মৃত্যু ভয়ে আত্মহত্যা!

বিকাল ৩টার একটা শিক্ষা বৈঠকে যোগদানের জন্য বাসা থেকে বের হয়েছি। কোন বৈঠকে যাওয়ার আগে মুহুর্তের জন্য দ্বিধা জাগে, বিপদ হবে না তো? পুলিশী হয়রানীর শিকার হবো না তো? অবশ্য তা নিতান্তই ক্ষণিকের চিন্তা মাত্র, মাথা থেকে এমন ফালতু চিন্তা ঝেটিয়ে বিদেয় করতে মোটেই বেগ পেতে হয় না বরং এর পরে প্রতিটি পদক্ষেপ পূর্ববর্তী পদক্ষেপের তুলনায় ক্রমাগত দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে।

বাসার গলি থেকে প্রধান সড়কে উঠতেই এক হাত পাশেই আস্ত একটা ইট পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আমার টার্গেটও ছিল ঠিক ঐ যায়গায় উঠে রাস্তার পাশের ভবনগুলোর ঝুল বারান্দার ছায়ায় ছায়ায় পথ চলা। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি চমকে উঠি। একটু নিরাপদ দূরত্বে সড়ে এসে উপড়ের দিকে তাকাতেই আসল রহস্য উন্মোচিত হয়। আড়াই/তিন বছরের একটা শিশু চারতলার ব্যালকনিতে দাড়িয়ে আস্ত ইট একে একে ৪টি রাস্তায় ছুড়ে ফেলল। অবুঝ শিশু কি করে বুঝবে ওর নিতান্ত আনন্দের এ খেলা পথচারীদের জীবনের সকল জীবনখেলার অবসান ঘটাতে পারে।

নিজের অজান্তেই হেসে উঠলাম। আমি র‍্যাব-পুলিশের গ্রেফতারে, তাদের নির্যাতনে আহত কিংবা নিহত হওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখি, অথচ মৃত্যু প্রতিনিয়ত আমাদের কত কাছ থেকে ঘুরে যায়। আজ যদি আমি ইটের আঘাতে অপঘাতে মৃত্যুবরণ করি, তাহলে তা আমার জন্য কতটুকুই বা কল্যাণকর হবে? হয়তো ইটের আঘাতে প্রাণবায়ু বের হয়ে যাওয়ার আগে কালেমা শাহাদাতটুকু পড়ারও ফুসরত পেতাম না। তাহলে কেন আমরা শহীদী মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়াবো, যে মৃত্যু খুলে দেয়া অফুরন্ত আনন্দবিলাসের সিংহদ্বার?

গতবছর হরতালের দিনে ঢাকায় অফিসিয়াল একটা প্রশিক্ষণ কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়। দেশে তখন তুমুল ধরপাকড়, জুলুম নির্যাতন। এর মাঝেও সারাদেশ থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রায় সবাই উপস্থিত, শুধু চট্টগ্রাম থেকে একজন আসতে পারলেন না। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এ কর্মসূচীর চেয়ে কক্সবাজারে আনন্দবিহারে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করলেন। দূর্ভাগ্য তার, কক্সবাজারের বেরসিক পুলিশের হাতে তিনি সন্দেহভাজন হিসেবে বন্দী হলেন। অথচ আমরা ঠিকই হরতালের মাঝে নির্দিষ্ট ভেন্যুতে প্রশিক্ষণ নিলাম এবং নিরাপদে বাড়ীতেও ফিরে এলাম।

এটা নিতান্তই বিস্ময়কর, একজন মুমিন আল্লাহকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করে, বিশ্বজাহানের সবকিছুর উপর তার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব স্বীকার করে, তাঁকেই অভিভাবক হিসেবে মানে ও তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করে অথচ ইসলামী আন্দোলন থেকে যখন ডাক আসে তখন র‍্যাব-পুলিশের ভয়ে ঘরে লুকিয়ে থাকে, এমনকি সন্দেহমুক্ত চলাফেরার স্বার্থে মসজিদে নামাজ আদায়ের চেয়ে ঘরের কোনে আল্লাহকে ডাকাকে নিরাপদ মনে করে।

আসুন, মরার আগে নিজেকে জীবন্ত লাশে পরিনত করা থেকে বিরত থাকি। পুলিশের হাতে বন্দী হওয়ার ভয়ে নিজেই নিজেকে গৃহবন্দী করা থেকে বিরত থাকি, জেলখানার ভয়ে নিজেই নিজের ঘরটাকে জেলখানায় পরিণত করা থেকে বিরত থাকি। আপসোস! তার চেয়ে হতভাগা আর কে আছে যে নিজের ছায়া দেখেও চমকে ওঠে?

আসুন ভয়কে জয় করি, শহীদী তামান্না নিয়ে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ি। মৃত্যুই হয়তো দেখবেন আপনাকে দেখে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন