এলোমেলো ভাবনা

আমাদের এলাকাটা হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় অনেকগুলো পুজো মন্ডপে ধুমধামের সাথে পুজো হতো। দলবেধে আমরাও আরতী অনুষ্ঠান দেখতে যেতাম। মানুষের আকৃতির বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি দেখে বিস্মিত হতাম। বিশেষ করে দূর্গা পুজোর আগ থেকেই আমরা বেশ আগ্রহ নিয়ে পুজো মন্ডপ ঘুরে ঘুরে দেখতাম। কি করে খড় দিয়ে দেবদেবীর দেহ কাঠামো তৈরী করা হয়, কি করে কাদা মাটি দিয়ে উন্নতবক্ষা দূর্গা ও তার মেয়েদের সৌন্দর্য ফুঁটিয়ে তোলা হয়, কি করে দামী দামী শাড়ি পেঁচিয়ে প্রেম জাগানিয়া অপরূপ সাজে দেবীদের উপস্থাপন করা হয়। সে অনেক আগের কথা, ক্লাস ওয়ান টুর সময়ের কথা।

 স্কুল জীবনে আরেকটু উপরের ক্লাসে সহপাঠী অমুসলিম বন্ধুদের সাথে প্রায়শই ধর্ম নিয়ে আলোচনা হতো। পাড়া পড়শী অমুসলিম কাকা-কামীদের সাথেও আলোচনা হতো। তারা কেন নিজেদের হাতে তৈরী করা মাটির মূর্তিকে পুঁজো করে, সেজদা করে তা বিস্ময়ভরা কন্ঠে তাদের কাছে জানতে চাইতাম। কাকীমা বেশ বুদ্ধিমতি, এলাকার পুজোপার্বনে কীর্ত্তন গাওয়াসহ যাবতীয় কাজে তার কর্তৃত্ব। তো, তিনি জানালেন, তারা আসলে মাটির মূর্তিকে পুঁজা করেন না, মূলত ইশ্বরকেই পূঁজা করেন। যেহেতু ইশ্বরকে দেখা যায় না তাই না দেখে পুঁজা করলে ততটা ভক্তি আসে না। ।ইশ্বরকে পূর্ণ ভক্তিসহকারে পুঁজো দেয়ার জন্য তাদের সামনে ইশ্বরের একটা প্রতিকৃতি থাকলে সুবিধে হয় আর সেজন্যই তারা ইশ্বরের মূর্তি বানিয় পুঁজো করেন।

কিন্তু আমরা যারা মুসলমান আমাদের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, দর্শন কর্মকৌশল সবই বিধর্মীদের চেয়ে ভিন্ন। আমাদের আল্লাহর এবাদত করতে কোন প্রতিকৃতির প্রয়োজন হয় না। আমাদের আল্লাহ একাই সর্বশক্তিমান, বিশ্বজগতের কোন কিছুর কাছেই তিনি মুখাপেক্ষী নন, বরং সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী। তাই তার কাছে দোয়া করতেও আমাদের কোন মাধ্যম দরকার হয় না, কোন ছোট দেবতার স্মরণাপন্ন হতে হয় না যেমনটা লাগে অন্য ধর্মে।

তবে আস্তে আস্তে সে ধ্যান ধারণা থেকে মুসলমানরাও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। একেশ্বরবাদে তাদের অনেকের বিশ্বাসে ঘুন ধরেছে। যদিও তারা একাধিক দেবদেবীতে বিশ্বাসী নয়, তবুও কিছু একটা অপূর্ণতা তাদের মনে অস্বস্তির সৃষ্টি করে। তাই তারা আল্লাহর সাথে যোগাযোগের জন্য মাধ্যম খোঁজে। অনেকদিন থেকেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা কিংবা রহমত, মাগফেরাত নাজাতের জন্য বিভিন্ন পীর ফকিরের কাছে ধর্ণা দেয়ার রেওয়াজ চালু হয়েছে। কোন কোন স্থানে অবস্থা এতোটাই সীমা ছাড়িয়েছে যে এখন কেউ কেউ আল্লাহর পরিবর্তে পীর দরবেশদেরকেই সেজদা করছেন।

