জীবনের মূল্য কত?

ঝড় এলো, এলো ঝড়
আম পর আম পর
কাঁচা আম পাঁকা আম
টক টক মিষ্টি
এই যাহ!
এলো বুঝি বৃষ্টিইইই!

দূর্ভাগ্য, গাছে এখনো আম ধরে নি, তাই আম পরে না, ঘাড়ে পরে বিলবোর্ড।

চৈত্র বৈশাখ মাসে ঝড় হবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখে কাল বৈশাখী ঝড়ে বর্ষবরণ রীতিমত প্রাকৃতিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আর ঝড় মানেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি। প্রতি বছরই প্রকৃতির খেয়ালে অনেক পরিবারকে সর্বশান্ত হতে হয়, প্রিয়জনকে হারিয়ে বিলাপ করতে হয়।

হ্যা, প্রকৃতির উপর আমাদের কারো কোন হাত নেই। তবে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে কিভাবে প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষয় ক্ষতিকে কমিয়ে আনা যায় তার জন্য বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও কর্মসূচীর অভাব নেই। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে তাই দিন দিন প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।

ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দূর্যোগে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশী হয় মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে। গতকাল রাজধানীতে কালবৈশাখী ঝড়ের দিনে এমনই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে দু’দুটো প্রাণপ্রদীপ নিভে গেল। ঝড়ে আম পড়ে, শিলা বৃষ্টি ঝড়ে, তবে বাংলাদেশে আমের মতো টুপটুপ করে বিলবোর্ডও পরে, পরে বাস গাড়ির ওপর, পরে মানুষের ঘাড়ে। বাংলাদেশে সব কিছুর দাম আছে, গোবরও কেজি দরে বিক্রি হয়, শুধু দাম নেই মানুষের জীবনের। রাস্তাজুড়ে জৈব সারের বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড ভেঙ্গে মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও কারো কিছু যায় আসে না, জীবনের নিরাপত্তা দেয়ার মতো ঠেকায় পড়েনি দেশের কেউ।

শুনেছি বিজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য আইন আছে, যদিও আইন প্রয়োগে বাংলাদেশের প্রশাসনের কখনোই আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় নি, যতটা দেখা যায় আইন কানুনের ফাঁক ফোকর দিয়ে ঘুষ লেনদেনে। বিজ্ঞাপনের আগ্রাসনে টেলিভিশনের দিকে তাকানো দায়, শ্লীল-অশ্লীলের বাছ বিচার নেই। আগে অশ্লীল দৃশ্যকে শ্লীল হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস ছিল, ইদানিং শ্লীল দৃশ্যকেও অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করা হয় বিজ্ঞাপনে।  শ্লীল-অশ্লীল ভিন্ন বিষয়, সে বিষয়ে এ মূহুর্তে কথা না-ই বা বললাম। তবে বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে প্রাণহানি হবে তা দেখেও চোখ বুজে থাকার কোন যুক্তি খুঁজে পাই না।

উন্নত বিশ্বে বিজ্ঞাপন প্রচারে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি আছে, আছে তার কঠোর প্রয়োগও। ইচ্ছে হলেই যেখানে সেখানে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড দাড়া করানো যায় না, যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগের অভ্যাস মানুষের থাকতে পারে না, ওটা জানোয়ারের অভ্যাস। বাংলাদেশেও রাস্তাঘাটে বিজ্ঞাপন প্রকাশে পূর্বানুমতি নিতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে, হয়তো অনেকে অনুমতি নিয়েও থাকে। কিন্তু রাস্তার মোড়ে মোড়ে এলসিডি মনিটরে বিজ্ঞাপন প্রকাশের অনুমোদন দেয়ার অধিকার সিটি কর্পোরেশনগুলোর আছে কি না, বা থাকা যুক্তিযুক্ত কি না তা খতিয়ে দেয়া উচিত। এছাড়া বিদ্যুতের চরম আকালের দিনেও বিলবোর্ডগুলো যেভাবে বিদ্যুতের অপচয় করে তাও যুক্তিযুক্ত কিনা তা ভেবে দেখা উচিত।

বিশ্বের অন্যতম নোংরা শহর হিসেবে ঢাকার দূর্ণাম আছে, তাই পরিস্কার পরিচ্ছনতার দোহাই দিতে চাই না, যদিও এ খাতে আমাদের কর দিতে হয়। আমরা মানুষের নূন্যতম অধিকার, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার চাই। আমরা ঝড়-তুফানে মরতে রাজি, কিন্তু বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে পরপারে যেতে চাই না। আমরা চাই কাল বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়াতে, বিলবোর্ডের নীচে চাপা পরতে চাই না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন