দেশনেত্রী! আরেকবার ভাবুন!!

বিশাল জনসমুদ্র। হাজার হাজার, লাখো জনতা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষায়। উন্মাতাল জনসমুদ্র প্রতীক্ষায় সেই কাঙ্খিত ঘোষণার। দেশনেত্রী মঞ্চে উঠে ঘোষণা করবেন সেই বহুপ্রতীক্ষিত রায়। সকাল থেকে জন মানুষের ঢল, হাজারো অলি-গলি রাজপথের জনস্রোত মিশেছে পল্টনের জনসমুদ্র মোহনায়। আজ যে তাদের মহা মুক্তির দিন।

অনেক সয়েছে মানুষ, অত্যাচার নির্যাতন সয়ে সয়ে ধৈর্যের শেষ সীমায় আজ তারা। নির্বাচনপূর্ব জনসভায় অলিক স্বপ্নে বিভোর করে প্রতারিত করেছেন শেখ হাসিনা। দশটাকা সের চাল খাওয়ানোর যে ওয়াদা আওয়ামী লীগ জনসম্মুখে করেছিল, আঁতাতের নির্বাচনে মহাবিজয়ের পরে বেমালুম অস্বীকার করে সেসব কথা। ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার ওয়াদা করেছিল যারা প্রকাশ্য জনসমুদ্রে, নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতেই অস্বীকার করে বসে সেসব কথা। বিনামূল্যে সার দেয়ার কথা বলেছিলেন তিনি, সুজলা সুফলা বাংলাদেশের নরম কাদামাটির মতো কোমল কৃষক হৃদয়ে আচড় কেটেছিল সেসব প্রতিশ্রুতি, কিন্তু কথা রাখেননি শেখ হাসিনা। বিনামূল্যে সার নয় বরং সার কারখানাই বন্ধ করে দিচ্ছেন আজ বিদ্যুত উৎপাদনের অযুহাতে।

কথা ছিল স্নাতক পযর্ন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করে দেবে আওয়ামী সরকার। অথচ আজ শিক্ষার পরিবেশ চরম হুমকীর মুখে। শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবকদের উপর চাপাতিলীগের নিরবিচ্ছিন্ন নির্যাতন, গণ ধর্ষণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেই পঙ্গু করে দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস, মোনাফেকীর ইতিহাস। শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীপরিষদ মিথ্যে বলাটাকে শিল্পে পরিণত করেছে, মিথ্যে কথা কতটা সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা যায়, কি করে সত্যের চেয়েও বেশী বিশ্বাসযোগ্য করে মিথ্যে উপস্থাপন করা যায় তা আওয়ামী নেতাদের চেয়ে বেশী আর কে জানে? শেখ হাসিনা নির্বাচনের পূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন ক্ষমতায় গেলে বয়স্কদের যাতায়াত ফ্রি করে দেবেন, অথচ আজ বুড়োবুড়ীরাও নির্যাতন থেকে নিস্তার পায় না।

নির্যাতন থেকে নিস্তার মেলে না হিন্দু সম্প্রদায়েরও। যে ভোটপুঁজি করে আওয়ামী লীগ বার বার ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখে, যে হিন্দুদেরকে তাদের রিজার্ভ ভোট মনে করে, সেই হিন্দুদের ভিটে-বাড়ী, দোকানপাট, গরু ছাগল, মঠ-মন্দির দখলে নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। সংখ্যালঘুদের সম্পত্তিকে আওয়ামী লীগ পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করে। আওয়ামী লীগের অত্যাচারে যদি হিন্দুরা দেশ ছেড়ে পালায় তবে পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেব জমাজমি জবর দখল করে, আর শত নির্যাতন সয়েও যদি দেশে থেকে যায় তবুও নৌকার বাক্সে রিজার্ভ ভোট পড়বে, সবদিকেই আওয়ামী লীগের জয়।

এসব থেকে মুক্তির জন্যই মহাসমাবেশ। অবশেষে দেশনেত্রী মঞ্চে উপবেশন করলেন, দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আবেগময়ী দীর্ঘ ভাষণ দিলেন। দেশনেত্রী এক একটি শব্দ চয়নে, উৎসুক জন সমুদ্রে সাইক্লোন ওঠে। সবাই চায় মুক্তি, আওয়ামী অপশাসন থেকে চীরতরে মুক্তি। আর সে মুক্তির পথ, আত্মহনের পথ। হরতালের পথ। নশ্বর জীনবটাকে গলা টিপে হত্যা করে অনেকে যেমন পৃথিবীর যাবতীয় অন্যায় অত্যাচার, জুলুম শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্তি খোঁজে, বাংলাদেশের অগ্রগতির চাকাটাকে হরতাল দিয়ে স্তব্ধ করে দিয়েও তেমনি আওয়ামী অপশাসনের অবসান চায় মানুষ। তাই জনসমুদ্র হরতাল হরতাল শব্দে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত প্রকম্পিত করে। হরতাল হরতাল কলধ্বণি দেশনেত্রীর হৃদয়ে শিহরণ জাগে, সকল দ্বিধা, সংশয় সন্দেহ ছুড়ে ফেলে বলিষ্ট কন্ঠে তিনি ঘোষণা করেন “হরতাল”। জনসমুদ্রের হরতাল গর্জন পল্টন ময়দান ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের কোনে কোনে। সবার মুখে একই শব্দ, হরতাল, হরতাল, হরতাল।

যেন হরতালেই সব সমস্যার সমাধান, যেন হরতাল হলেই সুবোধ বালকের মতো আগামীকালই ক্ষমতা ছেড়ে দেবে আওয়ামী লীগ, যেন হরতাল হলেই দেশের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, ঘরে ঘরে বেকার যুবকেরা চাকুরী পাবে, অভাবীরা অন্ন পানে, গৃহহারা মানুষ পাবে মাথা গোজার ঠাই। হরতাল হলেই যেন বিজলির চমকে আলোকিত হবে গোটা বাংলাদেশ, হরতাল সফল হলেই উদ্বৃত্ত বিদ্যুত রপ্তানী করে বাংলাদেশ গিনেজ বুকে ঠাই করে নেবে। হরতাল সফল হলেই দেশে থাকবেনা আর আওয়ামী সন্ত্রাস, চাপাতী লীগের গুপ্ত হত্যা, গণধর্ষণ, দেশ ও ইসলাম নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র।

অথচ হরতাল ঘোষণার পূর্বে একবারও কি অতীতের কথা মনে পড়লো না দেশনেত্রীর? অতীতের প্রতিটি হরতালে কি দূর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে? তার চোখে কি একবারও ভেসে ওঠেনি গানপাউড়ারে ঝলসে যাওয়া বিআরটিসি বাসের ছবি? ২০০৪ সালের ৪ জুন হরতালের কয়েক ঘন্টা আগে আওয়ামী যুবলীগ সভাপতি ও বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে সেদিন ঢাকা শেরাটন হোটেলের সামনে যাত্রীবোঝাই বিআরটিসি বাস গান পাউডারে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সেদিন আওয়ামী পশুদের বিষ নিঃশ্বাসে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়েছিল দু’বছরের শিশুসহ এগারজন। দেশনেত্রী, সে আগুনের মাঝে আপনার ছোট নাতনীর প্রতিচ্ছবি একবারও কি দেখতে পান না, যদি না পান তবে আপনি কেমন দেশনেত্রী?

আওয়ামী যুবলীগের পাশবিকতার কাছে সেদিন হার মেনেছিল সকল বর্বরতা, এবার হরতালে জাতীয়তাবাদী যুবদল যে তেমন হিংসাত্মক কর্মসূচী গ্রহণ করবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? আবার যে অশান্ত হয়ে উঠবেনা গার্মেন্ট শিল্প তার নিশ্চয়তা কোথায়? যেসব শ্রমিকের ঘামের ভেসে আছে বাংলাদেশ, তাদের কর্মস্খলকে অস্খিতিশীল করে আদৌ কি দেশের কল্যাণ সম্ভব? বিদ্যুত, পানি, গ্যাস, সন্ত্রাস, হত্যা, গুপ্তহত্যা, গণধর্ষণ ইত্যাদি অনিয়মের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে বাংলাদেশ। কিন্তু এসব বিক্ষুব্ধ মানুষের ক্রোধকে পুঁজি করে বাংলাদেশের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করার অধিকার কারো থাকতে পারে না, আপনারও নেই মাননীয় দেশনেত্রী।

দয়া করে আরেকবার ভেবে দেখুন। বাংলাদেশের মানুষের পালানোর পথ নেই, যেমন টা পালিয়ে বেড়াতে পারে আপনার সন্তান তারেক-কোকো। শত নির্যাতন সয়েও আমরা ঠিকই পড়ে থাকবো বাংলা মায়ের কোলে। আমরা আওয়ামী অপশাসন থেকে মুক্তি চাই, কিন্তু সে মুক্তি কিছুতেই আর কোন নীরিহ বাংলাদেশীর রক্তের বিনিময়ে নয়। আমরা শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ চাই, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচীর মাধ্যমে অন্যায়ের অবসান চাই।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“দেশনেত্রী! আরেকবার ভাবুন!!” লেখাটিতে 7 টি মন্তব্য

  1. পাশা বলেছেন:

    আমরা হরতাল চাই না।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

  2. শামসুন নাহার বলেছেন:

    শান্তি চাই

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    সরকার বিদ্যুত, পানি, গ্যাস, সন্ত্রাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেবে আর বিরোধী দল তা থেকে মুক্তির নামে রাজপথে লান্ছিত করবে তা কাম্য হতে পারে না।
    শান্তি চাই।

    [উত্তর দিন]

  3. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    আমাদের দেশে হরতাল একটি কঠোর আন্দোলনের প্রতীক। যখনই বিরোধী দল সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছে তখনই হরতাল দিয়ে কঠোর আন্দোলনে গিয়েছে। সরকার হরতালের বিপরীতে তার প্রসাশন দিয়ে বিরোধী দলের উপর নির্যাতন করেছে। এটাই আমাদের দেশে চলে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে।

    সেই গন্ডির বাইরে এবারও আমরা যেতে পারলাম না।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    সবাই বলে বিকল্প কি এমন আছে যা দিয়ে প্রতিবাদ করা যায়। প্রতিবাদের ভাষা যে সবসময় নেগেটিভই হতে হবে তা তো নয়, আরে ভাই আর কিছু না পার মরহুম জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচীটাই না হলে পালন কর, দেশের নদী খাল গুলা মরে যাচ্ছে, বিএনপির তাগড়া জোয়ান কর্মীদের দিয়ে দলীয় ভাবেই না হয় ওগুলা কাটাও, দেখি জনগন তোমাগো ভালো কয় কি না।

    [উত্তর দিন]

  4. অনিবার্য সংঘাতের দিকে ধেয়ে চলেছে দেশ | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] দেশব্যাপী হরতাল আহ্বানে ক্ষুদ্ধ হয়ে “দেশনেত্রী! আরেকবার ভাবুন” শিরোনামে  ব্লগ লিখেছিলাম। আমার […]

মন্তব্য করুন