**********

ইদানিং মসজিদগুলোতে আধুনিক এক বেদয়াত চালু হয়েছে। এখন আর পাঁচ সহস্রাধিক কিলোমিটার উড়াল দূরত্বের পবিত্র কাবা শরীফ না দেখে নামাজ পড়ে তৃপ্তি আসেনা মসজিদের মুসল্লিদের। অতীতে যেমন কাবার ছবি শোভা পেত তাদের যায়নামাজে, তেমনি ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে তারা এখন মসজিদের মেহরাবে খোদাই করে নিচ্ছে পবিত্র কাবার ছবি। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অধিকাংশ মসজিদের মেহরাবেই এখন কাবা শরীফের ছবিযুক্ত টাইলস লাগানো। তাই এখন আর কেবলামুখী হওয়া কেবল কথার কথা নয়, দেখে শুনেই মুসুল্লীরা কেবলামুখী হয়ে নামাজ আদায় করে বেশ প্রশান্তি অনুভব করছে। তবে আমার মতো সন্দেহবাতিক মুসল্লিদের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, কাবা শরীফের ছবি যদি মসজিদের পূর্ব দেয়ালে সেটে দেয়া হয় কিংবা উত্তর দেয়ালে কিংবা দক্ষিণে, তবে সে দিক ফিরে “কেবলামুখী হয়ে এই ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করছি” বলে মন্ত্র উচ্চারণ করলে সে নামাজ শুদ্ধ হবে কি?

মসজিদে মসজিদে আরো কিছু ডিজিটাল বেদয়াত চালু হয়েছে। এখন আর দাড়িয়ে দাড়িয়ে অসভ্যদের (?) মতো সালাত আদায় করে শান্তি পান না ভদ্দরনোকেরা। এখন তাদের প্রয়োজন খ্রীষ্টানদের গীর্জার চেয়েও উন্নত গদীআটা আরাম কেদারা। কিছুদিন আগে একটা মসজিদে নামাজ পড়ার সময় মাত্র ২৬ জন মুসল্লীর মাঝে ৪জন চেয়ারম্যান মুসল্লী পেলাম যারা চেয়ার ছাড়া নামাজ আদায়ে অপারগ। এদের নামাজের স্থান নির্ধারিত। মনে বড় প্রশ্ন জাগে, যৌবনে শক্তি সামর্থ্য থাকার পরেও আল্লাহর এবাদত না করার কারনেই কি এদের রুকু সেজদা করার ক্ষমতা রোহিত হয়েছে না কি প্রবল অহংবোধ তাদেরকে রুকু সেজদাহ থেকে বিরত রাখতে? অসুস্থ্যতার সমাধান যদি চেয়ারই হবে তবে রাসূল (সাঃ) কেন অসুস্থ্য অবস্থায় তেমন কিছু করলেন না, কেন পরবর্তী কালের প্রচন্ড প্রতাপশালী রাজা বাদশারা সিংহাসন পেতে নামাজ পড়তেন না, কেন তারা নামাজের সময় সিংহাসন ছেড়ে ঘর্মাক্ত  সাধারণ কুলি মজুরের পাশে এক কাতারে দাড়াতেন?

আমার মা বেশ কিছুদিন হাটুর ব্যাথায় অসুস্থ ছিলেন। ডাক্তার তাকে বসে বসে নামাজ আদায় করার উপদেশ দিলেন। আমার মা দু’তিন দিন ডাক্তারের কথামতো সালাত আদায় করলেন কিন্তু তৃপ্তি পেলেন না। অবশেষে যা হয় হবে, তবু বসে বসে নামাজ পড়বো না, অনেকটা জেদ করেই দাড়িয়ে নামাজ আদায় করলেন। আল্লাহর রহমতে তিনি এখন সুস্থ্য, এ বৃদ্ধাবয়সেও তিনি দাড়িয়ে দাড়িয়ে সালাত আদায় করতে পারেন।

ঈদের দিন জোহরের নামাজ পড়ার জন্য পাড়ার মসজিদে গেলাম। বারান্দায় এক যুবকের নামাজ পড়া দেখে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম। কোন এক দূরারোগ্য রোগে যুবকের পা সোজা হয়ে আছে, ভাজ করে আমাদের মতো চলাফেরা করতে অক্ষম। তবুও যুবক দাড়িয়ে দাড়িয়ে সালাত আদায় করছে। এক পা একদিকে ছড়িয়ে রুকু করছে, হাটু ভাজ না করেই সোজা উপুর হয়ে সিজদায় যাচ্ছে, আবার পা সোজা একদিকে ছড়িয়ে দিয়ে বৈঠক করছে, বৈঠক শেষে আবার দুই হাতে প্রচন্ড চাপ দিয়ে এক ঝটকায় দাড়িয়ে যাচ্ছে।

আমার ইচ্ছে হয় মসজিদের সকল চেয়ারম্যানদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে এই যুবকের নামাজ আদায়ের ঐকান্তিকতা দেখাই। তাদের কাছেই দাবী আমার, তোমরা তোমাদের সিংহাসনে বসে সালাত আদায় করেও যদি জান্নাতের স্বপ্ন দেখে খাকো, তবে খোদা কাছে এই পঙ্গু যুবকের কত হাজার জান্নাত পাওনা হয়েছে একবার হিসেব দিয়ে যাও।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন