমিটি প্রত্যক্ষ করে। কমিটি ফুটেজে চিহ্নিত অস্ত্রধারী, লাউড স্পিকার ব্যবহারকারী ও গাড়িচালক সৈনিকদের শনাক্ত করার জন্য সিআইডি এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে অনুরোধ করে। এদের মধ্যে এরই মধ্যে যারা ধরা পড়েছে কিংবা পিলখানায় যোগ দিয়েছে, তাদের কমিটি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তা ছাড়া কমিটি ঘটনার সময় বা পরে ধারণকৃত অডিও, ভিডিও এবং স্থিরচিত্রগুলো এ ঘটনা সত্য উদ্ঘাটনে ব্যবহার করেছে।
নাম, পরিচয় গোপন রেখে তথ্য সরবরাহে আগ্রহী নাগরিকদের কাছ থেকে তথ্য প্রদানের জন্য পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। সচিবালয়ের সব গেট ও পিলখানার মূল গেটে দৃশ্যমান স্থানে এ জন্য অভিযোগ বাক্স স্থাপন করা হয়। কিন্তু অভিযোগ বাক্সে ঘটনা তদন্তে সহায়ক হয় এমন কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্যাদি পাওয়া যায়নি।
২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে পিলখানায় উপস্থিত সৈনিক সংখ্যা, দরকার হলে উপস্থিত সৈনিক সংখ্যা, হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সৈনিকের তালিকা, ২০০১ সাল থেকে সব সৈনিক নিয়োগের তথ্য ইত্যাদি বিডিআর কর্তৃপক্ষ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কমিটির তৈরি একটি প্রশ্নপত্রে ওই সৈনিকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কমিটি বিডিআর জওয়ানদের প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কিছু সংশ্লিষ্ট সৈনিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।

৫.০ সীমাবদ্ধতা
তদন্তের স্বার্থে এ কমিটি কয়েকটি সংস্থার প্রধান, কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা আবশ্যক বলে মনে করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে এ কাজগুলো করা সম্ভব হয়নি। ফলে পর্যান্ত তথ্যপ্রমাণসহ এ বিদ্রোহ এবং হত্যাকাণ্ডের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের শনাক্ত করা এবং ঘটনার পেছনের মূল কারণ বা মোটিভ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
কমিটি সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেমন এনএসআই, ডিজিএফআই, র্যাব, সিআইডি ও পুলিশের এসবিকে তাদের সংগৃহীত বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে কমিটির কাছে সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু বর্ণিত সংস্থাগুলো থেকে ঈপ্সিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
যেহেতু এ কমিটির কাজে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করার উপযুক্ত উপকরণ, প্রযুক্তি এবং কৌশল ছিল না, তাই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কমিটির কাছে উপস্থাপিত বা আনীত প্রায় সবাই কোনো ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা প্রমাণ দেয়নি।
ফলে কমিটির কাছে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী ও পেছনের পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত না করা পর্যন্ত এ ঘটনার পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য বের করা একটি দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ কাজ।

৬.০ পিলখানা ট্র্যাজেডির পটভূমি
দুশ’ বছরের অধিককালের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বিডিআরের নেতৃত্ব শুরু থেকেই দিয়ে আসছে সেনাবাহিনী। ফলে সাধারণ জওয়ান ও সেনা কর্মকর্তাদের মাঝে একটি ব্যবধান সব সময়েই ছিল। সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধের মতো কার্যক্রমের সঙ্গে বিডিআর সদস্যরা সরাসরি জড়িত থাকার কারণে বিডিআরের সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ঘুষ ও দুর্নীতির মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু বিডিআর সৈনিকদের কমান্ডে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তারা এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথে অন্তরায় ছিল। শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কাজের জন্য বিডিআর সদস্যদের শাস্তি প্রদান ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ৫৭ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরির সুযোগ থাকা, অপরাধের গুরুত্বের তুলনায় লঘুদণ্ড প্রদান ইত্যাদি দুর্নীতি প্রতিহত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং বিডিআর সদস্যদের মধ্যে সেনা কর্তৃত্ব মেনে না নেয়ার এক প্রচ্ছন্ন মানসিকতা সব সময়ই নীরবে সক্রিয় ছিল। উপরন্তু এ উদ্ধতপূর্ণ মানবিকতায় পৃষ্ঠ হয়ে বিডিআরের বিভাগীয় পদোন্নতিপ্রাপ্ত ডিএডি এবং এডিরা নানাভাবে উস্কানিমূলক কথাবার্তার মাধ্যমে সাধারণ ও নবাগত সৈনিকদের প্ররোচিত ও বিভ্রান্ত করত।

৬.১ বিদ্রোহের পরিকল্পনা
তদন্তে সহায়তাকারী একটি সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে (সংযোজনী-৭) ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখের হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ ও অন্যান্য অপরাধের পরিকল্পনার সঙ্গে বিডিআরের অনেক সদস্যসহ আরও অনেক বেসামরিক ব্যক্তিরা জড়িত ছিল বলে প্রকাশ। একই সূত্রমতে, প্রায় ২ মাস যাবত্ এ পরিকল্পনার কাজ চলে। পরিকল্পনার বিভিন্ন পর্যায়ে ষড়যন্ত্রকারীরা ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত বেশ কিছু বৈঠক করে। এসব বৈঠকের তথ্যাবলী নিম্নরূপ :
(ক) নির্বাচনের আগে বিডিআরের বেশকিছু সদস্য ব্যারিস্টার তাপসের (বর্তমানে সংসদ সদস্য) অফিসে যান। এদের মধ্যে উল্লেখ্য হাবিলদার মনির, সিপাহি তারেক, সিপাহি আইয়ুব, ল্যা. নায়ক সহকারী সাইদুরসহ ২৫-২৬ জওয়ান ও জাকির সেখানে উপস্থিত ছিল।
(খ) নির্বাচনের ৩-৪ দিন পর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিডিআর সদস্য এমপি তাপসের বাসভবন ‘স্কাই স্টার’-এ যায়। সেখানে তাকে দাবি পূরণের কথা বলা হলে তিনি রেশনের বিষয়টি ছাড়া অন্য কোনো বিষয় বিবেচনায় আনা সম্ভব নয় বলে জানান।
(গ) ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের বাসায় ২ জন ডিএডি এবং বেসামরিক জাকিরের নেতৃত্বে ১০-১২ জন বিডিআর সদস্য সাক্ষাত্ করে। এমপি জনাব সেলিম জানান, এসব দাবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়, তবে তিনি তার একটি লিখিত কপি চান।
(ঘ) পরবর্তী সময়ে এ দলটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করার জন্য সচেষ্ট হয় বলে জানা যায়।
(ঙ) রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে দাবি-দাওয়া সম্পর্কিত ব্যাপারে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা নিয়ে জওয়ানরা নিজেদের মধ্যে পরিকল্পনা করে। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন তারিখে নিজ এলাকায় তারা বেশ কয়েকটি বৈঠক করে।
(চ) ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সদর রাইফেলস ব্যাটেলিয়নের বাস্কেটবল মাঠে এ বৈঠকে জনৈক নেতৃস্থানীয় বিডিআর সদস্য মন্তব্য করে যে, ‘এ রকম দাবি করে কোনো লাভ নেই, অফিসারদের জিম্মি করে দাবি আদায় করতে হবে।’
(ছ) ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, সন্ধ্যা ৭.৩০ ঘটিকায় ৫ নম্বর গেটসংলগ্ন বেসামরিক জাকিরের প্রাইম কোচিং সেন্টারে প্রায় ১ ঘণ্টা বৈঠক করে। জানা যায়, তাদের দাবি-দাওয়া সংবলিত একটি খসড়া লিফলেট প্রাইম কোচিং সেন্টারে টাইপ করিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি পিলখানার সব ব্যাটেলিয়নসহ আরএসইউ অফিসারদের কাছে বিতরণ করে।
(জ) ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি রহিমসহ আরও ৩-৪ জন ডিএডি ৩৬ রাইফেল ব্যাটেলিয়নের এক সৈনিকের বাসায় বৈঠক করে।
(ঝ) ঘটনার আগে রাতে ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের মাঠে একটি চূড়ান্ত বৈঠক হয়। কিন্তু লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় পরে চক্রান্তকারীরা ৫ নম্বর গেটের বাইরে ল্যা. নায়ক জাকারিয়ার (সিগন্যাল) ভাড়া নেয়া টিনশেড বাসায় ৯.৩০ ঘটিকা পর্যন্ত এ বৈঠক চলে।

এ রাতে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় :
(ক) ডিজি ও ডিডিজিকে জিম্মি করা হবে এবং তাদের মাধ্যমে অন্য অফিসারদেরও জিম্মি করা হবে;
(খ) ডিজিকে মনোনীত ২ জন বিডিআর জওয়ান অস্ত্র ধরবে;
(গ) ডিজি’র মাধ্যমে অন্য অফিসারদের জিম্মি করা হবে। কোনো বাধা এলে গুলি করা হবে, তবে হত্যা করা হবে না।
(ঘ) কোত (কড়ঃব) ও ম্যাগাজিন একসাথে দখলকরত হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
(ঙ) জিম্মি করার পর সরকারের কাছে দাবি আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়; এবং
(চ) মিটিং শেষে ২০-২৫ জন বিডিআর সদস্য দাবি আদায়ে হাতে হাত রেখে শপথ নেয়।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে সংঘটিত ঘটনাবলী ক্রমানুসারে সাজালে বিদ্রোহের একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা উদ্ঘাটিত হয়। প্রথমত, ২১ ফেব্রুয়ারি লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে বিদ্রোহের পরিকল্পনাকারীরা অন্য বিডিআর সদস্যদের সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। দ্বিতীয়ত, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে দরবারে ডিজি তার ভাষণে ডাল-ভাত কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে বক্তব্য রাখার সময় সুপরিকল্পিতভাবে একজন বিদ্রোহীকে মঞ্চে অস্ত্রসহ অতর্কিতে প্রবেশ করানো হয়। তৃতীয়ত, সেই বিদ্রোহী ডিজির দিকে অস্ত্র তাক করার পরপর একটি ফাঁকা গুলি করা হয় যাকে বিদ্রোহ শুরুর একটি সিগন্যাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চতুর্থত, সঙ্গে সঙ্গে দরবার হলে উপস্থিত কতিপয় বিদ্রোহী ‘ভাগো’ বলে চিত্কার করে ওঠে এবং সকল সৈনিকদের দরবার ত্যাগের ইঙ্গিত দেয়। পঞ্চমত, এর পরপর দরবার হলের বাইরে পিলখানার সর্বত্র এবং তার পর মোবাইল ও রেডিও’র মাধ্যমে সর্বত্র সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সৈনিকদের চূড়ান্তভাবে উস্কে দেয়ার উদ্দেশে একথা ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, দরবার হলে গুলি করে একজন সৈনিককে সেনা কর্মকর্তারা মেরে ফেলেছে। পরে মিডিয়াতেও বিদ্রোহীদের এ দাবি করতে শোনা যায়, যা পরবর্তীকালে কমিটির তদন্তকালে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন থেকে বিডিআর জওয়ানদের কিছু যৌক্তিক/ অযৌক্তিক অভিযোগ, দাবি-দাওয়ার ওপর ভিত্তি করে তাদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল বলে তদন্তে জানা যায়। তবে কমিটি মনে করে, এজন্য বিপুলসংখ্যক সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যার বিষয়টি তাদের ক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। সার্বিকভাবে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার জন্য কোনো মহল বিডিআর বিদ্রোহীদের দাবি-দাওয়ার আড়ালে নিজেদের কায়েমি স্বার্থ উদ্ধারের প্রয়াস পেয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।

৬.২ লিফলেট বিলি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে একটি লিফলেট (সংযোজনী-৮) সীমিত সংখ্যায় পিলখানায় বিলি করা হয়। লিফলেটটি বহুল প্রচার পাওয়ার আগেই তা বিডিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। তবে দেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ লিফলেট সম্পর্কে কিছুই জানত না। এমনকি পিলখানা ট্রাজেডির কয়েক দিন পরেও কোনো কোনো গোয়েন্দা সংস্থা আলোচ্য লিফলেট সম্পর্কে অনবহিত ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পিলখানা সফর উপলক্ষে প্রকাশিত এ লিফলেটে প্রেষণে বিডিআরে কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল জীবন-যাপন, গাড়ি ব্যবহার, সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মধ্যকার বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামো, নিম্নমানের খাবার, ডাল-ভাত কর্মসূচির টাকা আত্মসাত্, ইজতিমার ডিউটিতে সৈনিকদের জন্য বরাদ্দকৃত নাস্তার টাকা আত্মসাত্, নির্বাচনের বিল পরিশোধ না করা ইত্যাদি অভিযোগ ডিসি শাকিল আহম্মদ, তার স্ত্রী, ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক প্রমুখের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। এ লিফলেটে সেনাবাহিনীর অফিসার প্রেষণে প্রেরণ বন্ধ করে বাংলাদেশ পুলিশের মতো বিসিএস (বিডিআর) ক্যাডার সৃষ্টি করে কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি করা হয়। পরিশেষে হুমকি দেয়া হয় যে, ‘বিডিআর বাহিনীতে ওদের দেখতে চাই না, প্রয়োজনে আন্দোলনের মাধ্যমে কুকুরের ন্যায় সরাব’। সর্বোপরি, ১৯৯৬ পরবর্তী সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জওয়ানদের সঙ্গে দরবার না করার অনুযোগও আলোচ্য লিফলেটে রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বিডিআরের তদানীন্তন মহাপরিচালক এই লিফলেটটি সম্পর্কে ২১ ফেব্রুয়ারিই অবহিত হয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি এটি গুরুত্ব সহকারেই নিয়েছিলেন এবং ওই দিনের মধ্যেই একটি কাউন্টার লিফলেট তৈরির উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে অজ্ঞাত কারণে ওই উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়।
প্রায় অভিন্ন অভিযোগ সংবলিত ২য় লিফলেটটি (সংযোজনী-৯) ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ফার্মগেট ও পিলখানার আশপাশের এলাকায় পাওয়া যায়। এ লিফলেটে সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার, নিপীড়ন, ডাল-ভাত কর্মসূচিতে অনিয়ম, সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ভাতার টাকা আত্মসাত্, দরবার হলের আয় ও রাইফেল স্কয়ার মার্কেটের আয় লুটপাটের অভিযোগ করে সেনা অফিসারদের সব স্থান থেকে হটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিডিআরে লিফলেট বিলির মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়াস নতুন কিছু নয়। বার্ষিক প্যারেড ও দরবারের আগে এ ধরনের লিফলেট আগেও বিলি হয়েছে। তবে একথা সত্য, ২১ ফেব্রুয়ারি বিলিকৃত লিফলেটে যে একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল, কর্তৃপক্ষ তা যথার্থ অনুধাবন ও মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে পিলখানায় প্যারেড পরিদর্শন ও বিডিআর সপ্তাহ উদ্বোধন কর্মসূচি থাকায় বিষয়টি নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো হুমকি ছিল কিনা, তা পর্যালোচনা করা হয়নি।

বিডিআর কর্তৃপক্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে অবহিত করেছে এমন প্রমাণও পাওয়া যায় না। অন্যদিকে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও এ বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞাত ছিল। এটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি অতি দুর্বল দিক তুলে ধরে, যা কোনোভাবেই অভিপ্রেত নয়। ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানা ট্রাজেডি সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অজ্ঞতা এবং ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানার চলমান ঘটনার ওপর তাদের কর্তৃক নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহে ব্যর্থতা ওই বক্তব্যকে সমর্থন করে।

৬.৩ ডাল-ভাত কর্মসূচি
সর্বপ্রথম ২০০৬ সালের শেষের দিকে রমজানের সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধকল্পে তত্কালীন সরকারের সিদ্ধান্তক্রমে বিডিআরের মাধ্যমে জরুরি খাদ্যদ্রব্য বিক্রয়ের জন্য ১০০টি ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু করা হয়। পরে একই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার বিডিআরের মাধ্যমে অনুরূপ কর্মসূচি চালু করে, যা ২৬/৮/২০০৭ তারিখে সরকার ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ নামে আখ্যায়িত করে (সংযোজনী-১০)। দীর্ঘদিন যাবত ডাল-ভাত কর্মসূচি চালু থাকার ফলে বিডিআরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য পেশাগত কর্মকাণ্ডের বাইরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। বিডিআরের মহাপরিচালকসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ কর্মসূচির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বিডিআরকে বের করে আনার জন্য ২০০৮ সালে বিকল্প হিসেবে বিডিআর কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় ১০টি বিডিআর শপ চালু করেন।

৬.৪ অফিসার-জওয়ান সম্পর্ক
প্রেষণে কর্মরত সেনা কর্মকর্তা ও বিডিআর সদস্যদের মধ্যে বাহ্যত সম্পর্ক ভালো মনে হলেও ভেতরে ভেতরে বিডিআর সদস্যরা সেনাবাহিনী থেকে আগত কর্মকর্তাদের ব্যাপারে বিরূপ মনোভাব পোষণ করত। বিডিআর সদস্যদের প্রচারিত বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত লিফলেট দুটিতে এর আভাস পাওয়া যায়। সীমান্ত এবং সদর দফতরের বাইরের ব্যাটালিয়নগুলোতে যথারীতি মাসিক দরবার অনুষ্ঠানের রেওয়াজ প্রচলিত আছে দীর্ঘদিন থেকে। এসব দরবারে জওয়ান ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা তাদের অভাব-অভিযোগ অধিনায়কের কাছে সরাসরি উপস্থাপন করতে পারেন। অপরদিকে বিডিআর সপ্তাহ উপলক্ষে সদর দফতরে বছরে একবার দরবার অনুষ্ঠিত হওয়ার রেওয়াজ আছে। এর আগে সরকারপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ দরবার নেয়ার দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত দরবারের পর থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দরবার গ্রহণ করতেন। বিগত ৩ বছর কোনো দরবার অনুষ্ঠিত হয়নি।
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাই বিডিআর জওয়ানদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে থাকে। সীমান্তে বিডিআরের কর্তৃত্ব সেনা অফিসারদের কমান্ড, শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণের ফসল। ঢাকার বাইরের ইউনিটগুলোতে অফিসার-জওয়ানরা একসঙ্গে খেলাধুলা করত।

৭.০ বিদ্রোহের দুইদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ খ্রি.
২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টার সময় দরবার শুরু হওয়ার কথা ছিল। আগের দিন রাত ৯.৩০টা পর্যন্ত টাটু শো’র জন্য চূড়ান্ত অনুশীলন ছিল। সকালের প্যারেড ও রাতের অনুশীলনের ক্লান্তির অজুহাত তুলে এক ঘণ্টা পিছিয়ে নেয়ার জন্য ডিজিকে অনুরোধ করা হলে দরবার সময় সকাল ৯টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সকাল ৯টায় মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহম্মদ, এনডিসি, পিএসসি এবং তার বাঁ পাশে একটু পেছনে ছিলেন উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমএ বারী, এনডিসি, পিএসসি। দরবার হলে যথারীতি দরবার শুরু হয় সকাল ৯.০২ মিনিটে। মঞ্চের সামনে ডান পাশের প্রথম সারিতে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা, তার পেছনের দ্বিতীয় সারিতে জুনিয়র অফিসাররা ও তৃতীয় (শেষ) সারিতে পুরস্কারের জন্য মনোনীত সব পদবির কর্মকর্তা/জওয়ানরা উপবিষ্ট ছিল। মঞ্চের বাঁ পাশে তিন সারিতে জেসিওরা উপবিষ্ট ছিল। মাঝখানে মঞ্চের দিকে মুখ করে জওয়ান এবং সবার পেছনে এনসিওরা উপবিষ্ট ছিল। দরবারে সর্বমোট উপস্থিত ছিলেন ২,৫৬০ জন।

৭.১ অস্ত্রাগার লুট
সকাল সাড়ে ৮টায় কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র লুণ্ঠন শুরু হয়। এর কিছুক্ষণ পর সেক্টর অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হয়। সিসিটিভি ফুটেজ (সংযোজনী-১১) থেকে প্রাপ্ত সময়ানুসারে ম্যাগাজিন থেকে গোলাবারুদ লুণ্ঠনের কাজ শুরু হয় সকাল ১১.১০ মিনিটে। ২টি পিকআপ ভ্যানে করে গোলাবারুদ নিয়ে যাওয়া হয়। এ কাজে সম্পৃক্ত অধিকাংশ বিদ্রোহীর মুখে কাপড় বাঁধা থাকলেও কাউকে কাউকে সহজেই ভিডিও ফুটেজ থেকে শনাক্ত করা যায়।
দরবার হলে গোলযোগ শুরুর পরপর তার আশপাশে প্রথমদিকে যে গোলাগুলি করা হয়, তা ছিল ব্ল্যাংক কার্টুজের ফায়ার। উল্লেখ্য, এসব ব্ল্যাংক কার্টুজের গুলি শুধু বায়তুল ইজ্জতে অবস্থিত রাইফেল প্রশিক্ষণ স্কুলে প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এ ধরনের কার্তুজ বিডিআর হেড কোয়ার্টারে মজুদ রাখা হয় না। পরে ব্যবহৃত তাজা বুলেট বিডিআরের একটি পুরনো ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যানের মাধ্যমে লুণ্ঠিত অস্ত্রাগার থেকে বিদ্রোহী সৈনিকদের কাছে সরবরাহ করা হয়।

৭.২ দরবার হল ও তার আশপাশ এলাকা
সকাল সাড়ে ৮টায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একদল বিদ্রোহী ৪৪ ব্যাটালিয়নের সন্নিকটবর্তী অস্ত্রাগার (কোত) ভেঙে ফেলে অস্ত্র লুট শুরু করে। তারা সেখানে দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তা মেজর মোঃ রিয়াজুল করিমকে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে ধরাশায়ী করে এবং তার হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলে। এসময় সেখানে দায়িত্বরত কোয়ার্টার গার্ডের সৈনিকরা কোনো বাধা প্রদান করেনি।
সকাল ৯.০২ মিনিটে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহম্মদের সভাপতিত্বে বিডিআর দরবার শুরু হয়। কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে দরবার শুরু হয়। বিডিআর জামে মসজিদের পেশ ইমাম মোঃ ছিদ্দিকুর রহমান কোরআন তেলাওয়াত করেন।
সকাল ৯.০৬ মিনিটে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় মহাপরিচালকের বক্তব্য দিয়ে। কুশল বিনিময়ের অংশ হিসেবে তিনি সালাম দেন এবং উপস্থিত সকলে কেমন আছেন জানতে চান। অনেকের মতে, জওয়ানদের পক্ষ থেকে ডিজি’র সালাম ও কুশল বিনিময়ের জবাব স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। যাই হোক, কুশল বিনিময়ের পর তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত প্যারেড পরিদর্শন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়েছেন এবং প্যারেডের প্রশংসা করেছেন মর্মে সবাইকে অবহিত করেন। এরপর তিনি ডাল-ভাত প্রসঙ্গে বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, ডাল-ভাত কর্মসূচির লভ্যাংশ বণ্টন নিয়ে জওয়ানদের মাঝে কিছু সংশয় ও প্রশ্ন রয়েছে মর্মে তিনি জানতে পেরেছেন।

সকাল ১০টা নাগাদ আকাশে বিমানবাহিনীর কপ্টার টহল শুরু করে। সকাল ১১টা নাগাদ সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের একটি দল ধানমন্ডির মেডিনোভা ক্লিনিকের সামনে অবস্থান নেয়। সেনা অবস্থানের সংবাদ ও হেলিকপ্টার টহল দেখে পিলখানায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা বিক্ষিপ্ত গুলি করতে থাকে। একই সঙ্গে মাইকিং করে বলতে থাকে, ‘আপনারা প্রস্তুত থাকেন, সেনাবাহিনী আসছে…।’ এরই মধ্যে সকাল ১১টা নাগাদ বিদ্রোহীরা ১৬টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। বাইরে থেকে প্রজ্বলিত এ গাড়িগুলোর ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। উল্লেখ্য, ধ্বংসকৃত এ গাড়িগুলো ছিল সেনা কর্মকর্তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন।
সকাল ১১টার দিকে বিদ্রোহীদের অন্য অংশ অন্যান্য অস্ত্রাগারে (কোত-ম্যাগাজিন ও ভাণ্ডার) গিয়ে অস্ত্রাগার ভেঙে অথবা খুলে অস্ত্র তাদের দখলে নিয়ে নেয় এবং বিভিন্ন গেটে তাদের সশস্ত্র অবস্থান সংহত করতে থাকে। তারা মাইকে সদর দফতরে অবস্থানরত সব সৈনিককে অস্ত্র ধারণ করতে বলে এবং যারা বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করবে না তাদের হুশিয়ার করে দেয়। ভিডিও ফুটেজে তাদের কারও কারও মুখ রঙিন কাপড়ে আবৃত দেখা যায়, আবার কারও কারও মুখ অনাবৃত থাকতে দেখা যায়। এসব বিদ্রোহী মিডিয়ার মাধ্যমে বিডিআর থেকে আর্মি সরিয়ে নেয়াসহ সেনাবাহিনী থেকে আসা অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের অভিযোগ উত্থাপন করতে থাকে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে এবং ভেতরে কি হচ্ছিল তা জানা যাচ্ছিল না।
সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যে বিদ্রোহীরা দরবার হলের ভেতরে ও বাইরে একটি ভীতিকর ও বীভত্স পরিস্থিতির সষ্টি করেছিল, যা খুব দ্রুত সারা পিলখানায় ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা রেডিও, ওয়্যারলেস ও মোবাইলের মাধ্যমে তাদের বিদ্রোহের সংবাদ দ্রুত সারাদেশে অবস্থিত বিডিআরের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। বিদ্রোহীরা অন্যসব জওয়ানকে লাইন বা বাসা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মাইকিং শুরু করে এবং তাদের অস্ত্র তুলে নেয়ার নির্দেশ দেয়। জওয়ানরা দলে দলে বেরিয়ে এসে অস্ত্র লুটপাটে অংশ নেয় এবং ফাঁকা গুলি ছোঁড়া শুরু করে। এভাবেই দ্বিতীয় দফা প্রচণ্ডভাবে গোলাগুলি শুরু হয়।
দুপুর ১২-১৫ ঘটিকায় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পিলখানা এলাকায় সরকার কর্তৃক বিদ্রোহীদের প্রতি অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে লিফলেট ছাড়া হয় (সংযোজনী-১২)। এ সময় হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। এ সময় হেলিকপ্টারে ৬টি গুলি লাগে যা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিদ্রোহের এ প্রাথমিক ও অনিশ্চিত পর্যায়ে লিফলেট বিলির জন্য এমন ঝুঁকিপূর্ণ মিশন পাঠানো কতটুকু কার্যকরী ছিল তা বিবেচনার দাবি রাখে। যাহোক, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বৈমানিক সফলভাবে এ মিশন পরিচালনা করেন এবং গুলি লাগা সত্ত্বেও নিরাপদে হেলিকপ্টারটি অবতরণের মাধ্যমে বিমান বাহিনীর ওই বৈমানিক ও তার দল পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দেয়।
দুপুর ১২-৩০ মিনিট নাগাদ ৩ নম্বর গেটের সামনে বিডিআরের পক্ষে শতাধিক মানুষের মিছিল হয়। তারা বিডিআর জওয়ানদের দাবি-দাওয়ার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে ‘জয় বাংলা-জয় বিডিআর’, ‘বিডিআর-জনতা ভাই ভাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে। এরপর বিদ্রোহীরা প্রায় ২০ মিনিট এলোপাতাড়ি কয়েক হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এর পরপরই তারা মাইকে জানায়, আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একা আসতে হবে। তারা তাদের নিরাপত্তা দেবে।
বেলা ১.৩০টায় আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহীদের নিরস্ত্রীকরণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাদা পতাকা নিয়ে ৪নং গেটের সামনে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সংসদের সরকারি দলের হুইপ মির্জা আজম আগমন করেন। তারা সেখান থেকে বিদ্রোহীদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে মাইকযোগে আলোচনার আহ্বান জানান। এরপরও বিদ্রোহীরা গুলিবর্ষণ করতে থাকে।
বিকাল ৩টা নাগাদ প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস ও হুইপ মির্জা আজমের সঙ্গে ৪নং গেটের সামনে অবস্থানরত বিডিআর বিদ্রোহীরা কথা বলতে রাজি হয়। জিগাতলার দিক থেকে সংসদ সদস্য মাহবুব আরা গিনি এবং সংসদ সদস্য ওয়ারেসাত হোসেন পূর্বোক্ত ৩ জনের সঙ্গে যোগ দেন।
জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম বিডিআর বিদ্রোহীদের সঙ্গে অনেক আলোচনার পর তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের রাজি করান। পরে তারা ১৪ সদস্যের বিডিআর প্রতিনিধি দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার জন্য ‘যমুনায়’ রওনা হন। কিন্তু এ ১৪ জনের কোনো নামের তালিকা এ তদন্ত কমিশন কর্তৃক পাওয়া যায়নি। প্রতিনিধি দলটি ৩.৪০ মিনিটে যমুনায় প্রবেশ করে। যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বিদ্রোহী প্রতিনিধি দল সব চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত কোনো সেনা কর্মকর্তা বেরিয়ে না গেলে আলোচনা করবে না বলে শর্তারোপ করে। এ পর্যায়ে সেখানে অবস্থানরত তিনবাহিনীর প্রধানসহ নিরাপত্তা উপদেষ্টা বের হয়ে যান। তবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য এসএসএফের ৪ জন সদস্য থেকে যান। প্রতিনিধি দল তখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে। এ আলোচনায় বিদ্রোহীরা তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। আলোচনায় দৃশ্যত বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেয় ডিএডি তৌহিদুল ইসলাম। যমুনায় তিনবাহিনী প্রধান, আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী এবং তিনবাহিনীর প্রধানের ব্রিফিং অনুযায়ী জাহাঙ্গীর কবির নানক সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টায় অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিডিআর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনাক্রমে প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহী সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন এবং অস্ত্র জমা দিয়ে তাদের ব্যারাকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি আটককৃত শিশু ও মহিলাদের ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান।’
উল্লেখ্য, উক্ত বিবৃতিতে বিডিআরের মহাপরিচালক বা অন্য অফিসারদের পরিণতি বা তাদের ছাড়ার ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। তবে এ ব্যাপারে প্রতিমন্ত্রী নানক বলেন, ভেতরে মহাপরিচালক ও অন্য অফিসারদের ব্যাপারে আলাপ হয়েছে। তখন বিদ্রোহী প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীকে তারা ভালো আছেন জানিয়েছে। তিনি বিদ্রোহীদের দাবি-দাওয়া পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন। বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের পক্ষে ডিএডি তৌহিদ অনুরূপ বক্তব্য দেন। তিনি সব বিডিআর সদস্যকে অস্ত্র জমা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা, অস্ত্র জমা দেয়া এবং আটককৃত শিশু ও মহিলাদের মুক্তি দেয়ার শর্ত ছাড়া আর কোনো শর্ত আরোপ করা হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা শেষে জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম বিডিআর জওয়ানদের নিয়ে পিলখানায় ফিরেন। তখন সময় সন্ধ্যা ৬.৪৫ মিনিট। প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন, একথা শুনে পিলখানায় সাময়িকভাবে স্বস্তি পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর তারা প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণাকে গেজেট আকারে প্রকাশের দাবি করে এবং আগের মতো উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করে। তখন সময় সন্ধ্যা ৭টা। কিন্তু পিলখানায় ফিরে ডিএডি তৌহিদ যমুনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্রোহীদের অস্ত্র জমা দেয়ায় রাজি করাতে পারেননি। এ সময় বিদ্রোহীরা তাদের অপকর্মের সুবিধার্থে পিলখানার অভ্যন্তরে বিশেষ বিশেষ স্থানে বিদ্যুত্ নিভিয়ে দেয়। কিন্তু পিলখানা এলাকায় কেন বিকল্প ব্যবস্থায় আলোকিত করার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কমিটি তার সদ্যুত্তর পায়নি। অন্যদিকে সরকার ঘোষিত সিদ্ধান্ত ও আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পিলখানার ভেতরে আটককৃত অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বের করে আনার সুযোগ হতে পারে এ চিন্তা মাথায় রেখে ডিএমপি ১০টি ট্রাক ও ১০টি বাস ৪নং গেটের সামনে নিয়ে আসে। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সে করে ৫ দফায় আহত ১৫ জন বিডিআর সদস্যকে রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য নিয়ে আসা হয় মর্মে এটিএন সূত্র দাবি করে।

যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ ও মহাজোটের সিনিয়র নেতাদের বৈঠক শুরু হয় সকাল ১০টায়। ওই বৈঠকে তিনবাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
সকাল ১১-৩০ মিনিটে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের বৈঠক হয়। এতে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
দুপুরে পিলখানার ২নং গেটের সামনে ৪০-৫০ জন মিছিল বের করে, ‘বিডিআর-পাবলিক ভাই ভাই, সেনাবাহিনীর বিচার চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়। মিছিলটি ১নং গেটের সামনে থেকে বের হয়ে ২নং ও ৩নং গেট হয়ে নিউ মার্কেটের দিকে যায়। বেলা ১.৩০টায় ১নং গেটে ৪০০-৫০০ লোক বিডিআরের সদস্যদের সমর্থনে পুনরায় মিছিল বের করে আজিমপুরের দিকে চলে যায়।
দুপুর ১২-৩০ মিনিটে পিলখানার ৪নং গেটের ভেতর থেকে ৭/৮ জন বিডিআর সদস্য বেরিয়ে এসে বলে, ‘যদি সেনাবাহিনী একজন বিডিআর সদস্যকে গুলি করে মারে তাহলে পুরো ঢাকা গুলি করে উড়িয়ে দেব।’ তারা আরও বলে, ‘সাধারণ জনগণকে আমরা মারতে চাই না। সেনাবাহিনীকে বলে দেন, তারা যেন ব্যারাকে ফিরে যায়, তা না হলে আমরা অস্ত্র জমা দেব না।’ এরই মধ্যে সরকারি তথ্য বিবরণীতে বেলা ২টার মধ্যে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের অস্ত্র জমাদানের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়।
বিদ্রোহীরা এ মর্মে মাইকিং করে যে, ‘সামরিক বাহিনী পিলখানা ঘিরে ফেলেছে। যে কোনো সময় আক্রমণ করতে পারে।’ সবাইকে লাইন ও বাসা থেকে বের হয়ে এসে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান হয়। আরও ঘোষণা করা হয়, তাদের কাছে যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে, তা দিয়ে কমপক্ষে ১০ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। এতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও এ সময় অনেক বিদ্রোহীর মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা মন্তব্য করেছে।
বেলা ১টা ৩০ মিনিটে মাহবুব আরা গিনি এমপি ও সেগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপির নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধি দল পিলখানায় প্রবেশ করে। প্রায় ১ ঘণ্টা পর তারা ৩ সেনাকর্মকর্তার পরিবারকে বের করে আনেন। অন্যদিকে একই সময়ে হোটেল আম্বালা-ইন-এর বৈঠক থেকে মতিয়া চৌধুরী ও এরশাদসহ অন্যরা চলে যান। বিদ্রোহীদের সঙ্গে বৈঠক ব্যর্থ হয়। সরকারি ঘোষণায় বিদ্রোহীদের বেলা ২টার মধ্যে সব অস্ত্র জমা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর হঠাত্ পিলখানার মূল গেটে বিডিআর জওয়ানদের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু হয়।
বেলা ২.৩০ মিনিটে ১২ সদস্যের মহাজোট মধ্যস’তাকারী কমিটি গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জলিল এমপির নেতৃত্বে এ কমিটি পিলখানায় আসেন। এতে ছিলেন সর্বজনাব রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, আসাদুজ্জামান নূর, শেখ সেলিম, মাইনুদ্দিন বাদল, জিয়াউদ্দিন বাবলু, আনিসুল ইসলাম মামুদ, নূরুল ইসলাম বিএসসি প্রমুখ। তারা ডিএডি তৌহিদসহ ৫-৬ বিদে”াহী বিডিআর সদস্যের সঙ্গে হোটেল আম্বালা ইন-এ আলোচনা করেন। তারা কঠোর কণ্ঠে বলেন, ‘আপনারা অস্ত্র জমা দিয়ে আমাদের জানান, আমরা আপনাদের দায়-দায়িত্ব নেব। সময় অল্প, পরবর্তী সময়ে দায়-দায়িত্ব নেব না।’ তখন ডিএডি তৌহিদ বলেন, ‘আপনাদের কথায় অস্ত্র জমা দেব না।’ এরপর বিডিআর প্রতিনিধি দল অন্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভেতরে যায়।
যেহেতু বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে (বেলা ২টা) বিদে”াহীরা অস্ত্র জমা দেয়নি, ফলে বিদে”াহীরা আশঙ্কা করছিল যেকোনো সময় সেনাবাহিনী আঘাত হানতে পারে। এরই মধ্যে স’ানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের নির্দেশে পিলখানার পার্শ্ববর্তী তিন বর্গ কিলোমিটার এলাকার অধিবাসীদের এলাকা খালি করার জন্য মাইকিং করা হয়। এ ছাড়া সেনাবাহিনীও এলাকা ছেড়ে দেয়ার জন্য মাইকিং করে।
বেলা ২.৩০ ঘটিকায় প্রধানমন্ত্রীর টিভি ও বেতার ভাষণ প্রচার করা হয়। তিনি বিদে”াহীদের অস্ত্র সমর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন। তিনি তাদের উদ্দেশ করে তাকে কঠোর হতে বাধ্য না করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর বিদে”াহীরা অস্ত্র সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। বিকাল ৪টায় আম্বালা ইন-এ অর্থমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে বিদে”াহীদের বৈঠক হয়। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স’ানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও হুইপ মির্জা আজম ৪নং গেট দিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করেন। বিদে”াহীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বিকাল ৫.৫০ মিনিটে বিদে”াহীরা অস্ত্র সমর্পণ শুরু করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সমর্পিত অস্ত্র হেফাজতে নেয়ার জন্য ৪নং গেট দিয়ে পিলখানায় কিছু পুলিশ প্রবেশ করে। ৩ ও ৫নং গেটেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাতে পুলিশ পিলখানায় অবস’ান গ্রহণ করে। পুলিশ ইতস্তত ছড়ানো অস্ত্র ও গোলাবারুদ কুড়িয়ে অস্ত্রাগারে রাখার ব্যবস’া করে এবং পাহারার ব্যবস’া করে। রাত সাড়ে ৮টায় পিলখানা থেকে বেরিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন—পরিসি’তি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উল্লেখ্য, মোট কতগুলো ও কী কী অস্ত্র সমর্পণ করা হয়েছে, কে এসব অস্ত্রের হেফাজত গ্রহণ করে এবং অস্ত্র সমর্পণকারী কতজন বিদে”াহীকে কার জিম্মায় রাখা হয় তার কোনো বিবরণ জানা যায়নি। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, পিলখানায় উপসি’ত মাত্র শ’ দুয়েক বিদে”াহীকে পুলিশ প্রহরায় একত্রে বিডিআর হাসপাতালে রাখা হয়।
৮.০ ঢাকার বাইরে বিডিআর অবস’ানে বিদে”াহ এবং বিদে”াহ প্রশমন
২৫ ফেব্রুয়ারির বিডিআর বিদে”াহের খবর বিডিআরের নিজস্ব রেডিও, বিদে”াহীদের মোবাইল, তাদের আত্মীয়স্বজন, সর্বোপরি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এর লাইভ প্রচারের কারণে দ”ুত ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিডিআর সেক্টর, ব্যাটালিয়ন, ক্যামড় ও ফাঁড়িগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে এবং তা ২৬ ফেব্রুয়ারিতেও অব্যাহত থাকে। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি এ দুই দিনে ঢাকার বাইরে মোট ৩৬টি ক্যামড়/ব্যাটালিয়ন/সেক্টরে বিদে”াহ (সংযোজনী-১৩) সংঘটিত হয়েছে। ‘সেনাবাহিনী আক্রমণ করতে আসছে’—এ ধরনের মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়লে সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে জওয়ানরা অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং গোলাগুলি শুরু করে। কোনো কোনো ত্রে নিরস্ত্র সেনা অফিসাররা প্রাণ রার্থে পালাতে বাধ্য হন। বিদে”াহীরা বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে গাছ কেটে ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। আশপাশের জনগণকে মাইকিং করে সতর্ক করে।
খুলনায় বিডিআর বিদে”াহীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাদের প েস’ানীয় জনগণ মিছিল করে ও স্লোগান দেয়। সাতকানিয়ায় বিডিআর বাইতুল ইজ্জত ট্রেনিং সেন্টারে গোলাগুলিতে তিনজন বিডিআর সদস্য আহত হয়। টেকনাফেও বিডিআর বিদে”াহীরা গোলাগুলি করে। নওগাঁয় সেনাবাহিনীর আক্রমণের গুজবে কান না দিতে বিডিআর কর্মকর্তারা মাইকিং করে। সিলেটের আখালিয়া বিডিআর হেড কোয়ার্টারের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে কয়েকটি গাড়িতে বিদে”াহীরা অগ্নিসংযোগ করে। রাঙামাটি ও শেরপুরে বিভিন্ন পর্যটন সড়টে পর্যটকদের গাড়ি প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
রাহশাহীতে ৩৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের বিদে”াহীরা ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে অনবরত গুলিবর্ষণ করে বিদে”াহে অংশ নেয়। গুলিতে মফিজ উদ্দিন নামের একজন রিকশাচালক আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি হয়। যশোরে ১১ রাইফেল ব্যাটালিয়ন সকালে বিদে”াহীরা তালা ভেঙে কোতের দখল নেয়। বিদে”াহীরা ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজ ও মেজর মাহবুবকে জিম্মি করে। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে (১০.৩০টা নাগাদ) টেকনাফ ৪২ রাইফেল ব্যাটালিয়নে বিদে”াহ হয় এবং একতরফা গুলিবর্ষণ গভীর রাত পর্যন্ত চলে। সেনা কর্মকর্তারা নিরাপদে ক্যামড় থেকে সরে যেতে সম হন। পঞ্চগড় ২৫ রাইফেল ব্যাটালিয়নের বিদে”াহীরা কয়েক শ’ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিদে”াহ ঘোষণা করে এবং পঞ্চগড়-ঢাকাসহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দিনাজপুরে বিডিআর হেডকোয়ার্টারে চেইন অব কমান্ড ভেঙে যায়। তারা দিনাজপুর সেক্টরে কর্মরত উপসহকারী পরিচালক মো. বেলাল হোসেন ও ২ রাইফেল ব্যাটালিয়নে কর্মরত উপসহকারী পরিচালক মো. মোবারক হোসেনকে যথাক্রমে ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার ও ভারপ্রাপ্ত ব্যাটালিয়ন কমান্ডার নিয়োগ করে। দিনাজপুরে বিদে”াহীরা নিজেদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের নাম ঘোষণা করে।
যশোরের ঝুমঝুমপুরের ২২ ব্যাটালিয়নের বিদে”াহীরা ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে অস্ত্রাগার লুট করে। সাতীরার কৈখালী সীমান্ত থেকে কুষ্টিয়ার চিলমারী পর্যন্ত ৬১২ কিলোমিটার সীমান্ত অরতি রেখে বিদে”াহীরা সরে আসে। বিদে”াহীরা ভোমরা স’লবন্দরে অবস’ান নেয়, বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। নওগাঁয় ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। একই দিন রাত ১২টায় ১২ রাউন্ড গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গা ৩৫ রাইফেল ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা বিদে”াহ করে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক গাছ ও বালুর বস্তা ফেলে বন্ধ করে দেয় বিদে”াহীরা। নাই্যংছড়িতে ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে দফায় দফায় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। সেনাবাহিনী বান্দরবান জেলা সদর বিডিআর ক্যামড় ঘেরাও করে রাখলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ঝিনাইদহ জেলার ৮টি বিডিআর ক্যামেড়র জওয়ানরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এখানে সকাল ১০টা থেকে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ হতে থাকে। ফেনীর জয়লস্কর বিডিআর ক্যামেড় কয়েকশ’ রাউন্ড গোলাগুলি হয়। ফেনী-মাইজদি সড়ক গাছ ফেলে বন্ধ করে দেয়া হয়। রামগড়ে বিডিআর সেক্টরে থেমে থেমে গুলিবর্ষণ হয়েছে। সিলেটে আখালিয়া বিডিআর সদর দপ্তরের জওয়ানরা বিদে”াহ ঘোষণা করে ব্যারাকের বাইরে অবস’ান নেয়। কুড়িগ্রাম বিডিআর ক্যামেড় জওয়ানরা ফাঁকা গুলিবর্ষণের পাশাপাশি ক্যামড় এলাকার সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ২৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিওকে জিম্মি করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে বিদে”াহ ঘোষণা করে সাতীরার ৪১ ও ৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা। ভোমরা স’লবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
৯.০ তদন্ত কমিটি কর্ত”ক প্রাসঙ্গিক বিষয়াদির পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ
৯.১ গোয়েন্দা তত্পরতা-ঘটনাপূর্ব ও চলমান
২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিতে বিডিআর বিদে”াহ উপল েপিলখানায় ৩৩ ঘণ্টাব্যাপী পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে, এটি কি কোনো পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে, নাকি একটি নিছক তািণক ঘটনা ছিল? ঘটনা শুরুর পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, এটি একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ঘটনা ছিল। যদি তাই হয়, প্রশ্ন উঠেছে দেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস’াগুলো কি এ বিষয়ে সরকারকে কোনো আগাম সতর্ক বার্তা দিয়েছিল? যদি দিয়ে থাকে, তবে তা প্রতিহত করার জন্য কী ব্যবস’া নেয়া হয়েছিল? যদি না দিয়ে থাকে, তবে কেন দিতে পারেনি? এর দায়-দায়িত্বই বা কার ছিল?
ঘটনার শুরু থেকে বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় সমড়র্কে দ”ুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ত্রে গোয়েন্দা তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। আলোচ্য ত্রে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস’া ও বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর ভূমিকা কী ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের সর্বো”চ পর্যায়ে নীতি-নির্ধারণী অথবা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ত্রে, বিদে”াহীদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় বসার ত্রে এবং সর্বোপরি সরকার প্রধানের সঙ্গে বিদে”াহী দলের নেতাদের বৈঠকের আগে আলোচনায় সহায়ক তথ্য কি সরবরাহ করা হয়েছিল? বিদে”াহের পরপরই কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল কি না, যাদের জিম্মি করা হয়েছে তাদের কোথায় ও কী অবস’ায় রাখা হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে সংগ”হীত তথ্য সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস’া সরকারপ্রধানের কাছে অবশ্যই উপস’াপনীয় ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি বা এ ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়াও ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সরকারপ্রধান বিডিআর সপ্তাহ উপল েপ্রধানমন্ত্রীর প্যারেড গ্রহণ করার কথা ছিল। এ উপল েপিলখানায় কোনো হামলা অথবা বিশ””খলার হুমকি ছিল কি না, এ বিষয়ে কোনো সংস’া কোনো আগাম বার্তা সরবরাহ করেছিল কি না, এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়।
কমিটি ওপরে বর্ণিত প্রশ্নগুলো দেশের প্রধান তিনটি গোয়েন্দা সংস’া এনএসআই, এসবি, ডিজিএফআইয়ের কাছে উপস’াপন করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘বাংলাদেশ রাইফেলস সপ্তাহ ২০০৯’ উপল ে২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে পিলখানায় প্রধানমন্ত্রীর যোগদান অনুষ্ঠানসূচিতে ছিল। (ক) সকাল ৯টায় বিডিআর জওয়ানদের কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ, (খ) কুচকাওয়াজ শেষে আয়োজিত চা চক্রে অংশগ্রহণ, (গ) বিডিআর সদর দপ্তরে আয়োজিত ফটোসেশনে অংশগ্রহণ, (ঘ) সম্মেলন ক েসেক্টর কমান্ডার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দান ইত্যাদি। (চলবে)
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে প্রধানমন্ত্রীর পিলখানা সফর উপল েএকটি প্রতিবেদন (সংযোজনী-১৩) ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে এসএসএফের কাছে পাঠানো হয়। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বর্ণিত কর্মসূচিতে যোগদানের ত্রে ভিআইপির ব্যক্তি নিরাপত্তায় প্রত্য বা পরো হুমকি-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আপাতত নেই।’ প্রতিবেদনে পরিসি’তি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়, ‘ভিআইপি কর্ত”ক অনুষ্ঠানস’লে অবস’ান ও গমনাগমন পথে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের নাশকতামূলক তত্পরতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না বিধায় ভিআইপির নিরাপত্তা ব্যবস’ায় সর্বো”চ সতর্কতা অবলম্বন করা সমীচীন।’ এ ছাড়াও এনএসআই ভিভিআইপির সর্বো”চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কিছু রুটিন সুপারিশ করেছে। বিদে”াহ চলাকালে এবং বিদে”াহ পরবর্তী সময়েও এ সংস’ার তেমন কোনো তত্পরতা পরিলতি হয়নি।
এসবি থেকে তদ্বীয় অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের স্বারে গত ৫ মার্চ ২০০৯ তারিখে একটি প্রতিবেদন (সংযোজনী-১৪) প্রেরণ করা হয়। তিনি নিজে শুনানিতে উপসি’ত হয়ে বক্তব্য (সংযোজনী-১৫) প্রদান করেন।
সরকারপ্রধানের পিলখানা আগমন উপল েপ্রতিরা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে একটি প্রতিবেদন (সংযোজনী-১৬) মহাপরিচালক, সেড়শাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) কাছে পাঠায়। এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সন্ত্রাসী চক্রের সংঘবদ্ধ বা বি”িছন্নভাবে আক্রমণের সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকির সম্ভাবনা নেই।
২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদে”াহ সমড়র্কে এসবি, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের লিখিত ও ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসাবাদে প্রদত্ত বক্তব্য পর্যালোচনায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পরিলতি হয় :
(ক) বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট তথা রাইফেল সিকিউরিটি ইউনিটে (আরএসইউ) কর্তব্যরত বিডিআর সদস্যরা (এফএস) নিজেরাই বিদে”াহে জড়িত থাকায় বিদে”াহসংক্রান্ত কোনো আগাম গোয়েন্দা তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্ত”প কর্ত”ক সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে আরএসইউতে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে অসচেতনতা ও ব্যর্থতা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকে বাধাগ্রস্ত করেছে;
(খ) কোনো সংস’ার কাছে ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখের বিডিআর বিদে”াহ সমড়র্কে কোনো সুনির্দিষ্ট আগাম তথ্য ছিল না, যা দিয়ে বিদে”াহ প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস’া বা কৌশল নেয়া যেত।
(গ) ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে বিডিআর সদস্যদের দাবি-দাওয়া সংবলিত প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান করা লিফলেটটি (সংযোজনী-১৭) এনএসআইয়ের নজরে আসে এবং তািণক তারা মৌখিকভাবে তা আরএসইউ সদস্য মেজর মাহমুদুল হাসানকে অবহিত করে। কিন্তু বিষয়টি এনএসআই সরকারকে জানায়নি। উল্লেখ্য, এ লিফলেটটি ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রচার করা হয় এবং বিডিআর কর্ত”প এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন।
(ঘ) লিফলেটটিতে সেনা কর্মকর্তাদের ‘কুকুরের মতো সরাব’ মর্মে যে হুমকি দেয়া হয়েছে, তা এনএসআই ও বিডিআর কর্ত”প যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
(ঙ) এনএসআই, এসবি ও ডিজএফআইয়ের পিলখানার ভেতরে কোনো গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক না থাকাতে তারা ঘটনার পূর্বে বা চলাকালীন সরকারকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
(চ) কোনো সংস’াই ঝুঁকি নিয়ে হলেও নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিতে পিলখানার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়নি।
উপরে বর্ণিত অবস’াগুলো জাতীয় দুর্যোগকালে গোয়েন্দা সংস’াগুলোর অদতা, অপেশাদারিত্ব ও অমার্জনীয় ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব গোয়েন্দা সংস’া ও তাদের কার্যপদ্ধতি ঢেলে সাজানোর জন্য একটি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স গড়ে তোলাসহ একটি সমন্বিত গোয়েন্দা কার্যক্রম অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে।

৯.২ পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর আগমন ও অভিযান প্রসঙ্গে
সংশ্লিষ্ট পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্ত”পরে সঙ্গে (সংযোজনী-১৮, ১৯, ২০) আলোচনা করে জানা যায় যে, পিলখানায় বিদে”াহের খবর যথাক্রমে সকাল ৯.৫০, ৯.৩০ এবং ৯.৩০ মিনিট নাগাদ টেলিফোনে পৌঁছায়। এদের কারও কাছেই পিলখানা বিদে”াহ সমড়র্কে কোনো আগাম তথ্য ছিল না। এতদসত্ত্বেও দেখা যায়, সকাল ৯.৫০টায় র্যাবের প্রথম দল ও ১১.০০টায় সেনাবাহিনীর প্রথম দলটি বিডিআর পিলখানা এলাকায় পৌঁছে যায়। পুলিশ উপসি’তির সঠিক সময় ও সংখ্যা জানা যায়নি। কিন্তু এদের সবাইকে নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কর্ত”প নিরাপদ দূরত্বে অবস’ান নিতে বলে। পরবর্তী সময় দুপুর ১২টা নাগাদ র্যাবের প্রায় ৩৫০ জন ও ৪৬ ব্রিগেডের প্রায় ৫০০ সুসজ্জিত সদস্য ঘটনাস’লে পৌঁছে যায়। কিন্তু এ সময় সেনাবাহিনীকে বিদে”াহীদের সঙ্গে আলোচনার স্বার্থে পিলখানার গেটগুলোয় অবসি’ত বিডিআর সদস্যদের দ”ষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতে বলা হয়। ব্রিগেড কমান্ডার ট্যাঙ্ক এবং এপিসি ব্যতীত পিলখানার অভ্যন্তরে কোনো অভিযান চালানো সম্ভব নয় বলে মূল্যায়ন করলে তদানুযায়ী ৭টি এপিসি ডিপো থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে দুপুর ১২.৩০টার মধ্যে নিয়ে আসা হলেও অভিযানের জন্য ঘটনাস’লে আনা হয়নি। ঘটনাস’লে উপসি’ত পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায় যে, জিম্মি অফিসার ও তাদের…………>>>>>> দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রিপোর্টটি আর হয়তো জানার সুযোগ হবে না।

যে জন্য ইউটিউভ নিষিদ্ধ হয়েছিল আসুন তা একবার শুনে নেই।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“পিলখানা হত্যাযজ্ঞের রিপোর্ট প্রকাশের জন্য নিষিদ্ধ হলো দৈনিক আমার দেশ” লেখাটিতে 11 টি মন্তব্য

  1. m বলেছেন:

    দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রিপোর্টটি আর হয়তো জানার সুযোগ হবে না।

    [উত্তর দিন]

    মাহদী হাসান উত্তর দিয়েছেন:

    দেখা যাক। অনলাইন সংস্করণতো বন্ধ করেনি এখনও। চোখ খোলা রাখুন। দেখি অনলাইনে প্রচারিত হয় কিনা।

    [উত্তর দিন]

  2. শাহরিয়ার বলেছেন:

    ধন্যবাদ। ভুল সংশোধন করলাম।

    [উত্তর দিন]

  3. nam dia kam ki বলেছেন:

    খুনি মোসতাকের ভাইপো/ ভাগ্নের জন্য কোনো সহানুভুতি নেই

    [উত্তর দিন]

  4. Shopnil বলেছেন:

    নতুন কিছু নাই আপনার লেখা বা দেয় রিপোর্টে। পুরানা প্যাঁচাল।।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    নতুন খুব কমই মেলে পৃথিবীতে।

    [উত্তর দিন]

  5. Shatil বলেছেন:

    by any means,Amar Desh is not a neutral publication. it’s just a symbol of yellow journalism.i have no sympathy for them.

    [উত্তর দিন]

    moor উত্তর দিয়েছেন:

    do u kno wat is yellow journalism shatil??? there wasnt any objection ’bout d authenticity of their news rather objections against mahmudur rahman. wat is d reason behind dis shatil??? ok. lets take it in d way which u like best. amar desh was practicing yellow journalism….but dey got d freedom of speech, freedom to share deir thoughts. y r u unhappy now?? isnt it ur ideology??….freedom….democracy????…..wake uppppppppppp

    [উত্তর দিন]

    RADIN উত্তর দিয়েছেন:

    You are not a fair person. Try to be fair in your comments, otherwise you may face the similar situation.

    [উত্তর দিন]

  6. moor বলেছেন:

    ‘we want justice’- dats d group on facebook. check out d link http://www.facebook.com/home.php?#!/notes.php?id=159240687100
    under d tittle-BDR Carnage (part 1 & 2). u’ll find d complete english version.

    [উত্তর দিন]

  7. RADIN বলেছেন:

    Once people will be proactive to protest the injustice of Awamileague. I think there is lot of fault of BNP to findout the issues of Awamileague and inform the people. The BNP should findout the real and intellectual person in this regard. In fact many diheart BNP activist now inactive due to lot of reason. The real leader should identify them.

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন