রাশিয়ায় জিম্মি সংকটঃ শেষ কোথায়?

আরো একটি জিম্মি নাটকের রক্তাক্ত অবসান হলো, রচিত হলো বর্বতার নয়া ইতিহাস। বাবার হাত ধরে যে শিশু এসেছিল দ্বিগ্বিজয়ীর বেশে নতুন ক্লাশে, ফিরল সে মায়ের কোলে লাশ হয়ে। কি নির্মম, কি পাশবিক এ গণহত্যা। এ রিপোর্ট যখন লেখা হচ্ছে তখন উত্তর রাশিয়ার ওসেটিয়া প্রদেশের বেসলান শহরের ঘরে ঘরে মায়েদের বুকফাঁটা আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস সীসার মতো ভারি হয়ে গেছে । সতেজ কচি আধো ফোটা কলিগুলো পিশাচের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে অকালে ঝড়ে পড়ার বেদনায় নীল হয়ে আছে সারাবিশ্বের ছয়শো কোটি প্রাণ, লাখো মানুষের শোক মিছিলে উত্তাল মস্কোর রাজপথ।

চেচনিয়ার স্বাধীনতা, রুশ সৈন্য প্রত্যাহার ও সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত চেচেন নেতার মুক্তির দাবীতে জিম্মি করা হয় দেড় সহস্রাধিক ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক ও স্কুল শিক্ষককে, যারা এসেছিল নতুন সেশনের নতুন ক্লাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। প্রায় ৪০ জন মুখোশধারী ৫২ ঘন্টা ধরে জিম্মি করে রাখে এ সকল নিরপরাধ লোককে, যাদের কোনরূপ খাবার পর্যন্তও সরবরাহ করা হয়নি। অবশেষে রাশান কমান্ডোদের অতর্কিত হামলায় রক্তাক্ত অবসান হয় এ নাটকের যাতে প্রাণ হারায় ৩৩৫ জন বেসামরিক নাগরিক, যাদের অধিকাংশই শিশু, প্রাণ হারায় অর্ধেকেরও বেশী জিম্মিকারী।

একের পর এক জিম্মি সংকটের চোরাবালিতে আটকে গেছে ক্রেমলিন প্রশাসন। ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন ভ্লাদিমির পুটিন। রাশিয়ার প্রাদেশিক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কাজবেক জান্তিয়েভ জিম্মি সংকটের শানি-পূর্ণ সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় পদত্যাগ করেন। তার ভাষায়, “বেসলানে যা ঘটেছে তাতে একজন অফিসার ও ভদ্রলোক হিসেবে পদ আকড়ে থাকার  কোন অধিকারই আমার নেই”। রুশ প্রশাসনের চরম দায়িত্বহীন কর্মকান্ডে সকলের স্তম্ভিত হয়ে পড়ে, এমনকি ইউরোপিয় ইউনিয়নের ডাস প্রেসিডেন্সী এ ঘটনার ব্যাখা দাবী করে।

পুটিন প্রশাসন জিম্মি সংকটের প্রথমেই মিথ্যে প্রপাগান্ডার আশ্রয় নেয়, জিম্মিদের সংখ্যা ৩৫০ বলে দাবী করে অথচ জিম্মি সংকটের অবসানের পর লাশই পাওয়া গেল সম সংখ্যক । সাম্প্রতিক কালে এটি হচ্ছে দ্বিতীয় ঘটনা যাতে অসংখ্য নিরপরাধ নাগরিককে প্রাণ হারাতে হলো। ইতোপূর্বে ২০০২ সালের অক্টোবরে মস্কো থিয়েটারে অন্য এক জিম্মি ঘটনায় প্রাণ হারায় ১২৯ জন নাগরিক। প্রতিটি জিম্মি সংকট নিরসনে পুটিন প্রশাসন গ্রহণ করেছেন কঠোর অবস্থান। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় ভ্লাদিমির পুটিনের কাছে সাধারণ নাগরিকদের জীবনের চেয়ে চেচেন বিষয়ে তার নীতিতে অটল থাকাটা অনেক বেশী জরুরী, অনেক বেশী সম্মানের। মস্কো থিয়েটারের জিম্মি সংকটের তিনি সমাপ্তি টেনেছিলেন বিষাক্ত নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করে যাতে নিরীহ ১২৯ জন  নাগরিক প্রাণ হারায়। ঠিক তেমনি বর্তমান সংকট মোকাবেলায়ও তিনি আলোচনার চেয়ে বল প্রয়োগেই বেশী তৎপর ছিলেন। স্কুলের চারপাশে দূর্ভেদ্য সেনা বেস্টনী, চারটি হেলিকপ্টারের সার্বক্ষনিক টহল এবং তিনটি ট্যাংকের কামান স্কুলের দিকে তাক করে রাখা হয়েছিল কোন ধরনের আলোচনার জন্য? স্কুলটিকে জিম্মিসহ ধুলায় মিশিয়ে দেয়ার জন্য নয় কি? অথচ খোদ চেচেন স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখপাত্র আহমদ জাকায়েভ জিম্মিকারীদের সাথে আলোচনায় মধ্যস্থতা করার জন্য প্রস্তত ছিলেন।

ভ্লাদিমির পুটিন ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে ব্যর্থ হয়েছেন। ১০ দিনের ব্যবধানে দু’টি বিমান বিধ্বস্ত হওয়া, একটি সাবওয়ে স্টেশনের কাছে আত্মঘাতী হামলা এবং বেসলান জিম্মি সংকট পুটিন প্রশাসনের বর্তমান নীতির সুস্পষ্ট ব্যর্থতা চোখে আঙ্গুল দিয়েই দেখিয়ে দিয়েছে। অথচ আয়রনী এই যে, পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্ধ পুটিন বেসলান ঘটনার আগের দিন সিএনএন টার্কিতে এক সাক্ষাৎকারে দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রাধীন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। পাশাপাশি চেচেন সমস্যার সাথে আল-কায়েদা লিংক আবিস্কার করে পুটিন তার পলিসিকে সঠিক বলে প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

বেসলান সংকট সমাধানের মাধ্যমে পুটিন প্রশাসন হয়তো কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। বর্তমান সংকটই শেষ নয় বরং ধারাবাহিক নাটকের একটি পর্ব মাত্র যা চলছে বহু বছর ধরে। এখন দেখার বিষয় যে এ নাটকটি ধারাবাহিক নাকি মেগা সিরিয়াল। জবাব সময়ই দেবে।

বিশ্বের দৃষ্টি চেচেন স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে নিবদ্ধ করার জন্য চেচেন যোদ্ধারা অনেকগুলো জিম্মি ঘটনার জন্ম দিয়েছে। বড় ধরণের এ রকম প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে দক্ষিণ রাশিয়ার বুদিওনভস্ক শহরে। একটি হাসপাতাল ঘেরাওয়ের মাধ্যমে কয়েকশো বেসামরিক নাগরিককে সেখানে জিম্মি করা হয়। কয়েকদিন পর স্বাধীনতাকামীরা নিরাপদে ফিরে যাওয়ার ও শান্তি আলোচনা শুরুর প্রতিশ্রুতি পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় রাশান কমান্ডোদের আক্রমনে শিকার হলে একশ জিম্মি নিহত হয়।

দাগেস্তানে ১৯৯৬ সালের জানুয়ারীতে চেচেন নেতা সালমান রাদুয়েভের নেতৃত্বে আড়াইশ কমান্ডো আর একটি হাসপাতালে জিম্মি করে ৩ হাজার জনকে। অধিকাংশ জিম্মিকে মুক্তিদানের বিনিময়ে চেচনিয়া থেকে রুশ সৈন্য প্রত্যাহারের শর্তে বাদবাকী জিম্মিদের নিয়ে চেচেন সীমান্ত অতিক্রমের সময় আবার রাশান কমান্ডোদের আক্রমনের শিকার হয়, ফলে বেঘোরে প্রাণ হারায় বহু জিম্মি। এর প্রতিবাদে কৃষ্ণ সাগরে ২৫৫ জন যাত্রীবোঝাই একটি ফেরী জিম্মি করে চেচেন সৈনিকরা যদিও চারঘন্টা পর সবাই আত্মসমর্পন করে।

১৯৯৬ সালে ব্রিটিশ সাহায্যকর্মী জন জেমস এবং ক্যামিলা কার জিম্মিদশা থেকে দীর্ঘ ১ বছর পর মুক্তি পান, আর চারজনকে ফিরতে হয় লাশ হয়ে। আমেরিকান মিশনারী হারবার্ট গ্রেগ সাতমাস পর মুক্তি পান ৯৬এর জুলাই মাসে। সিকিউরিটি ফার্ম ক্রোল এসোসিয়েটস ইউকে-র তথ্যানুযায়ী ১৯৯৬ সালে চেচনিয়ায় বিদেশী জিম্মির সংখ্যা ছিল ১০০-এর মতো।

২০০১ এর মার্চে ইস্তাম্বুল থেকে মস্কোগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই  করে মক্কায় অবতরণে বাধ্য করে এবং পরে সৌদি নিরাপত্তা রক্ষীদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয় ৩ জন এবং ধরা পরে ৫ ছিনতাইকারী। এরই প্রতিবাদে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১২০ জন পর্যটককে  ইস্তাম্বুলের একটি বিলাসবহুল হোটেলে জিম্মি করে ৫ ছিনতাইকারীর মুক্তির দাবী করে।

২০০২ সালের মে মাসে মাত্র ১ জন অস্ত্রধারী আর একটি হোটেলে ১০ জনকে জিম্মি করে যদিও পরে সবাই অক্ষত অবস্থায় মুক্তি লাভ করে।

কিন্তু যে ঘটনা পুরো ক্রেমলিন প্রশাসনকে কাঁপিয়ে দেয় তা হলো মস্কো থিয়েটারে জিম্মি নাটক। এতে নার্ভ গ্যাস প্রয়োগে ৪১ জন জিম্মিকারী ও ১২৯ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে রাশান কমান্ডোরা।

সার্বিক দিক বিবেচনা করলে এটা প্রতিয়মান হয় যে, যত দিন না চেননিয়া তার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে পারছে ততদিন জিম্মি সংকটের কোন সমাধান হবে না বরং এ সংকট আরো জটিল আকার ধারণ করবে। কেননা ইতোমধ্যে প্রমানিত হয়েছে চেচেন যুদ্ধ এখন আর শুধু চেচনিয়ায়ই সীমাবদ্ধ নেই, বাইরের বিশ্বের লোকজনও এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে চেচেন জিম্মিকারীদের হয়তো রাশিয়ার পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

এ রক্তাক্ত সমস্যাগুলোর একটাই সমাধান, আর তা হলো আলোচনার মাধ্যমে চেচনিয়ার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া। সাম্রাজ্যবাদের যুগ শেষ হয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তাদের কলোনীগুলোর স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছে। রাশিয়াও অনেকগুলো রাজ্যকে স্বাধীন করে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে চেচনিয়ার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার। বেসলানের সাস্প্রতিক জিম্মি সংকটের কারণে অনেকেই হয়তো সহজে ভুলে যাবেন যে এসকল রক্তাক্ত ঘটনার পিছনে রয়েছে শতাব্দীর পুরনো দ্বন্দের ইতিহাস। কিন্তু চেচনিয়া ভুলে যাবেনা তাদের অতীত ইতিহাস। ইউরোপ ও এশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত ইসলামিক সালতানাত চেচনিয়া সীমানা টেনে দিয়েছে মুসলিম ও খৃষ্ট সাম্রাজ্যের মাঝে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে চেচনিয়া যুদ্ধ করছে রাশিয়ান উপনিবেশবাদীদের সাথে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে চেচনিয়া তার স্বাধীনত হারানোর পর কম মূল্য দিতে হয়নি তাদের। ১৯৪৪ সালে অর্ধেক চেচেনকে নাজীদের সহযোগী সাব্যস্ত করে পাঠানো হয় সাইবেরিয়ায় যাতে দেড় লক্ষ চেচেন নিহত হয়। তাই যুগে যুতে নির্যাতিত চেচেনদের পরাধীন রেখে একদন্ডও স্থির হতে পারেনি সাবেক জার ও সমাজতান্ত্রিক প্রশাসন, পারছেনা বর্তমান পুটিন প্রাশাসন।

উপন্যাসিক মিখাইল লারমেনেটভ যথার্থই বলেছেন, “চেচেনরা স্বাধীনতাকে দেবতা জ্ঞান করেন”। চেচনিয়ার স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া চেচেনরা কিছুতেই ক্ষ্যান্ত হবে না। তাই এখনই সময় আলোচনার, এখনই সময় সুসময় আনয়নের। ক্রেমলিন প্রশাসনকে নতুন করে ভাবতে হবে চেচেন বিষয়ে তার পলিসি, হতে হবে আরো নমনীয়। আর চেচনিয়াকেও তাদের জিম্মি আটকের পলিসি পরিবর্তন করতে হবে। কারণ তাদের স্বাধীনতার নায্য দাবীর প্রতি সারাবিশ্বেরই সহানুভূতি রয়েছে। এ সহানুভূতি নিরপরাধ শিশু-কিশোরদের জিম্মি করে কোনক্রমেই ধ্বংস করা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন